• সোমবার, জানুয়ারী ২০, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ১২:৪৫ রাত

নারায়ণগঞ্জে ইটভাটায় বিপর্যস্ত পরিবেশ, হুমকিতে জনস্বাস্থ্য

  • প্রকাশিত ০৫:৫২ সন্ধ্যা ডিসেম্বর ১২, ২০১৯
নারায়ণগঞ্জ-ইটভাটা
প্রতিবছর শুধু ইটভাটার গ্রাসে হারিয়ে যাচ্ছে জেলাটির ১% কৃষি জমি। ঢাকা ট্রিবিউন

‘এগুলো কোনো ব্যাপার না। আমার ইউনিয়নে মাত্র  ২৪টি ইটভাটা। বক্তবলীতে (একটি ইউনিয়ন) গিয়ে দেখেন এক এলাকাতেই ২০০টার উপরে ইটভাটা রয়েছে’

সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেওয়া এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহরগুলোর তালিকার একেবারে উপরের দিকেই স্থান পেয়েছে নারায়ণগঞ্জের নাম। আয়তনে নারায়ণগঞ্জ দেশের সবচেয়ে ছোট জেলা। অথচ এই জেলাতেই রয়েছে ৩৪৪টি ইটভাটা। এর মধ্যে ২৫৪টি ইটভাটাই অবৈধ। ইটভাটাগুলোর অধিকাংশ আবার গড়ে উঠেছে জনবসতিপূর্ণ এলাকায়, নদীর ধারে ও ফসলি জমি দখল করে। নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে গড়ে ওঠা এসব ইটভাটা পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি হুমকির মুখে ফেলছে জনস্বাস্থ্য। 

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য (২০১৭ সালের) অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জের সবচেয়ে বেশি ইটভাটা ফতুল্লা, বন্দর ও রূপগঞ্জে। জেলায় ছাড়পত্র ও নবায়ন বিহীনভাবে নারায়ণগঞ্জে পরিচালিত জিগজ্যাগ পদ্ধতির ইটভাটা রয়েছে ১৫০টি। এর মধ্যে রূপগঞ্জে রয়েছে ৮২টি, সদর উপজেলায় রয়েছে ৩৬টি, বন্দরে ২৫টি, সোনারগাঁওয়ে ৭টি। আর ১২০ ফুট চিমনিবিশিষ্ট অবৈধ ইটভাটা রয়েছে ১০৪টি। এর মধ্যে, সদর উপজেলায় রয়েছে ৬৯টি, রূপগঞ্জে রয়েছে ৩২টি, আড়াইহাজারে ১টি, সোনারগাঁয়ে ২টি। 

কৃষি জমির মাটি যাচ্ছে ইটভাটায়

গত ১১ ডিসেম্বর সোনারগাঁ উপজেলার সাদিপুর বড়বাড়ি এলাকার কৃষকদের জমির মাটি স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র বিভিন্ন ইটভাটায় বিক্রি করে দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠে। এ ঘটনায় এলাকাবাসী জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। স্থানীয় কৃষকেরা জানান, মাটি সন্ত্রাসীরা ক্ষমতাসীন দলের নাম ব্যবহার করে এসব অবৈধভাবে এক মাস ধরে উপজেলার সাদিপুর বড়বাড়ি গ্রামের কৃষকদের ফসলি জমির মাটি ১০ থেকে ১৫ ফুট গর্ত করে কেটে ট্রাকে তুলে স্থানীয় কয়েকটি ইটভাটায় বিক্রি করা হচ্ছে। 


আরও পড়ুন - নদীকে দেখানো হলো খাস জমি, ইজারা দিলো জেলা প্রশাসন!


এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রকিবুর রহমান খান বলেন, “কৃষকদের ফসলি জমির মাটি জোরপূর্বক কেটে নেওয়ার বিষয়ে ইতিমধ্যে অভিযোগ পেয়েছি। দু-এক দিনের মধ্যে এ কাজে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

জেলা কৃষি কার্যালয়ের কাজী হাবিবুর রহমান জানান, কৃষি জমিগুলোতে মাটি কেটে নেওয়ায় জমিতে ফসল উৎপাদন কমে যায়। নারায়ণগঞ্জে প্রতিবছরই ১ শতাংশ করে কৃষি কমছে। কৃষি পরিবারগুলো কৃষিকাজ থেকে বেরিয়ে ইটভাটাসহ কল-কারখানা পেশায় জড়িয়ে পড়ছে। যা আগামী সময়গুলোতে খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। 

ইটভাটাগুলোর দখলে কৃষিজমি। ঢাকা ট্রিবিউন

এদিকে, ভাটার ক্ষতিকর প্রভাবে ইতোমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে বন্দরের মুছাপুর ইউপির ১নং ওয়ার্ডের ফনকুল, দাসেরগাঁও, গোবিন্দকুল, পাতাকাটা, বৈরাগীপাড়, ব্রাহ্মণের বাগ, শাসনেরবাগ এলাকার প্রায় এক হাজার বিঘা জমির ফসল।

তবে এ ব্যাপারে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই মুছাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাকসুদ হোসেনের। তিনি ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “এগুলো কোনো ব্যাপার না। আমার ইউনিয়নে মাত্র ২৪টি ইটভাটা। বক্তবলীতে (একটি ইউনিয়ন) গিয়ে দেখেন এক এলাকাতেই ২০০টার উপরে ইটভাটা রয়েছে।”

হুমকির মুখে পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য

ভাটার বিষাক্ত ধোঁয়া শুধু কৃষি জমি বা পরিবেশের ক্ষতি করছে এমনটিই নয়, জনস্বাস্থ্যেও মারাক্তক প্রভাব ফেলছে। এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় এলাকার নারী, শিশু ও বৃদ্ধেরা আক্রান্ত হচ্ছেন নানা রোগে। 

মুছাপুর ইউনিয়নের দাসেরগাঁও এলাকার নুরুজ্জামান জানান, আশেপাশে ইটভাটার কালো ধোঁয়া আর গন্ধে নিঃশ্বাস নেওয়া কষ্টকর হয়ে পড়েছে। তাছাড়া সারা বছরই কাশি, বুকে ব্যাথা এগুলো লেগেই থাকে।


আরও পড়ুন - মাগুরায় নদী দখল করে একগ্রামেই ৩০ ইটভাটা!


নারায়ণগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাঈদ আনোয়ার ঢাকা ট্রিবিউনিকে বলেন,“ একটি এলাকায় কতগুলো থাকবে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো আইন না থাকায় আমরা এর সংখ্যা নির্ধারণও করতে পারছি না। একই এলাকার একাধিক ইটভাটা গড়ে তোলা হয়েছে যা, পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জে বায়ুতে সালফার ডাই অক্সাইড, কার্বন ডাই অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, পিএম ১০, পিএম ২.৫সহ ক্ষতিকর উপদানের উপস্থিতি অনেক বেড়ে গেছে।”

জেলা সিভিল সার্জন ডা. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, “বায়ু দূষণের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয় হৃদযন্ত্র এবং শ্বাস-প্রশ্বাস। অতিরিক্ত দূষিত বায়ুর কারণে গর্ভবতী নারী ও শিশু স্বাস্থ্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ে। এমনকি জন্মের পূর্বেই শিশুর মৃত্যুর কারণ হতে পারে। এছাড়া পরিপাক-বিপাক প্রক্রিয়া, শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া, এলার্জিজনিত সমস্যাও বায়ু দূষণের কারণেই পরিলক্ষিত হয়।”

হাইকোর্টের নির্দেশ বাস্তবায়নে ধীর গতি

গত ২৬ নভেম্বর ঢাকার আশেপাশের পাঁচ জেলার ইটভাটা ১৫ দিনের মধ্যে বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। সেই সময়সীমা ইতোমধ্যেই পেরিয়ে গেছে। তবুও বন্ধ হয়নি ইটাভাটার কার্যক্রম। যদিও ফতুল্লা, বন্দর, আড়াইহাজার থেকে ইতোমধ্যে মাত্র ১৪টি ইটভাটা বন্ধ করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। 

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাঈদ আনোয়ার বলেন, “হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী জেলাজুড়ে এ অভিযান অব্যাহত থাকবে। আর উচ্ছেদকৃত ইটভাটাগুলো পুনরায় চালু করার কোনো সুযোগ নেই।”

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক খাদিজা তাহের ববি বলেন, “অবৈধ ইটভাটাগুলো বন্ধে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে।”


আরও পড়ুন - বায়ু দূষণ কমাতে ঢাকাসহ ৫ জেলায় ইটভাটা বন্ধের নির্দেশ