• মঙ্গলবার, এপ্রিল ০৭, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ১১:২৮ রাত

এসি রবিউলের জীবন প্রদীপ নিভে গেলেও আলো ছড়াচ্ছে তার ‘ব্লুমস’

  • প্রকাশিত ০১:৫৫ দুপুর নভেম্বর ২৭, ২০১৯
এসি রবিউল
হলি আর্টিজান হামলায় নিহত পুলিশের সাবেক এসি রবিউল করিম কামরুল ঢাকা ট্রিবিউন

হলি আর্টিজান হামলায় রবিউলের জীবন প্রদীপ নিভে গেলেও থামেনি ‘‘ব্লুমস’’-এর পথচলা। বন্ধু-স্বজনদের নিরন্তর প্রচেষ্টায় প্রতিবন্ধী শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে এ বিদ্যায়তন

২০১৬ সালের ১ জুলাই রাজধানীর হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলায় নিহত হন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের সিনিয়র সহকারী কমিশনার (এসি) হিসেবে কর্মরত রবিউল করিম কামরুল।

২০১১ সালে নিজ জেলা মানিকগঞ্জে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য ‘‘ব্লুমস’’ নামে একটি বিশেষায়িত স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। হলি আর্টিজান হামলায় রবিউলের জীবন প্রদীপ নিভে গেলেও থামেনি ‘‘ব্লুমস’’-এর পথচলা। আট বছর পেরিয়ে চারচালা টিনের ঘর থেকে আজ সেখানে উঠেছে পাকা দালান। রবিউলের বন্ধু-স্বজনদের নিরন্তর প্রচেষ্টায় প্রতিবন্ধী শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে এ বিদ্যায়তন। পাঠদানের পাশাপাশি স্কুলের আঙিনায় শিশুদের জন্য তৈরি করা হয়েছে ছোট আকারের কয়েকটি রাইডস।

শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বিশেষায়িত এই বিদ্যালয়টি শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি স্বনির্ভর জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে শুরু করেছে বিভিন্ন কার্যক্রম। শুরু করেছে নারীদের জন্য সেলাই ও বিউটি পার্লার প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, দেওয়া হচ্ছে কম্পিউটার শিক্ষা।

রবিউলের স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তার বন্ধু ও চাচা জাহাঙ্গীর আলম, একমাত্র ভাই সামসুজ্জামান সামস্ আর নেপথ্যে রয়েছেন রবিউলের স্ত্রী উম্মে সালমা। তাদেরকে সহায়তা করেছে বিদেশি সংস্থা এসএসটিএস।

ব্লুমস স্কুল। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউনউম্মে সালমা জানান, বিশেষায়িত এই স্কুলের শিশুদের মাঝে তিনি স্বামীর স্বপ্ন খুঁজে বেড়ান। নিজের দুই সন্তান সামি আর রায়নার মতোই স্কুলের ৪২টি শিশুকেও তিনি সমান ভালোবাসেন। স্বামীর স্বপ্ন সত্যি হোক, প্রতিবন্ধী শিশুরা আলোকিত হোক- এটাই চান তিনি।

সালমা বলেন, ‘‘রবিউল নিজগুণে সবার মধ্যে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। নিঃস্বার্থ সমাজসেবার পাশাপাশি একজন স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেনতিনি। সেই স্বপ্নের একটা প্রতিফলন ব্লুমস।’’

উম্মে সালমাকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানকারই শিক্ষার্থী ছিলেন রবিউল করিম। 

তিনি আরও জানান, নয় বছর বয়সী ছেলে সামি বাবাকে ভীষণ অনুভব করে। চাপা স্বভাবের সামির চোখ বাবাকে খুঁজে বেড়ায় প্রায়ই। 

২০১১ সালে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার কাটিগ্রামের নিবিড় পরিবেশে মায়ের দেওয়া ২৯ শতাংশ জমিতে ১২টি প্রতিবন্ধী শিশুকে নিয়ে বিশেষায়িত স্কুল বিকনিং লাইট অর্গানাইজেশন অব ম্যানকাইন্ড অ্যান্ড সোসাইটি (ব্লুমস) প্রতিষ্ঠা করেন গোয়েন্দা পুলিশের সাবেক সিনিয়র সহকারী কমিশনার রবিউল করিম কামরুল। বর্তমানে এই স্কুলের শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪২।

ব্লুমসে চলছে পাঠদান ঢাকা ট্রিবিউন

প্রতিবন্ধীদের মাঝে আলো ছড়াচ্ছে ‘‘ব্লুমস’’

কাউসার আহম্মেদ শারীরিক প্রতিবন্ধী। হাসি খুশি আর খোজ মেজাজে থাকে সারাক্ষণ। স্কুলে আসলে লেখাপড়ার পাশাপাশি গানে মশগুল থাকে সে। রবিউলের “ব্লুমস”-এর শিশুরা কেমন আছে দেখতে সেখানে গেলে দেখা মিললো কাউসারের মতো আরও অনেকের। আনন্দঘন পরিবেশেই পড়াশোনা আর খেলাধুলা করছে তারা। কেউ কেউ আবার ছবিও আঁকছে। শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্যও করা হয়েছে বিভিন্ন ব্যবস্থা।

২০১৭ সাল থেকে স্কুলটিতে স্থানীয় সুহৃদদের সহযোগিতায় পরিচালিত হচ্ছে ‘‘ডে-মিল’’ কর্মসূচি।

রবিউলের ছোট ভাই শামসুজ্জামান শামস্ জানালেন, বড় ভাইয়ের স্বপ্নের স্কুলের শিক্ষার্থী বেড়ে এখন ৪২। স্থানীয় এবং বাইরের শুভানুধ্যায়ীদের নিয়ে ১৫ সদস্যের একটি পরিচালনা কমিটি এর দেখভাল করছে। ২০১৬ সালের ১৬ জুলাই সমাজসেবা অধিদফতর এটিকে ‘‘ব্লুমস কাটিগ্রাম’’ নামে একটি অলাভজনক ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা হিসেবে নিবন্ধিত করে। 

ব্লুমসের পরিচালক (প্রশাসন) ও শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম জানান, শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী, বুদ্ধি প্রতিবন্ধী, শারীরিক প্রতিবন্ধী, সেরিব্রাল পালসি এবং অটিজমসহ বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতাযুক্ত শিশুদেরকে সপ্তাহে চারদিন তাদের বিদ্যালয়ে পড়ানো হয়। বর্ণমালা পরিচিতি, সংখ্যা ও গণনা, ছড়া শেখানোর পাশাপাশি সরকারি স্কুলগামী প্রতিবন্ধী শিশুদেরকেও পাঠে সহায়তা করেন তারা। রয়েছে খেলাধুলারও ব্যবস্থা।

কথা হয় ‘‘ব্লুমস’’-এর দুই শিক্ষক শামীমা নাসরিন শাওন ও শামীমা নাসরিন সাথীর সঙ্গে। তারা জানালেন, নামমাত্র সম্মানীর বিনিময়ে সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে তারা রবিউল করিমের স্বপ্নের প্রতি সম্মান জানিয়ে তারা এ স্কুলে শিক্ষকতা করছেন। সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত তারা সেখানে ক্লাস নেন। অবহেলিত এসব শিশুদের জন্য কিছু করতে পেরে তৃপ্ত ও গর্বিত।