• বুধবার, এপ্রিল ০১, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ১১:১৭ রাত

নদীকে দেখানো হলো খাস জমি, ইজারা দিলো জেলা প্রশাসন!

  • প্রকাশিত ০৫:০১ সন্ধ্যা ডিসেম্বর ৬, ২০১৯
যশোর-নদী দখল
নদীটিতে বাঁধ দিয়ে ইতোমধ্যেই সেটি পুকুর বানিয়ে ফেলা হয়েছে। নদীটিতে বাঁধ দিয়ে ইতোমধ্যেই সেটি পুকুর বানিয়ে ফেলা হয়েছে। ঢাকা ট্রিবিউন

স্থানীয়দের অভিযোগ, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইজারা দেওয়ার মাধ্যমে নদীটিকে মেরে ফেলার সমস্ত আয়োজনই সম্পন্ন করা হয়েছে

যশোরের ঝিকরগাছার ভায়না নদীকে কাগজপত্রে ধানী জমি দেখিয়ে ঘের বানিয়ে মাছ চাষ করছে একটি মহল। এজন্য তারা নদীটি সরকারের কাছ থেকে ইজারাও নিয়েছে! ব্যাপক জালিয়াতির মাধ্যমে এই কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

ঝিকরগাছা উপজেলার শিমুলিয়া ইউনিয়নের রাধানগর গ্রামে এই ঘটনা ঘটেছে। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইজারা দেওয়ার মাধ্যমে নদীটিকে মেরে ফেলার সমস্ত আয়োজনই সম্পন্ন করা হয়েছে। 

রাধানগর গ্রামের বাসিন্দা তাহের আলী মোল্যা (৭৫) বলেন, ছোটবেলায় আমরা ভায়না নদীতে গোসল করেছি, সাঁতার কেটেছি, মাছ ধরেছি, পাট জাগ দিয়েছি। এখন দস্যুরা সেই নদী দখল করে নিয়েছে; ঘের বানিয়ে মাছচাষ করে। আমাদের ওই পানি ব্যবহার করতে দেয় না। এখন পাট জাগ দিতে ২-৩ কিমি দূরে বাঁওড়ে যেতে হয়।

গৃহবধূ রেবেকা খাতুন (৪৫) বলেন, আমাদের হাঁস-মুরগিও নামতে দেয় না। গোসল করতে নামলে তারা মারধর করে। ২০ বছর আগেও আমরা এটি নদী হিসেবেই দেখেছি।


আরও পড়ুন - মাগুরায় নদী দখল করে একগ্রামেই ৩০ ইটভাটা!


স্থানীয়দের দাবি, ভায়না নদীর সাথে শার্শা উপজেলার বেতনা নদীর সংযোগ রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে বেতনা নদীর পানি বেড়ে ভায়না নদী দিয়ে বের হয়। কিন্তু নদীতে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করায় পানি নিষ্কাশনে বাধার কারণে পাড়ের বাসিন্দাদের জলাবদ্ধতায় ভোগান্তি পোহাতে হয়। বর্ষাকালে এখানকার প্রায় ২০টি গ্রাম তলিয়ে যায়। এই কারণে নদী পুনরুদ্ধারের দাবিতে মানববন্ধনও করেন তারা। একইসঙ্গে এলাকার তিন শতাধিক নারী-পুরুষের স্বাক্ষরিত একটি অভিযোগপত্র জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন দফতরে দেওয়া হলেও কোনও ফল হয়নি বলেও দাবি স্থানীয়দের। 

তাদের দাবি, এই ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য (মেম্বার) রশিদ ও তার জামাই (মেয়ের স্বামী) লোকমানের নেতৃত্বে কয়েকজন নদীটি দখল করে সেখানে মাছ চাষ করছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৮৫ সালে স্থানীয় চেয়ারম্যানের মাধ্যমে সাত জনের নামে নদীটি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এক বছর পর তাদের দেওয়া বরাদ্দ জেলা প্রশাসকের দফতর থেকে নবায়ন করতে মেম্বার আব্দুর রশিদ দায়িত্ব নেন। কিন্তু রশিদ অন্য ছয় জনকে জানান, নদী আর তাদের নামে নেই, অন্য চার ব্যক্তি এটি লিজ নিয়েছে এবং আবার তার (রশিদ মেম্বার) কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে, রশিদ মেম্বারের সঙ্গে নদী লিজ নেওয়া অন্য ছয় সদস্য জানতে পারেন, রশিদ মেম্বার ও তার জামাই কৌশলে নদীটির দখল তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে।  


আরও পড়ুন - ৩৮ বছর ধরে গাছ লাগাচ্ছেন শাজাহান বিশ্বাস


গ্রামের বাসিন্দারা জানান, তারা রেজিস্ট্রি ও তহশীল অফিসে খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, ঝিকরগাছা উপজেলার বারবাকপুর গ্রামের কোরবান আলী, শ্রীরামকাটি গ্রামের নূর মোহাম্মদ মোল্লা ও দিদার বক্স মোল্লা এবং কামারপাড়া গ্রামের আব্দুর রউফ জাল কাগজ তৈরি করে হাল জরিপের সময় রেকর্ড এবং জালিয়াতির মাধ্যমে নদীকে ধানী খাস জমি দেখিয়ে জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে বরাদ্দ নিয়েছে। 

জানতে চাইলে দখলদার মো. লোকমান হোসেন দাবি করেন, ১৬ নম্বর রাধানগর মৌজায় ৫৪৮ দাগের ওই জমির মালিক ছিল যথাক্রমে নুর মোহাম্মদ, দিদার বক্স মোল্লা, কুরবান আলী দফাদার ও আব্দুর রউফ। আমি তাদের কাছ থেকে সেটি ক্রয় করেছি। স্থানীয় একটি চক্র তাদের ক্রয়কৃত জমিতে করা মাছের ঘের দখলের পায়ঁতারা করছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এই জমি নদীর নয়, ধানী জমি।”

স্থানীয় ইউপি সদস্য তবিবর রহমান বলেন, কী করে যেন রাধানগর গ্রামের সাবেক মেম্বর আব্দুর রশিদ ও তার জামাই লোকমান হোসেন নদী দখল করে বাঁধ দিয়ে পুকুর বানিয়ে ফেলেন। কিন্তু গ্রামবাসীর বাধায় তারা তাদের দখলে রাখতে পারেনি। পরে প্রভাবশালী লোকজনকে দিয়ে তারা নদীতে মাছ চাষ করাচ্ছেন।


আরও পড়ুন - ফের দূষিত বাতাসের শহরের তালিকায় শীর্ষে ঢাকা


এদিকে ইজারার বিষয়ে শিমুলিয়া ইউনিয়নের তহশীল অফিসের নায়েব নেসার উদ্দিন আল আজাদ বলেন, “লোকমান হোসেনের দাবি মিথ্যা। তিনি দীর্ঘদিন ধরে জালিয়াতি করে নদীকে ধানী জমি হিসেবে কাগজপত্র তৈরি করা হয়েছে। এসএ পর্চায় এটি নদী হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু আরএস পর্চায় রয়েছে ধানী জমি। ধানী জমি হিসেবে যে কাগজপত্র তৈরি করা হয়েছে, তাতে ব্যাপক অসঙ্গতি রয়েছে।” তিনি দখলদারদের বিরুদ্ধে দেওয়ানি মামলা করবেন বলেও জানান।

যশোরের জেলা প্রশাসক শফিউল আরিফ ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “নদী কখনও খাস জমি হিসেবে লিজ দেওয়া হয় না। বিষয়টি অনুসন্ধানের জন্য ঝিকরগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানানো হবে।”


আরও পড়ুন - সাভারের বংশী নদী দখলদারদের তালিকা চেয়েছে হাইকোর্ট