• সোমবার, জানুয়ারী ২০, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ১২:৪৫ রাত

কয়লায় ফিরছে ভাগ্য!

  • প্রকাশিত ১০:১৮ সকাল ডিসেম্বর ১৩, ২০১৯
যাদুকাটা নদী
যাদুকাটা নদী থেকে কয়লা সংগ্রহ করছে এক শিশু ঢাকা ট্রিবিউন

হতদরিদ্র শ্রমজীবী নারীরা কাজের অভাবে দিনের পর দিন অনাহারে অর্ধাহারে থাকতেন, তাদের অনেকেই এখন কয়লা কুড়িয়ে অন্ন-বস্ত্রের যোগান দিতে পারছেন

সুনামগঞ্জে সীমান্তঘেঁষা নদী যাদুকাটায় বালুর সঙ্গে মিশে থাকা কয়লা কুড়িয়ে ভাগ্য ফিরছে তাহিরপুর উপজেলার কয়েক হাজার মানুষের, যাদের বেশিরভাগই নারী।

শুধু সীমান্ত নদী যাদুকাটাই নয়, পাশাপাশি সীমান্তের ১৮টি ছড়া থেকেও কয়লা কুড়িয়ে জীবনযাপন করছেন শ্রমিকরা। এর মাধ্যমে প্রায় অর্ধসহস্রাধিক নারী শ্রমিক হয়ে উঠেছেন আত্মনির্ভরশীল।

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের জেলা সুনামগঞ্জ। এই জেলারই একটি জনপদের নাম তাহিরপুর। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের মেঘালয় পাহাড়ঘেঁষা সীমান্ত লাগোয়া এ জনপদের বেশিরভাগ মানুষই নিম্ন ও মধ্যবিত্ত।

প্রতিবছর বর্ষায় ভারত থেকে প্রবাহিত স্রোতধারায় যাদুকাটা ও সীমান্ত ছড়াগুলো দিয়ে বালুর সাথে মিশে থাকা কয়লা বাংলাদেশে আসে। ভারতের মেঘালয় পাহাড়ে অপরিকল্পিতভাবে কয়লা তোলার পর প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে পানির স্রোতের সাথে নুড়ি, বালুমিশ্রিত কয়লা যাদুকাটা নদীর স্বচ্ছ ও সীমান্ত ছড়াগুলোর পানিতে দেখা যায়।

জেলার পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষের প্রধান জীবিকা হলো যাদুকাটা নদীতে পানির স্রোতে ভারত থেকে বাংলাদেশে নেমে আসা বালুতে মিশে থাকা কয়লা কুড়ানো। যুগ যুগ ধরে পাহাড়ের বুক চিরে প্রবাহিত অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত নদীটির উৎসমুখ থেকে ১০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য পর্যন্ত প্রতিদিন কয়লা কুড়ানোর কাজ করে থাকেন শ্রমিকরা।

মেঘালয়ের কোল ঘেঁষা যাদুকাটা নদীতে স্রোতের সঙ্গে ভেসে আসে কয়লা ঢাকা ট্রিবিউন

এসব কয়লা শ্রমিকদের বেশিরভাগই নারী। বালুমিশ্রিত কয়লা প্রথমে ঠেলা জালিতে তোলার পর পানিতে ছেঁকে বালু থেকে আলাদা করে বস্তায় ভরে রাখেন তারা। প্রতি বস্তা কয়লা সাড়ে তিন থেকে চার শ' টাকা দরে স্থানীয় কয়লা মহাজনদের কাছে বিক্রি করা হয়।

২৮ বিজিবি সুনামগঞ্জ ব্যাটালিয়ন নিয়ন্ত্রিত লাউড়েরগড় বিওপি ক্যাম্প ও গ্রামের পাশ দিয়ে প্রবাহিত এ নদীতে তাহিরপুরসহ পার্শ্ববর্তী জামালগঞ্জ ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার কমপক্ষে ১০ হাজার শ্রমিক প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শুধু কয়লা কুড়ানোর কাজে নিয়োজিত। 

নদীর তীরবর্তী লাউড়েরগড়, ডালারপাড়, ছড়ারপাড়, পুরানলাউড়, মোকশেদপুর, মানিগাঁও, মাহারাম বড়গোপ, রাজারগাঁ, জামবাক, কড়ইগড়া, চানপুর, রজনীলাইন, রাজাই, শরিফগঞ্জ, মাছিমপুর, চিনাকান্দি ও ছাতারকোনা গ্রামের নারীরাই এ কাজে বেশি নিয়োজিত।

কয়লা শ্রমিকরা জানান, যেসব হতদরিদ্র শ্রমজীবী নারীরা কাজের অভাবে দিনের পর দিন অনাহারে অর্ধাহারে থাকতেন, তাদের অনেকেই এখন কয়লা কুড়িয়ে অন্ন-বস্ত্রের যোগান দিতে পারছেন। প্রতিদিন পাঁচ শ' থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত উপার্জন করতে পারেন তারা। আবার কাজের দক্ষতা অনুযায়ী কয়লা মহাজনরা অগ্রিম টাকাও দিয়ে থাকেন অনেককে।

মানিগাঁও গ্রামের জরিনা, লাউড়েরগড় এর কুলসুমা, রাবেয়া, মাহারাম এর সোনাবান, রাজাই গ্রামের তরী হাজং এর মতো অনেক শ্রমজীবী নারীই কয়লা কুড়িয়ে সংসারের স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে এনেছেন। অনেক শ্রমজীবী পরিবারের ছেলে-মেয়েরা এখন স্কুল-কলেজেও পড়াশোনা করছে।

অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত নদী যাদুকাটা ঢাকা ট্রিবিউন

বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার স্বরুপগঞ্জ গ্রামের কয়লাশ্রমিক জান্নাত আরা বলেন, “আমি আর ২ পুলা (ছেলে) মিল্লাই (মিলে) গত ৬ মাস কয়লা তুইল্লা (তুলে) বিক্রি করে ৩ লাহক (লাখ) টাকা কামাইছি (রোজগার করেছি)। সেই টাহা (টাকা) দিয়া দুই পুলারে (ছেলেকে) বিয়া (বিয়ে), টিনের ঘর করছি। গরু-ছাগল কিনে আমরা এহন সুহেই (সুখে) থাকতাছি (আছি)।”

জান্নাত আরাদের মতো সীমান্তবর্তী কয়েক হাজার শ্রমজীবী পরিবার প্রকৃতির করুণায় বদলে দিয়েছে তাদের জীবনমান। তারা পরিবার পরিজন নিয়ে সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে দিন কাটাতে পারছেন।

স্থানীয় বাদাঘাট ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আপতাব উদ্দিন বলেন, ভারত থেকে পানির স্রোতে বাংলাদেশে নেমে আসা বালুমিশ্রিত কয়লা আমাদের তাহিরপুর উপজেলাসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি উপজেলার জন্য আল্লাহর দান। আগে আমাদের এলাকার বেশিরভাগ শ্রমজীবী পরিবার জীবন কাটাতো অর্ধাহারে-অনাহারে। আর এখন কয়লা তুলে হাজারও শ্রমিক বেঁচে আছেন।

তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুনা সিন্ধ চৌধুরী বাবুল বলেন, প্রবাহমান যাদুকাটা নদীতে স্রোতের সাথে বালুমিশ্রিত কয়লা ঠেলা জালিতে ছেঁকে প্রক্রিয়া করে আলাদা করে বস্তায় ভরে মহাজনদের কাছে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করা একটি অদ্ভুত ও কঠিন কাজ বটে। তবুও এলাকায় অন্য কোনো কাজ না থাকায় আমার উপজেলার শ্রমজীবী লোকজন নদীর স্রোতধারার মতো নিজেদের জীবনযাত্রা পরিবর্তন করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।

শ্রমিকদের কঠিন কাজে তার উপজেলা পরিষদের সক্রিয় সহযোগিতা রয়েছে বলে জানান চেয়ারম্যান।