• শুক্রবার, নভেম্বর ১৫, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৪৬ রাত

‘মৃত ঘোষণার জন্যই আবরারকে হাসপাতালে নেওয়া হয়’

  • প্রকাশিত ১০:৩২ সকাল নভেম্বর ৩, ২০১৯
কিশোর আলো
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী নাঈমুল আবরার রাহাতের মৃত্যুর ঘটনায় আন্দোলনে সহপাঠীরা ঢাকা ট্রিবিউন

সহপাঠীদের দাবি, আবরারকে যখন গুরুতর আহত অবস্থায় অনুষ্ঠানস্থল থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন সে ‘হিট স্ট্রোকে’ অসুস্থ হয়েছে বলে কথা ছড়ানো হয়

দৈনিক প্রথম আলোর সাময়িকী কিশোর আলোর এক অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছেন ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী নাঈমুল আবরার। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি ঘটনাস্থলেই সে মারা গিয়েছিল। আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত ঘোষণার জন্যই কেবল তার মরদেহ মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালে (আয়েশা মেমোরিয়াল হাসপাতাল) পাঠানো হয়। 

তবে আবরারের সহপাঠীদের দাবি, “চিকিৎসকরা ঘটনাস্থলে তাকে মৃত ঘোষণা করেননি।” এমনকি আবরারকে যখন গুরুতর আহত অবস্থায় অনুষ্ঠানস্থল থেকে  বের করে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন সে “হিট স্ট্রোকে” অসুস্থ হয়েছে বলে কথা ছড়ানো হয়। এক বিশেষ প্রতিবেদনে এমনটাই জানিয়েছে বাংলা ট্রিবিউন। 

শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, আবরার বিদ্যুতায়িত হওয়ার আগে কয়েকজন শিক্ষার্থী বৈদ্যুতিক তারের ত্রুটির কথা জানালেও স্বেচ্ছাসেবীরা কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। এছাড়া বড় একটি ইভেন্ট হলেও তাতে অল্পবয়সী ও অনভিজ্ঞদের স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে রাখার ঘটনাতেও ক্ষোভ জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। এমনকি আয়োজকদের পক্ষ থেকেও আবরারের মৃত্যুর বিষয়টিও পরিবারকে জানানো হয়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্কুলের পরিচয়পত্রে থাকা মোবাইল নম্বরের মাধ্যমে তার পরিবারকে মৃত্যুর খবর জানায়। 


আরও পড়ুন: প্রথম আলোর কাছে ১০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে নোটিস


শনিবার (২ নভেম্বর) রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, আয়েশা মেমোরিয়াল হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, অ্যাম্বুলেন্স চালক, আবরারকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া ব্রাদারের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। 

যেভাবে বিদ্যুতায়িত হয় আবরার 

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও আবরারকে মেডিকেল ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া এক শিক্ষার্থী পুরো বিষয়টি বর্ণনা করে জানান, রেসিডেনসিয়াল স্কুলের মাঠকে সাতটি জোনে ভাগ করে অনুষ্ঠান করছিল কিশোর আলো। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই শিক্ষার্থী বলেন, “জোন ২-এ ফটোগ্রাফি প্রদর্শনীর ঠিক বাম পাশে আমি ও আমার কিছু বন্ধু বসে গান গেয়ে আড্ডা দিচ্ছিলাম। তখন এক বন্ধু ডাকলে আমি খালি পায়ে এগিয়ে যাই। ফিরে আসার সময় সেখান দিয়ে যাওয়া একটা তারে আমার পা জড়িয়ে যায় এবং বৈদ্যুতিক শক পাই। পরে বিষয়টি স্বেচ্ছাসেবীদের জানালে তারা কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। পরে আরও কয়েকজনের সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটলেও স্বেচ্ছাসেবীরা কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। সর্বশেষ সাড়ে ৩টার দিকে আবরার ওই তারেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়। পরে স্বেচ্ছাসেবীদের সহায়তায় আমরা বন্ধুরা আবরারকে জোন-২ এর মেডিকেল ক্যাম্পে নিয়ে যাই। সেখান থেকে তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।” 

স্বেচ্ছাসেবীরা শুরুতেই এবিষয়ে ব্যবস্থা নিলে এমন দুর্ঘটনা হতো না বলে দাবি করেন এই প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থী। 


আরও পড়ুন: কিশোর আলোর অনুষ্ঠানে মৃত্যু: প্রতিবাদে সহপাঠীদের ৪ দাবি


আবরারকে মৃত অবস্থায় পান মেডিকেল ক্যাম্পের ব্রাদার সানি 

ইউনিভার্সেল হাসপাতালের মেডিকেল ক্যাম্পের দু’জন ব্রাদার ও কিশোর আলোর দুই স্বেচ্ছাসেবী একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে আবরারকে হাসপাতলে নিয়ে যান। এদেরমধ্যে একজন ব্রাদারের নাম সানি। তিনি বলেন, “মেডিকেল ক্যাম্পের চিকিৎসকরা ছেলেটিকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য বলেন। এরপর আমি আর আমার এক সহকর্মী মিলে তাকে নিয়ে হাসপাতালে যাই। এরআগে, ক্যাম্পের চিকিৎসকরা তাকে পরীক্ষা করে মারা গেছে বলে জানান। তবে তখন চিকিৎসকরা কিশোর আলোর কাউকে জানিয়েছিলেন কিনা তা আমি জানি না। আমাকে হাসপাতালে নিয়ে আসতে বলেছে, আমি তাকে নিয়ে হাসপাতালে চলে আসি।” 

আবরারের চোখ খোলা দেখেছেন অ্যাম্বুলেন্স চালক মাহবুব 

ইউনিভার্সেল হাসপাতালের মোট পাঁচটি অ্যাম্বুলেন্স আছে। এরমধ্যে তিনটি বড়, ছোট একটি ও আইসিইউ’র সুবিধাযুক্ত একটি বিশেষ অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। কিশোর আলোর অনুষ্ঠানস্থলে স্থাপিত মেডিকেল ক্যাম্পে আইসিইউ সুবিধাযুক্ত বিশেষ অ্যাম্বুলেন্সটি ছাড়াও আরও একটি অ্যাম্বুলেন্স ছিল। আইসিউ সুবিধাযুক্ত অ্যাম্বুলেন্সটির চালক ছিলেন মো. মাহবুব। আবরারকে ওই অ্যাম্বুলেন্সে করেই হাসপাতালে নেওয়া হয়। 

চালক মাহবুব বলেন, “আমাকে ৪টার দিকে ফোন দিয়ে স্কুলের ভেতরে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে যেতে বলা হয়। তবে ভীড় থাকায় আমি ভেতরে প্রবেশ করতে পারিনি। এর কিছুক্ষণ পর একটা ট্রলিতে করে দু’জন ব্রাদার ও দুইটা ছেলে একটা ছেলেকে নিয়ে আসে। তাকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়। এসময় তার চোখ খোলা দেখেছি। তাকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলার পর দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাই।” অসুস্থ ছেলেটির অবস্থা কেমন ছিল জানতে চাইলে মাহবুব বলেন, “আমি দেখেছি চোখ খোলা ছিল, একবার মনে হলো জীবিত। তবে আমি ভালো করে খেয়াল করিনি। হাসপাতালে নেওয়ার কিছুক্ষণ পর জানতে পারি ছেলেটি মারা গেছে।” 

মৃত ঘোষণার জন্য হাসপাতালে আনা হয় আবরারকে 

আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত ঘোষণার জন্য নাঈমুল আবরারের মরদেহ মহাখালীর ইউনিভার্সেল হাসপাতালে আনা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. আশিস কুমার চক্রবর্তী। তিনি বলেন, “আবরার স্কুলের মাঠেই মারা গিয়েছিল। তবে একজনকে মৃত ঘোষণা করতে হলে কিছু প্রক্রিয়া রয়েছে, সেগুলো সম্পন্ন করতেই সেখানে থাকা দু’জন চিকিৎসক তাকে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। এসময় কিশোর আলোর দু’জন স্বেচ্ছাসেবীও ছিল। তাকে মেডিকেল ক্যাম্পেই চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেছিলেন। সেখানে কিশোর আলোর যে স্বেচ্ছাসেবীরা ছিলেন, তারা তা জানতো। তাদের হাতে ওয়াকিটকি ছিল। তখন তারা কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছিল কিনা, তা আমরা জানি না।” তিনি আরও বলেন, “আমাদের একজন চিকিৎসক মেডিকেল ক্যাম্প থেকে ফোন দিয়ে জানান কিশোর আলোর অনুষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থীর ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়েছে। পরে হাসপাতালে পৌঁছালে জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা তার হার্টবিট পাচ্ছিল না, পালস পাচ্ছিলো না। তারপরও সবধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন চিকিৎসকরা। বিকাল ৪টা ৫১ মিনিটে ছেলেটিকে মৃত ঘোষণা করা হয়। পরে গীতিকার কবীর বকুল আমাকে ফোন দেন। আমি তাকে বিষয়টি জানাই। এরপর প্রথম আলোর আনিসুল হকের সঙ্গেও আমার কথা হয়। তারা সাড়ে ৬টার দিকে ছেলেটিকে দেখতে হাসপাতালে আসেন।” 

সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ পাশে থাকার পরেও তাকে কেন মহাখালী নেওয়া হলো, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “সেখানে চিকিৎসকের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছিল।”

যেভাবে খবর পায় আবরারের পরিবার 

আবরার মারা যাবার পর তার স্বজনদের কাউকে পাচ্ছিল না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এরপর তার পকেট তল্লাশি করে রেসিডেন্সিয়ালের একটি পরিচয়পত্র পাওয়া যায়। সেখানে থাকা জরুরি যোগাযোগ নম্বরে ফোন দিয়ে তার পরিবারকে মৃত্যুর খবর জানায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এরপর তার স্বজনরা হাসপাতালে আসেন বলে জানান ডা. আশিস কুমার। 


আরও পড়ুন: কিশোর আলোর অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে শিক্ষার্থীর মৃত্যু


স্বেচ্ছাসেবীরা ছিল শিশু-কিশোর 

রেসিডেনসিয়াল কলেজের শিক্ষার্থী সাকিব বলেন, অনুষ্ঠানের যারা স্বেচ্ছাসেবী ছিল, তারা ছিল বয়সে ছোট। তারা কোনও বিষয়ে সিরিয়াস ছিল না। এত বড় অনুষ্ঠান, কিন্তু দায়িত্ব পালন করানো হয়েছে শিশু-কিশোরদের দিয়ে। যাদের জন্য অনুষ্ঠান তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি অগ্রাধিকারের কথা বললেও, বাস্তবে তার উল্টো অবস্থা ছিল। 

মৃত্যুর ঘটনায় রেসিডেনসিয়াল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য 

এদিকে আবরারের মৃত্যুর বিষয়টি তাৎক্ষণিক অনুষ্ঠানস্থলে না জানানোর বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ব্যাখ্যা দিয়েছেন শিক্ষকরা। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের একাধিক শিক্ষক এসে সড়ক থেকে সরিয়ে নিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে এক শিক্ষককে বলতে শোনা যায়, “তাৎক্ষণিক বিষয়টি জানালে বিশৃঙ্খলা হতো, তাই জানানো হয়নি।” কলেজটির অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কাজী শামীম আহমেদ বলেন, “ঘটনা তদন্তে আমরা তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছি। কমিটি সাতদিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে।” 

পুলিশের বক্তব্য 

আবরারের মৃত্যুর ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জি জি বিশ্বাস।