• বুধবার, ডিসেম্বর ১১, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:১৮ রাত

বাঘ বিধবা: এক সংগ্রামী জীবন

  • প্রকাশিত ০৯:২৯ রাত নভেম্বর ১১, ২০১৯
বাঘ বিধবা
বাঘের আক্রমণে নিহত আলম গাজীর স্ত্রী রশিদা বেগম।সৈয়দ জাকির হোসেন/ঢাকা ট্রিবিউন

'আমরা কীভাবে বেঁচে আছি তা নিয়ে কারো কোনো মাথা ব্যথা নেই' 

সুন্দরবন বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জীবন ও জীবিকায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলছে এই বনভূমি। তবে জীবিকার টানে সুন্দরবনে গিয়ে প্রাণ হারানো মানুষের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। তাদেরই একজন আলম গাজী। 

সাইক্লোন "আইলা" সুন্দরবনে তাণ্ডব চালানোর এক বছর পর ২০১০ সালে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আক্রমণে প্রাণ হারান আলম। একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যের মৃত্যুর পর সংকটে পড়ে তার পরিবারের সদস্যরা। বেঁচে থাকার তাগিদে তাদের জীবনে শুরু হয় নতুন সংগ্রাম। 

এমন ঘটনা শুধু আলম গাজীর সঙ্গেই ঘটেনি। সুন্দরবন অঞ্চলের অনেক বাসিন্দাই বিভিন্ন সময় বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন। আলমের পরিবারের মতো একই পরিণতি হয়েছে তাদের স্ত্রী-পরিবারেরও। জানা গেছে, এই অঞ্চলে এমন ২১ জন বিধবা নারী রয়েছেন যাদের স্বামী বাঘের শিকার হয়েছেন। স্থানীয়ভাবে তাদের বলা হয় "বাঘ বিধবা"।       

স্থানীয় এনজিও কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে সুন্দরবনে গিয়ে কমপক্ষে ১ হাজার ১০০ জন বাঘের শিকার হয়ে নিহত হয়েছে। তাদের বেশিরভাগই মৌয়াল, বাওয়াল এবং জেলে। তবে বাঘের সংখ্যা কমে যাওয়ার ফলে এই মৃত্যুর হারও কমছে।

নিহত আলমের স্ত্রী রশিদা বেগম বর্তমানে বসবাস করছেন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নে। তিনি বলেন, সে সময় তাদের তিন সন্তানই শিশু ছিল। সংসারে একমাত্র উপার্জন করতেন আলম। তার মৃত্যুর পর সংসার চালানোর মতো কিছুই ছিল না। 

রশিদা বলেন, "আমাদের কোনো খাবার; কোনো কাজ ছিল না। তাই বাধ্য হয়ে খাবার জোগাড় করতে আমাদের কাজ শুরু করতে হয়।" 

১৫ বছর আগে আলমের মতো একইভাবে বাঘের শিকার হন রিজিয়া খাতুনের স্বামী ইসলাম সর্দার। তিনি সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করতেন। বর্তমানে তার সন্তান রেজাউল (৩০) সংসারের হাল ধরেছেন। বিপদ থাকা সত্ত্বেও একই কাজ করে যাচ্ছেন তিনিও। 

বাঘ বিধবা রিজিয়া খাতুন। সৈয়দ জাকির হোসেন/ ঢাকা ট্রিবিউন

স্বামীর মৃত্যুর পর সব ঝড়-ঝঞ্চা বিধবা এই নারীদের ওপর দিয়ে বয়ে গেলেও, স্থানীয়ভাবে তাদেরকে স্বামীর মৃত্যুর জন্যও দায়ী করা হচ্ছে। দেখা গেছে, স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবা এই নারীরা শ্বশুরবাড়ি থেকে কোনো সাহায্য-সহযোগিতা পান না। এমনকি স্থানীয় বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান থেকেও তাদের দূরে রাখা হয়।   

রশিদা বলেন, আমাদের জীবন খুব কষ্টের মধ্য দিয়ে যায়। আমরা কীভাবে বেঁচে আছি তা নিয়ে কারো কোনো মাথা ব্যথা নেই। কোনোকালে যদি কিছু পেয়ে থাকি তা হলো সরকারের ১ লাখ টাকা অনুদান। ওই টাকা আমি বাড়ি নির্মাণের কাজে খরচ করি। তবে সাইক্লোনের কারণে বাড়ির ছাদ প্রায়ই ক্ষতিগ্রস্থ হয়। আমি এখন কী করবো?"  

তবে বিভিন্ন এনজিও এগিয়ে আসার ফলে বর্তমানে বাঘ বিধবাদের নিয়ে স্থানীয় কুসংস্কার কিছুটা হলেও কমেছে। বর্তমানে অনির্বান, দূর্জয়, জাগ্রত বাঘ বিধবা ও নারী সংগঠন নামের কয়েকটি এনজিও বিধবা নারীদের ঘিরে গড়ে ওঠা কুসংস্কার দূর করে তাদের সমাজে ফিরিয়ে আনতে সুন্দরবন এলাকায় কাজ করছে। তবে এ কাজের অগ্রগতি খুব ধীর বলে জানিয়েছে তারা।