• রবিবার, ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৪২ রাত

‘এনভিসি’ কার্ড নিয়ে ফিরতে রাজি নয় রোহিঙ্গারা

  • প্রকাশিত ১০:১৯ রাত ডিসেম্বর ১৮, ২০১৯
রোহিঙ্গা ক্যাম্প
টেকনাফের শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্প। সৈয়দ জাকির হোসেন/ঢাকা ট্রিবিউন

‘এটি মিয়ানমারের নাটক। আন্তর্জাতিক আদালতে চলমান মামলাকে ভিন্নখাতে নিতে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলাকে কৌশল হিসেবে নিয়েছে’

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়ে তৃতীয়বারের মতো কথা বলতে কক্সবাজার সফরে এসেছেন মিয়ানমার ও আসিয়ানের উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল। দুইদিনের সফরে আসা এই দলটি প্রথম দিনেই অর্ধশতাধিক রোহিঙ্গা নেতার সঙ্গে সংলাপ করেছেন। সংলাপে রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফিরে যেতে প্রতিনিধিদলটি বার বার অনুরোধ করেন। প্রতিনিধিদলটি রোহিঙ্গাদের বলেছেন, ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড (এনভিসি) নিয়ে স্বদেশে ফিরে যেতে। কিন্তু, রোহিঙ্গারা তা প্রত্যাখান করে বলেন, রাখাইনে পূর্ণ নাগরিকত্বসহ নানা সুযোগ-সুবিধা দিলেই তারা ফিরবেন, এর আগে নয়।

বুধবার (১৮ ডিসেম্বর) দুপুর দেড়টার দিকে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এক্সটেনশন-৪ ক্যাম্পে রোহিঙ্গা কমিউনিটি নেতাদের সঙ্গে মিয়ানমার ও আসিয়ান প্রতিনিধিদলের প্রথম দিনের সংলাপ হয়। উক্ত সংলাপে অংশ ৪১ জন রোহিঙ্গা কমিউনিটি নেতা ও ছয় জন কমিউনিটি নারী নেত্রী অংশ নেন।

মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক সংস্থা ও অর্থনীতিক বিভাগের পরিচালক চ্যান অ্যায়ের নেতৃত্বে ৯ সদস্য বিশিষ্ট প্রতিনিধি দলে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন, শ্রম ও অভিবাসন এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাগণ রয়েছেন। একইভাবে ৭ সদস্যের আসিয়ান প্রতিনিধিদলে রয়েছেন আসিয়ানভুক্ত রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাগণ।

বৈঠকে অংশ নেওয়া রোহিঙ্গা কমিউনিটি নেতা মুহিব উল্লাহ জানিয়েছেন, “মিয়ানমারের প্রতিনিধিদলটি সেই পুরনো কথাগুলো বার বার বলছেন। ‘এনভিসি’ কার্ড নিয়ে আমরা কোনোভাবেই মিয়ানমারে ফিরব না। এ কথা বলার পরও দীর্ঘদিন পরে এসে সেই পুরনো কথা নতুন করে শুরু করছেন মিয়ানমার। সংলাপে নতুনত্ব বলতে কিছুই নেই।”


আরও পড়ুন - হেগে যাচ্ছেন সু চি


রোহিঙ্গা নেতা মাষ্টার সিরাজ আহমদ বলেছেন, “এটি মিয়ানমারের নাটক। আন্তর্জাতিক আদালতে চলমান মামলাকে ভিন্নখাতে নিতে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলাকে কৌশল হিসেবে নিয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরানো ছাড়া আমি কিছুই দেখছি না।”

আরেক রোহিঙ্গা নেতা ডা,. জোবায়ের আহমদ বলেছেন, “বৈঠকে আমরা বার বার অনুরোধ করেছি যে আমাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব দেওয়া হোক। কিন্তু, মিয়ানমারের প্রতিনিধিদলটি বিষয়টি এড়িয়ে যান। এতে করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কোনো সুরাহা দেখছি না।”

রোহিঙ্গা নারী নেত্রী জামালিদা বেগম বলেন, “রাখাইনে মুসলিম রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতনের বিষয়টি কিছুতেই বিশ্বাস করাতে পারছি না মিয়ানমারের প্রতিনিধিদলকে। তারা রাখাইনে সহিংস কোনো ঘটনা শুনতে রাজি নয়। বলছে তোমরা (রোহিঙ্গারা) প্রথমে ‘এনভিসি’ কার্ড নাও পরে পূর্ণ নাগরিকত্ব প্রদান করা হবে। কিন্তু, ‘এনভিসি’ কার্ডের মধ্যে নানা শর্ত জুড়ে দেওয়া হচ্ছে।”

কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন অতিরিক্ত সচিব শামশুদ্দোজা জানিয়েছেন, মিয়ানমারের ৯ সদস্য বিশিষ্ট ও আসিয়ানের ৭ সদস্যের প্রতিনিধিদলটি দুইদিনের সফরে কক্সবাজারে এসেছেন। প্রথম দিনে উখিয়ার কুতুপালং এক্সটেনশন-৪ ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সংলাপ শেষ করেছেন। বৃহস্পতিবার (১৯ ডিসেম্বর) সকালে একই স্থানে পুনরায় সংলাপ শুরুর কথা রয়েছে।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ইকবাল হোছাইন সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, “মিয়ানমারের প্রতিনিধিদলটি কক্সবাজার বিমান বন্দর হয়ে উখিয়াস্থ কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৌঁছার পরপরই পুলিশ তাদের নিরাপত্তা বিধানে কাজ করছে। প্রথম দিন এক্সটেনশন-৪ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রত্যাবাসনের বিষয়ে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সংলাপ শুরু করেছেন। প্রতিনিধিদলটি বৃহস্পতিবার উক্ত ক্যাম্পে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে ইচ্ছুক রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আলোচনা করার কথা রয়েছে। এছাড়াও মুসলিম রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি হিন্দু রোহিঙ্গা স্বদেশে ফিরে যাওয়ার বিষয়েও আলোচনা করার সম্ভাবনা রয়েছে।”


আরও পড়ুন - হেগে সু চি'র গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার


এর আগে চলতি বছরের ২৭ জুলাই মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট থোয়ে’র নেতৃত্বে ১৯ সদস্যের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল রোহিঙ্গা ক্যাম্প সফর করেন। এ সময় আসিয়ানের প্রতিনিধিদলটিও সঙ্গে ছিলেন। সে সময়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে রোহিঙ্গাদের যৌথ সংলাপে অংশ নেয়। এছাড়াও ২০১৮ সালের ১১ এপ্রিল মিয়ানমারের সমাজকল্যান মন্ত্রী উইন মিয়াট আয়ে’র নেতৃত্বে আরও একটি প্রতিনিধিদল রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলতে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এসেছিলেন। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সংলাপ (ডায়ালগ) করতে দুইদিনের সফরে তৃতীয়বারের মিয়ানমারের প্রতিনিধিদলটি কক্সবাজারে অবস্থান করছেন।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইনে সেনা অভিযানে প্রাণভয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আর্ন্তজাতিক চাপের মুখে বাংলাদেশ-মিয়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি সম্পন্ন হয়। একই বছর ৬ জুন নেইপিদোতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমার ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মধ্যে সমঝোতার চুক্তি হয়। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দ্বিতীয় দফা ২২ আগস্ট প্রত্যাবাসনের দিন ধার্য করে ৩৪৫৫ রোহিঙ্গা নাগরিকের তালিকা পাঠায় মিয়ানমার সরকার। কিন্তু, কোনো রোহিঙ্গা মিয়ানমারের ফিরতে রাজি না হওয়ায় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া থেমে যায়।