• সোমবার, জানুয়ারী ২০, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ১২:৪৫ রাত

অনির্দিষ্টকালের বন্ধে বিপাকে জাবি’র সাধারণ শিক্ষার্থীরা

  • প্রকাশিত ০৮:১৫ রাত ডিসেম্বর ৩, ২০১৯
জাবি
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার। সংগৃহীত

প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্তে চরম বিপাকে রয়েছেন টিউশনি করে পড়াশোনার খরচ জোগানো বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী, ক্যাম্পাসে বিভিন্ন কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করা প্রান্তিক মানুষ

“টিউশনি করে নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি আমার ছোট ভাইয়ের পড়াশোনার খরচ চালাই। ক্যাম্পাস বন্ধ, সবাই বাড়িতে চলে গেছে। টিউশনির কারণে বাড়ি যেতে পারছি না। এখানে থাকারও কোনো জায়গা নেই। তাই ক্যাম্পাসের পাশে বাসা ভাড়া করে কোনোরকম থাকছি। বাইরে থাকা ও খাওয়ার অনেক বেশি। এভাবে চলতে থাকলে যা টাকা বেতন পাবো সব নিজের পেছনেই খরচ হয়ে যাবে, বাসায় দিবো কি ছোট ভাইয়ের খরচ চলবে কিভাবে?” কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী মিজানুর রহমান।

উপাচার্যবিরোধী আন্দোলনকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপর ছাত্রলীগের হামলার পরিপ্রেক্ষিতে গত ৫ নভেম্বর থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্যাম্পাস ও আবাসিক হল বন্ধ ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্তে চরম বিপাকে রয়েছেন টিউশনি করে পড়াশোনার খরচ জোগানো বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী, ক্যাম্পাসে বিভিন্ন কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করা প্রান্তিক মানুষ।

আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই হলে থেকে লেখাপড়া করেন। যেসব শিক্ষার্থী টিউশনি করে লেখাপড়ার খরচ যোগাড় করেন, হল বন্ধ হলেও টিউশনির কারণে ক্যাম্পাস ছেড়ে বাড়ি যেতে পারছেন না। এটা বছরের শেষ দিক, হওয়ায় বেশির ভাগ স্কুল ও কলেজে চূড়ান্ত পরীক্ষা শুরু হবে কিছু দিনের মধ্যেই। এমন সময়ে অভিভাবকরাও প্রাইভেট টিউটরের অনুপস্থিতি স্বাভাবিকভাবে নেবেন না। তাই, ক্যাম্পাসের আশপাশের এলাকাগুলোতে অবস্থান করেই পরিস্থিতি মোকাবেলার চেষ্টা করছেন অনেকে। তবে বেশির ভাগেরই একদিকে যেমন নেই খাবারের সুব্যবস্থা, অন্যদিকে নেই থাকার কোনো জায়গা। হল ও খাবারের ব্যবস্থা না থাকায় একরকম মানবেতর সময় পার করছেন এসব শিক্ষার্থী।

সরেজমিনে ঘুরে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন গেরুয়া, কলাবাগান, ইসলামনগর, আমবাগান এলাকায় দেখা গেছে, প্রায় প্রতিদিনই শিক্ষার্থীরা তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে ঘুরছেন থাকার জায়গার খোঁজে। কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার বন্ধ থাকায় চাকরির প্রস্তুতিমূলক পড়াশোনা করছেন, এমন শিক্ষার্থীরাও রয়েছেন এই দলে। হঠাৎ করে বাসা ভাড়া করে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য নেই অনেকেরই। ফলে বন্ধ হয়ে গেছে তাদের প্রস্তুতিমূলক পড়াশোনা।

এদিকে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন ধরনের দোকান, খাবারের হোটেল ও দোকানগুলোতে কর্মরত কর্মচারীরা কাজ না থাকায় বেকার সময় পার করছেন। অনেকেই ফিরে গেছেন নিজ জেলায়। শিক্ষার্থীরা না থাকায় ক্যাম্পাসে রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা মানুষেরাও পড়েছেন ভীষণ অসহায় অবস্থায়। অনেকে আবার ক্যাম্পাসের পেশা ছেড়ে সাভারে গিয়ে ভিন্ন পেশায় যোগ দিয়েছেন।

খাবারের হোটেলে কর্মরত শরীফ হোসেন বলেন, বেতনের কিছু টাকা বাসার জন্য রেখে কোনোরকমে চলতাম। এখন ক্যাম্পাস বন্ধ তাই সেই টাকা খরচ করে চলছি। এ টাকা শেষ হইলে কী করব? আর বাড়িতে টাকা পাঠাব কিভাবে? আমার জমানো টাকা সব শেষ হয়ে যাচ্ছে।

ক্যাম্পাসের রিকশাচালক মঈন আলী বলেন, অন্যের রিক্সা ভাড়া করে কোনোভাবে জীবিকা নির্বাহ করি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই বাসা ভাড়া নিয়ে থাকি। এই টাকা দিয়েই স্ত্রী সন্তানের ভরনপোষণ চালাতে হয়। কিন্তু বন্ধ ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীর পরিমাণ খুবই কম থাকায় আয় নাই। কীভাবে যে ছেলেমেয়েদের পেটে ভাত জুটাবো জানি না, বাসা ভাড়া দিবো ভেবে কুল পাচ্ছি না।

এদিকে বন্ধ ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থী এবং মানুষজন না থাকায় ফাঁকা ক্যাম্পাসে বহিরাগত মাদকসেবী এবং দুর্বৃত্তদের আনাগোনা বেড়ে গেছে। ফলে গত কয়েকদিনে দিনের আলোতেই তিনটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট জাবি শাখার সভাপতি সুষ্মিতা মরিয়ম বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো বন্ধ করে রেখেছেন। তাদের এমন সিদ্ধান্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫ হাজার শিক্ষার্থীর জীবন ও ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন হুমকির মুখে পড়েছে। এছাড়া এই ক্যাম্পাসে বিভিন্ন আয়ের প্রান্তিক মানুষজন কষ্টে দিন অতিবাহিত করছে। আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা না খেয়ে আছে। সংসার চালানোর টাকা নেই তাদের কাছে।”

কবে স্বাভাবিক হবে ক্যাম্পাস এমন প্রশ্নের উত্তরে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার রহিমা কানিজ বলেন, “সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তে হল ও ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তাই কবে হল খুলবে তা সিন্ডিকেট সভা ছাড়া বলা সম্ভব নয়। পুনরায় সিন্ডিকেট হলে এ বিষয়টি উপস্থাপিত হলে এবং তা পাশ হলে খুলে দেওয়া হতে পারে।”

ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর ফিরোজ উল হাসান বলেন, “অনাকাঙ্খিত ঘটনা এড়াতে ক্যাম্পাস এবং হলগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কবে হল খোলা হবে নির্দিষ্ট করে আগাম কোনো কিছু বলে দেওয়ার সুযোগ নাই, সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত কিছু বলা যাচ্ছে না। আমি এ বিষয়ে বলতে পারব না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যখন মনে করবে হল খুলে দেওয়ার মতো পরিবেশ তৈরি হয়েছে তখনই একমাত্র ক্যাম্পাস খুলে দেওয়া হবে। তবে আশা করছি খুব দ্রুতই হল খুলে দেওয়া হবে।”

উল্লেখ্য, দুর্নীতির অভিযোগে উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের অপসারণ দাবিতে দুই মাস ধরে আন্দোলন করে আসছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একাংশ। গত ৫ নভেম্বর আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার প্রেক্ষিতে ক্যাম্পাস অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়।