• শুক্রবার, এপ্রিল ১০, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ১১:৩২ রাত

দারিদ্র্য নিত্যসঙ্গী তবু বীরপ্রতীক সোলায়মানের কাছে আত্মসম্মানই বড়

  • প্রকাশিত ০২:১৮ দুপুর ডিসেম্বর ১২, ২০১৯
বীর প্রতীক সোলায়মান-নাটোর
বীর প্রতীক কনস্টেবল মোহাম্মদ সোলায়মান ঢাকা ট্রিবিউন

তার মতে, পাকিস্তানিদের কাছ থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করায় অবদান রেখে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যে সম্মানটুকু অর্জন করেছেন, সেই জায়গা থেকেই কারও কাছে কিছু চাইতে পারেন না

মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে “বীরপ্রতীক” খেতাব পেয়েছিলেন নাটোরের যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ সোলায়মান। সময়ের পরিক্রমায় এখন চরম দারিদ্র্যে দিন কাটছে তার। খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা হয়েও বীরপ্রতীক সোলায়মান পান কেবল সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা ভাতা। আর পরিবার-পরিজন নিয়ে বাস করেন শহরের কাপুড়িয়া পট্টি এলাকার একটি খাস জমিতে।

প্রবল আত্মসম্মানবোধ যেন এই বীর সেনার অগ্রগতির পথে বাধা! এ কারণে কারও কাছ থেকেই কিছু চাইতে পারেন না তিনি। তাই জীবন সায়াহ্নে এসে তার দিন কাটছে নিঃস্ব অবস্থায়। চার মেয়ে ও এক ছেলের কারও জন্যই তেমন কিছুই করতে পারেননি, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হয়েও তারা চাকরি-বাকরি পাননি। এ কারণে নিজের ওপরেই সোলায়মানের জন্মেছে বিস্তর ক্ষোভ।

১৯৭১ সালে জীবন বাজি রেখে দেশের জন্য রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি বাহিনীর বিপক্ষে সম্মুখযুদ্ধে দুইটি গুলি লেগেছিল কনস্টেবল সোলায়মানের শরীরে।

১৯৬৮ সাল থেকে তৎকালীন পাকিস্তান পুলিশ কনস্টেবল পদে তিনি পুলিশের চাকরিতে যোগ দেন তিনি। ট্রেনিং শেষে রংপুর পুলিশ লাইন্সে যাওয়ার পর তাকে পাঠানো হয় সৈয়দপুর পুলিশ লাইন্সে। কিছুদিন পরেই শুরু হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধ।

৬ নম্বর সেক্টরের অধীনে এয়ার ভাইস মার্শাল কমান্ডার খাদেমুল বাশারের নেতৃত্বাধীন ১৫ পুলিশ সদস্যের একটি দলের সদস্য ছিলেন সোলায়মান। যুদ্ধ চলাকালে ছয় নম্বর সেক্টরকে আরও ছয়টি সাব-সেক্টরে ভাগ করা হয়েছিল।

সোলায়মান ছিলেন ৬ নম্বর সাব-সেক্টরের ক্যাপ্টেন শাহরিয়ার-এর নেতৃত্বাধীন ৮০০ পুলিশ সদস্যের বাহিনীতে। পুলিশ সদস্যদের সমন্বয়ে গড়া এই সাব-সেক্টরটিকে আবার ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত করা হয়েছিল। চার-পাঁচজন পুলিশ সদস্যের নেতৃত্বে একেকটি যোদ্ধা দল ছড়িয়ে পড়ে পঞ্চগড়সহ আশেপাশের এলাকায়।

মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ সোলায়মানের বীরপ্রতীক খেতাব সনদ। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউনযুদ্ধের একেবারে শুরুর দিকে তৎকালীন ইপিআর সুবেদার খালেকের নেতৃত্বে তিনিসহ ডোমার, দেবীগঞ্জ হয়ে পঞ্চগড়ের জগদলে গেলে রনাঙ্গন থেকেই পালিয়ে গিয়েছিলেন চার পুলিশ সদস্য। কিন্তু থেকে যান সোলায়মানসহ অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা। অংশ নেন প্রতিরোধ যুদ্ধে।

ধীরে ধীরে বিভিন্ন জায়গা থেকে তাদের দলে যোগ দেন দুই হাজারেরও বেশি মুক্তিযোদ্ধা। তাদের মোকাবেলা করতে হয়েছিল ভারি অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ও প্রশিক্ষিত আনুমানিক হাজার দেড়েক পাকিস্তানি সেনাকে। প্রায়ই থেমে থেমে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হতো।

এমনই একদিন সম্মুখ যুদ্ধের সময় একদিন পাকিস্তানিরা ব্রাশফায়ার করলে সোলায়মানের চালানো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায় সোলায়মানের লাইট মেশিন গানটি (এলএমজি)। দুই হাতের কব্জির নিচে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। এসময় তার সঙ্গী বরিশালের সিপাহী ইউসুফও গুলিবিদ্ধ হন।

আহতাবস্থায় সোলায়মান চলে যান সীমান্তবর্তী ভারতের শিলিগুড়ি বাডডোগলা সামরিক হাসপাতালে। এক মাস আট দিন চিকিৎসা শেষে দ্বিগুণ উদ্যমে আবার ফিরে আসেন যুদ্ধক্ষেত্রে। আবারও সাত-আটটি সম্মুখযুদ্ধে মুখোমুখি হন তারা। এবার জোরালো জবাব দিতে শুরু করেন তারা। নিহত হয় ১২ থেকে ১৩ পাকিস্তানি সেনা। অপরদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের মাত্র দুইজন আহত হন। একপর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের কৌশলে টিকতে না পেরে পাকিস্তানি সেনারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে রাতের আঁধারে জগদল থেকে পালিয়ে যায়।

বীরপ্রতীক সোলায়মান জানান, যুদ্ধ শেষে কর্মস্থলে যোগ দিতে চাইলেও নানা জটিলতার কারণে তা আর সম্ভব হয়নি। আর বর্তমানে সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ছাড়া অন্য কোনো সরকারি সুযোগ-সুবিধা পান না বলেও জানান তিনি।

সন্তানদের মধ্যে চার মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন, আরেক মেয়ে পড়াশোনা করছে বিএসসি অনার্স শ্রেণিতে।

এক প্রশ্নের জবাবে সোলায়মান জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও তিনি দেখা করেছেন। তিনিসহ অনেকেই সমস্যার কথা জানতে চাইলেও তিনি তা বলতে পারেননি। 

তার মতে, পাকিস্তানিদের কাছ থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করায় অবদান রেখে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যে সম্মানটুকু অর্জন করেছেন, সেই জায়গা থেকেই কারও কাছে কিছু চাইতে পারেন না।

সোলায়মানের ছেলে শাহিন জানান, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় তিনি বাবার সঙ্গী ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তার কাছে সমস্যার কথা জিজ্ঞেস করলে জবাবে তিনি কোনো সমস্যা নেই বলে জানিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, নাটোরের পুলিশ সুপারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও বিভিন্ন সময় সহায়তা করতে চাইলেও তিনি সাফ জানিয়ে দেন, “কোনো সমস্যা নেই”।

অথচ অনাহারে-অর্ধাহারে থেকে খাস জমিতে বাস করতে হচ্ছে তাদের।