• শনিবার, ডিসেম্বর ১৪, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৫২ রাত

গবেষণা: বন্যার ঝুঁকিতে বাংলাদেশের ৪ কোটি ২০ লাখ মানুষ

  • প্রকাশিত ০৩:৫৪ বিকেল অক্টোবর ৩১, ২০১৯
বন্যা
আশ্রয়ের খোঁজে একজন বন্যার্ত নারী। চলতি বছরের ২২ জুলাই, ছবিটি গাইবান্ধার বালাসি ঘাট থেকে তোলা। সৈয়দ জাকির হোসেন/ঢাকা ট্রিবিউন

ভবিষ্যতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ছাড়াও আরো শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ও এসব দেশে আঘাত হানবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের এক-চতুর্থাংশ ভূমি সমুদ্রের পানিতে ডুবে যেতে পারে

কার্বন নির্গমন কমানো না গেলে ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার ৪ কোটি ২০ লাখ মানুষ বন্যার ঝুঁকিতে পড়বেন বলে সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানীরা। 

যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত ন্যাচার কমিউনিকেশনস নামে একটি বিজ্ঞান গবেষণা সাময়িকীতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়, ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য সমুদ্রতট কেমন হবে তা আমাদের একুশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধেই নির্ধারণ করতে হবে। 

ওই গবেষণায় বলা হয়, এশিয়ার দেশগুলোই জলবায়ু পরিবর্তনে বেশির ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ভবিষ্যতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ছাড়াও আরো শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ও এসব দেশে আঘাত হানবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের এক-চতুর্থাংশ ভূমি সমুদ্রের পানিতে ডুবে যেতে পারে। 

বাংলাদেশের পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরাও এই গবেষণাপত্রের সঙ্গে ঐক্যমত্য পোষণ করেছেন। তারা বলছেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি নতুন বিষয় নয় কিন্তু লবণাক্ত পানিতে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক। 

এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানের অধ্যাপক সৈয়দ হাফিজুর রহমান বলেন, “সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে বাংলাদেশ সত্যিই বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে এবং সেটি পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বৃদ্ধি করবে। কিন্তু আমাদের এটা বুঝতে হবে, ক্লাইমেট সেন্ট্রালের গবেষকেরা বৈশ্বিক পেক্ষাপটে গবেষণাটি সম্পাদক করেছেন। যদি শুধু বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা নিয়ে গবেষণা করা হয়, সেক্ষেত্রে আলাদা ফলাফল আসতে পারে।”

“বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাস ও ভৌগলিক হিসাবের দিকে তাকান, এটা বলা সম্ভব নয় যে এ ধরনের দুর্যোগ আগামী ৩০ বা ৫০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানতে যাচ্ছে।” বলেন অধ্যাপক হাফিজুর রহমান। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের অধ্যাপক কাজী মতিন উদ্দিন আহমেদ বলেন, “আবহাওয়ার প্রকৃতি দ্রুত পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে যা তাপমাত্রা পরিবর্তনের মধ্যেই দৃশ্যমান। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাবৃদ্ধি উপকূলীয় এলাকার মানুষকে আক্রান্ত করতে পারে। কিন্তু আমরা এ বিষয়ে ভীত নই কারণ আমাদের উপকূলে এখনো পলি জমছে (নতুন ভূমি তৈরি হচ্ছে)।”

যুক্তরাষ্ট্রের “লক হ্যাভেন ইউনিভার্সিটি পেনিসিলভানিয়া”র ভূগোল বিভাগের অধ্যাপক মো. খালেকুজ্জামান কর্তৃক লিখিত “জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের ভবিষ্যত” শিরোনামে একটি গবেষণা প্রবন্ধে বাংলাদেশ উপকূলের ৮০ কিলোমিটার এলাকার ২০০ বছরের পরিবর্তনকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেখানে বলা হচ্ছে, মূলত বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেলা ভোলা, নোয়াখালী ও বরিশালের নদী বিধৌত এলাকায় পলি জমছে ও নতুন ভূমি তৈরি হচ্ছে।  

তারপরও বাংলাদেশ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছে। এছাড়া দেশের উপকূলীয় এলাকায় জলাবদ্ধতার বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই জলাবদ্ধতা বিশেষ করে মিঠা পানির এলাকায় লবণাক্ত পানির প্রবেশ ও মিশ্রণ ঠেকাতে আবার বাঁধও নির্মাণ করা হচ্ছে।  

এশিয়ার দুই-তৃতীয়াংশই ঝুঁকির মধ্যে

এদিকে গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- চীন, বাংলাদেশ, ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডের অর্থাৎ এশিয়ার দুই-তৃতীয়াংশই মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে রয়েছেন। 

এ ছাড়া এক ডজনের বেশি বড় শহরগুলো বন্যার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এ তালিকায় ব্যাংকক, হংকং, সাংহাই, তাইজু, সুরাবিয়া, ঢাকা, মুম্বাই, হো চি মিন ও জাপানের ওসাকার মতো বড় শহরগুলোও রয়েছে। 

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এনজিও ক্লাইমেট সেন্ট্রাল “সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা পরিবর্তন হয়নি” শিরোনামে এই গবেষণা কর্মটি সম্পাদন করে। গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে উপকূলীয় এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝড় বা বন্যায় কি ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে তা দেখানো হয়েছে। 

এ বিষয়ে ক্লাইমেট সেন্ট্রালের প্রধান নির্বাহী, চিফ সায়েন্টিস্ট এবং এই গবেষণা প্রতিবেদনের সহ-লেখক, বেন স্ট্রাস বলেন, আমরা যখন আমাদের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করি, আমরা দেখতে পাই, আমাদের অনুমানের চেয়েও অনেক বেশি মানুষ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

গবেষকেরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে দুই কোটি মানুষ এবং ২১০০ সালের মধ্যে অপর এক কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে এবং তাদের বর্তমান বাসস্থান ছেড়ে অন্য চলে যেতে বাধ্য হবে।