• সোমবার, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ০১:০৬ দুপুর

নির্মল বাতাস ও পরিচ্ছন্নতার নগরী রাজশাহী

  • প্রকাশিত ১২:৫৮ দুপুর ডিসেম্বর ১৯, ২০১৯
রাজশাহী
বায়ু দূষণ রোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নির্মল বাতাস ও পরিচ্ছন্ন এক নগরীতে পরিণত হয়েছে রাজশাহী। ঢাকা ট্রিবিউন

শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও জাতিসংঘের তথ্য (ইউএন ডাটা) মতে ২০১৬ সালে বাতাসে ভাসমান মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর কণার (পিএম১০ পার্টিকেল) পরিমাণ কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে সারাবিশ্বে সেরা ছিল রাজশাহী

কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে নির্মল শীতের হালকা বাতাসে গরম পোশাকে পদ্মাপাড়ে হাঁটাহাঁটি করছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। নিজের শরীর ঠিক রাখার জন্য শুধু পদ্মাপাড়ে নয়, নগরীর প্রস্থত ঝকঝকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন সড়কে কিংবা ফুটপাতে মাস্ক ছাড়াই সুন্দর পরিবেশে যাতায়াত করছেন তারা। যখন ঢাকা ও দিল্লিসহ বিশ্বের অন্যান্য শহরগুলোতে বায়ুদূষণে পরিবেশের অবস্থা বিপর্যস্ত, তখন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সবুজের সমারোহে ব্যতিক্রম রাজশাহী নগরী। 

শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও জাতিসংঘের তথ্য (ইউএন ডাটা) মতে, ২০১৬ সালে বাতাসে ভাসমান মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর কণার (পিএম১০ পার্টিকেল) পরিমাণ কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে সারাবিশ্বে সবচেয়ে এগিয়ে ছিল রাজশাহী। বর্তমানে এই শীর্ষস্থান হারালেও বায়ু দূষণের কবল থেকে অনেকটাই মুক্ত সবুজে ঘেরা রাজশাহী নগরী।দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও এর বাস্তবায়নের ফলে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন নগর সংশ্লিষ্টরা।

জানা যায়, বায়ুদূষণ কমাতে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে রাজশাহী শহর কিংবা এর আশেপাশের এলাকায় নেই কোনো ইটভাটা। প্রসঙ্গত, এই ইটভাটার ধোঁয়া আমাদের দেশের বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান উৎস। নগরী ও এর আশেপাশের এলাকা থেকে ইটভাটা সরিয়ে নেওয়ায় এর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রাজশাহী মুক্ত। এর পাশাপাশি অন্যান্য শহরের তুলনায় রাজশাহীতে শিল্প-কারখানার সংখ্যা খুবই কম। যে কারণে পুরো দেশের মধ্যে রাজশাহীর বায়ু সবচেয়ে নির্মল।

রাজশাহীর পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মামুনুর রশীদ ঢাকা ট্রিবিউন’কে বলেন, "বায়দূষণ রোধে নেওয়া বিভিন্ন প্রকল্পের সঠিক বাস্তবায়নের ফলে ২০১৬ সালে বায়ু থেকে ক্ষতিকর কণা কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে সারবিশ্বে সেরা হয় রাজশাহী নগরী। ২০১৯ সালে এসে তা ধরে রাখতে না পারলেও, প্রকল্পের কাজ অব্যাহত থাকায় কমেনি এখানকার বাতাসের মান।"

বায়ু দূষণ রোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নির্মল বাতাস ও পরিচ্ছন্ন এক নগরীতে পরিণত হয়েছে রাজশাহী। ঢাকা ট্রিবিউন

"বায়ুদূষণ রোধে নগরীর শালবনে আমরা একটি যন্ত্র স্থাপন করেছি। যা ৫০০ কিলোমিটার আওতার মধ্যে বায়ু দূষণের পরিমাণ নির্ণয় করে। ফলে পরিস্থিতির অবনতি হলেও আমরা সাথে সাথে জানতে পেরে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারি। এর ফলে দূষণ রোধ করা সম্ভব হয়েছে", যোগ করেন তিনি।

এসবের পাশাপাশি রাজশাহী নগরীতে গ্যাস সরবরাহ শুরু হওয়ায় খড়িচুলার ব্যবহার কমে এসেছে। এটাও বায়ুদূষণ কমার অন্যতম কারণ বলে জানান এই কর্মকর্তা।

এব্যাপারে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. গোলাম সাব্বির সাত্তার বলেন, "এককথায় বর্তমানে রাজশাহীতে কোন শিল্পকারখানা নেই। সেইসাথে প্রচুর গাছও লাগানো হয়েছে। তবে এই পরিবেশ ধরে রাখা কঠিন। কারণ ভবিষ্যতে এই নগরীতে শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে। লক্ষ্য রাখতে হবে যেন এগুলোর উৎপাদন গ্যাস ভিত্তিক হয়।"

"পাশাপাশি ডিজেলচালিত যানবাহন চলাচলে আরও কঠোর হতে হবে। আজকাল ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ব্যবহার অনেক বেড়েছে। এতে করে আগে যে পরিমাণ দূষণ হতো এখন আর তা নেই বললেই চলে", যোগ করেন তিনি।

এছাড়াও সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা অভিযান এই অর্জনের এক বিরাট অংশীদার। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা (মনিটরিং) সাজ্জাদ খান বলেন, "নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডে প্রায় ১৪শ' পরিচ্ছন্নতাকর্মী কাজ করেন। প্রতিদিন রাত ৯টা থেকে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম শুরু হয়। চলে রাত ২টা পর্যন্ত। এতে করে দিনের বেলায় ধুলা কম থাকায় বাতাস থাকে নির্মল।"

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হক বলেন, "২০১৩ সালে রাজশাহী সিটি করপোরেশন প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ পদক পেয়েছে। তার আগের তিন বছর বৃক্ষরোপণে সেরা পদক পেয়েছে। গত ২৫ বছরে নগর সবুজায়নে তারা যে কাজ করেছেন, তার কারণে নগরীর বাতাস নির্মল হয়েছে। সড়কের আইল্যান্ডের মাঝেও বিভিন্নরকম ফুল, ফলের গাছ লাগনো হয়েছে। ফুটপাতগুলোতে আগে ধুলা উড়তো। সেটা কমাতে টাইলস বাসানো হয়েছে। চেষ্টা করা হচ্ছে-পরিবেশ ঠিক রেখে নগরীকে সুন্দরভাবে বাসযোগ্য করে গড়ে তোলা।" 

এসবের পাশাপাশি পদ্মা নদীর পরিত্যক্ত ধারে বর্তমানে পরিকল্পিত পার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। টাইলস দিয়ে হাঁটার পথ তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। সবমিলিয়ে রাজশাহী নগরীর বায়ু এখন এতোটাই নির্মল যে গ্রাম থেকেও মানুষ বিশুদ্ধ বাতাস গ্রহণের জন্য এখানে আসেন।

গোদাগাড়ী উপজেলার পিরিজপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক তিতুমীর বলেন, "আমার গ্রাম ভাটোপাড়ায় কিন্তু সেখানে অত্যধিক ইটভাটা ও কারখানা তৈরি হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। কিন্তু নগরীর পরিবেশ সে তুলনায় অনেক ভালো। তাই গ্রামের অনেক ব্যক্তি এখন শহরমুখী হচ্ছেন। এই শহরের সবকিছুই পরিপাটি। বাতাসটাও পরিষ্কার। আর নদীর ধারে এলে প্রাণ জুড়িয়ে যায়।"