• রবিবার, ডিসেম্বর ১৫, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৮:৫৫ সকাল

অনির্দিষ্টকালের বন্ধে জাবি'তে দীর্ঘমেয়াদী সেশনজটের আশঙ্কা

  • প্রকাশিত ১২:৩৫ দুপুর নভেম্বর ১৯, ২০১৯
জাবি
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার। সংগৃহীত

এক ব্যাচের পরীক্ষা শেষ করার পর পরবর্তী ব্যাচের পরীক্ষা শুরু করা, দেরিতে ফলাফল ঘোষণা ইত্যাদি কারণে আগে থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়টিতে সেশনজট চলে আসছে

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে সম্মান প্রথমবর্ষে ভর্তির জন্য নির্বাচিত হয়েও অপেক্ষার প্রহর গুণতে হচ্ছে কয়েক হাজার নবীন শিক্ষার্থীকে। অধ্যয়নরত প্রথম ও দ্বিতীয়বর্ষের শিক্ষার্থীদের আসন্ন চূড়ান্ত পরীক্ষার ক্ষেত্রেও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। একইসাথে চলমান অনির্দিষ্টকালের এই বন্ধে দীর্ঘমেয়াদী সেশনজটে পড়ার আশঙ্কা করছেন অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরাও। 

অনুসন্ধানে জানা যায়, ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্নের পরও কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই নির্ধারিত সময়ের পরে প্রথমবর্ষের ক্লাস শুরু করা, একাডেমিক রুটিন অনুযায়ী ক্লাস-পরীক্ষা নিতে শিক্ষকদের অনীহা-স্বেচ্ছাচারিতা, সান্ধ্যকালীন কোর্সে বেশি সময় দেওয়া, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা, প্রশাসনিক কাজ নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকাসহ শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষের সংকটের কারণে বিভাগগুলো বিভিন্ন বর্ষে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের চূড়ান্ত পরীক্ষা একসঙ্গে নিতে পারে না।

এক ব্যাচের পরীক্ষা শেষ করার পর পরবর্তী ব্যাচের পরীক্ষা শুরু করা, দেরিতে ফলাফল ঘোষণা ইত্যাদি কারণে আগে থেকেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজট চলে আসছে।

গতবছরের অক্টোবরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদে (একনেক) জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়নের জন্য ১ হাজার ৪৪৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরুর প্রথম থেকেই তিন দফা দাবিতে আন্দোলন করে আসছিলেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একাংশ। দাবিগুলোর মধ্যে ছিল- প্রকল্পের আওতায় ছয়টি হলের মধ্যে ছেলেদের তিনটি হল নির্মাণের জায়গা পুনরায় বিবেচনা, প্রকল্পের মাস্টারপ্ল্যান পুনর্বিন্যাস ও উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতির তদন্ত।

উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলাম আন্দোলনকারীদের দু’টি দাবি মেনে নিলেও ‘‘দুর্নীতির তদন্তে’’ রাজি না হওয়ায় প্রথমে তার পদত্যাগ ও পরবর্তীতে তার অপসারণ দাবি করে আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একাংশ। সেই ধারাবাহিকতায় গত দুইমাস ধরে উপাচার্যের অপসারণ দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি দিয়ে আসছেন তারা।

ধারাবাহিক আন্দোলনের কর্মসূচি হিসেবে গত ৪ নভেম্বর আন্দোলনকারীরা উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবরোধ শুরু করলে ৫ নভেম্বর শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাদের ওপর হামলা চালায়। এই ঘটনার পর থেকেই অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয় বিশ্ববিদ্যালয় ও হলগুলো।

ফলে সেশনজট আরও দীর্ঘমেয়াদী হওয়ার আশংকা শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্টদের।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, আইন অনুষদে সেশনজট রয়েছে একবছরের। কলা ও মানবিকী অনুষদে বাংলা বিভাগ ছাড়া সবগুলো বিভাগেই ছয়মাস থেকে একবছর পর্যন্ত সেশনজট রয়েছে। সমাজ বিজ্ঞান অনুষদে সরকার ও রাজনীতি বিভাগ ছাড়া বাকি পাচঁটি বিভাগেই ছয়মাস থেকে দেড় বছর পর্যন্ত সেশনজট রয়েছে। গাণিতিক ও পদার্থ বিষয়ক অনুষদের কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, রসায়ন বিভাগ, ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগে একবছর করে ও পরিসংখ্যান বিভাগ, গণিত বিভাগে ছয়মাস করে, জীববিজ্ঞান অনুষদের পাবলিক হেল্থ এন্ড ইনফরমেটিকস বিভাগে দেড়বছরের সেশনজট রয়েছে।

এবিষয়ে কলা ও মানবিকী অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. মোজাম্মেল হক বলেন, “২০১৯ শেষ হতে চললেও ২০১৮ সালের মাস্টার্স পরীক্ষা এখনও শুরু হয়নি। ২০১৮ এর ডিসেম্বরের মধ্যে শিক্ষার্থীদের বের হয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও নানা কারণে দেরি হয়েছে।”

সেশনজটের আশংকা প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, চলমান পরিস্থিতিতে ২০১৯ সালেও পরীক্ষা শুরু করা যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয় খুললে সময় নিয়ে পরীক্ষাগুলোর তারিখ নির্ধারণ করা হবে। ফলে প্রায় একবছরের সেশনজট তো হয়েই গেছে।

এমন পরিস্থিতি চলমান থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তবে এবিষয়ে মুঠোফোনে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. রাশেদা আখতার।

এছাড়া বায়োটেকনোলজি এন্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, প্রাণ রসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগে ছয়মাস করে ও ফার্মেসি বিভাগে দেড়বছরের সেশনজট রয়েছে। বিজনেস স্টাডিজ অনুষদে ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগ ছাড়া প্রতিটি বিভাগে ছয়মাস থেকে একবছরের সেশনজট রয়েছে। অনুষদ ও বিভাগ ভেদে কোনো কোনো ব্যাচে সেশনজটের পরিমাণ আরও বেশি।

এপ্রসঙ্গে ফার্মেসি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের এক শিক্ষার্থী ঢাকা ট্রিবিউন’কে বলেন, ‘‘আমাদের বিভাগে আগে থেকেই দেড়বছরের সেশনজট রয়েছে। তারমধ্যে চলছে অনির্দিষ্টকালের বন্ধ। এতে সবচেয়ে ক্ষতির সম্মুখীন হবো আমরা। শিক্ষকদের দায়িত্বে অবহেলা, নিয়মানুযায়ী ক্লাস না নেওয়া ইত্যাদি কারণে ক্যাম্পাস খোলা থাকলেও সেশনজট বেড়েছে আর এভাবে যদি অনির্দিষ্টকাল বন্ধ থাকে তাহলে অবস্থা আরও খারাপ হবে। আশাকরি কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে দেখবে।’’

স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী নাঈম হোসেন বলেন, ‘‘বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি হয়েছে বলে আমি মনে করি না। আমাদের বিভাগে সেশনজট একবছরের। এখনও শিক্ষাজীবন শেষ করতে পারিনি। এখনতো মনে হচ্ছে পড়াশোনা শেষ করতে আরও সময় লাগবে। যে মূল্যবান সময়গুলো নষ্ট হচ্ছে সেটার দায়ভার কে নেবে?’’

বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম অনিক বলেন, ‘‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ভয় পেয়ে ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণা করেছে। এছাড়া বাণিজ্যিক কোর্সগুলো নিয়েই শিক্ষকরা ব্যস্ত থাকেন, তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্লাস থেকে দূরে থাকেন তারা। এই বন্ধের কারণে বিভাগগুলোতে সেশনজট আরও তীব্র হবে। আগামী ২১ নভেম্বরের মধ্যে ক্যাম্পাস ও হল খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছি। প্রশাসন চাইলেই সেশনজট থেকে শিক্ষার্থীরা বের হয়ে আসতে পারে। এজন্য সদিচ্ছার প্রয়োজন।’’

এবিষয়ে কথা জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার রহিমা কানিজ ও উপ-উপাচার্য নুরুল আলমের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাদেরকে পাওয়া যায়নি।

প্রক্টর ফিরোজ উল হাসান বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকলে ক্লাস না হলে সেশনজট তো হবেই। এই বন্ধের কারণে এর প্রভাব শিক্ষা কার্যক্রমের ওপর পড়বেই। তবে আমরা চেষ্টা করব যেন বন্ধটা খুব বেশি দীর্ঘায়িত না হয়।”