• সোমবার, জানুয়ারী ২০, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ১২:৪৫ রাত

পণ্যের মতো মানুষের শ্রম কেনাবেচা হয় দেশের যে হাটে

  • প্রকাশিত ১২:৩১ দুপুর নভেম্বর ২৯, ২০১৯
শ্রমিক কুমিল্লা
কুমিল্লার বিভিন্ন হাট-বাজারে এভাবেই শ্রমবিক্রির অপেক্ষায় আসেন শ্রমিকরা ঢাকা ট্রিবিউন

দু'পক্ষের মধ্যে কেনাবেচা তথা মজুরির বিষয়ে বনিবণা হলে শেষ হয় বিক্রি পর্ব। শ্রম বিক্রি করা এসব অভাবী মানুষেরা অবস্থাসম্পন্ন মহাজন, কৃষকদের পিছু পিছু তাদের বাড়ি যান

অনেক আগেই বিলুপ্ত হয়েছে দাসপ্রথা। কিন্তু এখনও দেশের অনেক জায়গায় হাট-বাজারে পণ্যের মতো দর কষাকষি করে কেনাবেচা হচ্ছে মানুষের শ্রম। কুমিল্লা জেলার বিভিন্ন স্থানে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অভাবী মানুষ দলে দলে সেখানে যান শ্রম বিক্রির জন্য। নিয়োগদাতাদের সঙ্গে চুক্তি করেন দিন, সপ্তাহ কিংবা মাস চুক্তিতে।

কুমিল্লার হাট বাজারগুলোতে ঘুরে দেখা যায়, এসব হাটে মানুষের শ্রম কেনাবেচা নিয়ে চলে দর-কষাকষি। দু'পক্ষের মধ্যে কেনাবেচা তথা মজুরির বিষয়ে বনিবণা হলে শেষ হয় বিক্রি পর্ব। শ্রম বিক্রি করা এসব অভাবী মানুষেরা অবস্থাসম্পন্ন মহাজন, কৃষকদের পিছু পিছু তাদের বাড়ি যান। সঙ্গে থাকে নিজের দৈনন্দিন ব্যবহারের কাপড়-চোপড়ের পুটলি, ধান কাটার কাস্তে, কাটা ধান বহনের উপযোগী বাঁশের লাঠি, কোদাল।

শ্রম কেনাবেচার এ হাটে সুঠামদেহী কমবয়েসী শ্রমিকের ‘দাম’ বেশি। শারীরিকভাবে দুর্বল, রোগা আর বয়স্কদের দাম তুলনামূলক কম।

কুমিল্লা জেলার সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার, চৌয়ারা বাজার, সূয়াগঞ্জ বাজার, বিজয়পুর বাজার, লালমাই বাজার, বুড়িচং উপজেলা নিমসার বাজার, চান্দিনা   বাজারসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলার বাজারগুলোতে ধান কাটা মৌসুমে ও ধানের চারা রোপনের মৌসুমে মানুষের শ্রম কেনাবেচা হাট বসে। এ সকল বাজারের মধ্যে পদুয়ার বাজার, শুয়াগঞ্জ বাজার, চৌয়ারা বাজার, নিমসার বাজার, লালমাই বাজার, ইলিয়টগঞ্জ বাজার, দেবিদ্বার বাজার, মুরাদনগর বাজার, বাঘমারাসহ বিভিন্ন বাজারে মানুষের শ্রম কেনাবেচা জন্য বেশ পরিচিতি লাভ করেছে। ধান কাটা ও ধানের চারা রোপনের মৌসুমে প্রতিদিনই এ সকল বাজারে শ্রম বিক্রির জন্য ভিড় করে শত শত শ্রমজীবী মানুষ। পণ্যের মতো বিক্রি করে তাদের শ্রম।

সাধারণত ধানকাটা ও ধানের চারা রোপনের মৌসুমে এসব শ্রমজীবীদের চাহিদা বেড়ে যায়। এ সময়ে মজুরীও বাড়ে সমান তালে। ভরা মৌসুমে প্রতিজন কৃষি শ্রমিকের দৈনিক মজুরি নির্ধারিত হয় ছয়শ' টাকা থেকে সাতশ' টাকায়। মৌসুমের কাজ কমে আসলে মজুরি নেমে আসে চারশ' থেকে পাঁচশ টাকায়। সাথে থাকে দু’বেলা খাবার ও থাকার জায়গার ব্যবস্থা।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাজারে শ্রম বিক্রি হতে আসা এ সব শ্রমজীবী মানুষগুলো যে দিন নিজের শ্রম বিক্রি করতে পারেন না, সেদিন তাদের রাত কাটে বাজারের কাছাকাছি কোন মসজিদ, মাদ্রাসা কিংবা স্কুল ঘরের বারান্দায়। কখনো আধপেটা, কখনওবা উপোস করে রাত কেটে যায় তাদের। সকাল হতেই আবার শ্রম বিক্রির আশায় চলে ছোটাছুটি।

এসব হাট-বাজারে শ্রম বিক্রি করতে আসা অভাবী মানুষদের বেশিরভাগেরই বাড়ি রংপুর, গাইবান্ধা, নীলফামারী, ময়মনসিংহ, দিনাজপুর, নেত্রকোণা ও ঠাকুরগাঁওসহ দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে।

পদুয়ার বাজারে কথা হয় শ্রমিক রহিদুল (২২) এবং শমসের আলীর (২৫) সঙ্গে। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভাল না হওয়ায় কাজের আশায় রংপুর জেলার গঙ্গাচড়া উপজেলার থেকে ছুটে এসেছেন তারা।

পাঁচ দিন আগে ময়মনসিংহের ধোবার উপজেলার কাউসার কান্দি গ্রাম থেকে কাজের আশায় কুমিল্লায় এসেছিলেন রজ্জব আলী ও রফিক। গত কয়েকদিন কাজ করেছেন লালমাই এলাকার এক গৃহস্থের ক্ষেতে। নিয়োগদাতা গৃহস্থ তাদেরকে তিনবেলা খেতে দিয়েছেন। রাতে শোয়ার জন্য ভাল ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। 

নিয়োগদাতা গৃহস্থ ভাল মানসিকতার থাকা-খাওয়ার অসুবিধা হয় না। তবে তাদের অনেকেই কাজের মানুষকে মানুষ বলেই গণ্য করতে চান না বলে জানান এই দুই শ্রমজীবী।

দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কাজের খোঁজে ছুটে আসা অভাবী মানুষদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শ্রম বিক্রির রোজগার তারা ব্যয় করেন পরিবারের ভরণ-পোষণ ও অন্যান্য কাজে। কৃষি মৌসুমে তাদের এলাকায় শ্রমিকের মজুরী খুব কম। এলাকায় কাজ না থাকলেই তারা চলে যান বাইরের জেলায়। যা তাদের পরিবারকে জন্য কিছুটা হলেও আর্থিক স্বচ্ছলতা এনে দেয়।