• শুক্রবার, ডিসেম্বর ০৪, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ১১:৫০ রাত

ভিন্ন নামে জাবিতে রমরমা বাণিজ্যিক কোর্স

  • প্রকাশিত ০৬:১১ সন্ধ্যা ডিসেম্বর ১৯, ২০১৯
জাবি
ছবি: ঢাকা ট্রিবিউন

শুধুমাত্র নামে পার্থক্যের কারণে ইউজিসির নির্দেশনা মানার প্রয়োজনীয়তা মনে করছে না বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ

বাণিজ্যিক কোর্স সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করছে এবং এতে ক্যাম্পাসের সার্বিক পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে, সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের এমন মন্তব্যের পর সান্ধ্যকালীন কোর্স বন্ধ করাসহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা নীতির ক্ষেত্রে ১৩ দফা সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। গত ১১ ডিসেম্বর এসব নির্দেশনা সংক্রান্ত একটি চিঠি পাঠানো হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের কাছে। বিষয়টি জানানো হয় প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির কার্যালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে।

তবে ইউজিসি'র নির্দেশনার ফাঁকা গলে “উইকেন্ড কোর্সের” (সাপ্তাহিক) নামে রমরমা বাণিজ্যিক কোর্স পরিচালনা করছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি)। শুধুমাত্র নামে পার্থক্যের কারণে ইউজিসির নির্দেশনা মানার প্রয়োজনীয়তা মনে করছে না বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগ ও ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৬টি বিভাগ এবং দুটি ইনস্টিটিউটে সান্ধ্যকালীন ও উইকেন্ড কোর্স পরিচালিত হচ্ছে। বিভাগগুলো হলো- আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ইংরেজি, অর্থনীতি, ভূগোল ও পরিবেশ, সরকার ও রাজনীতি, লোক প্রশাসন, গাণিতিক ও পদার্থ বিষয়ক অনুষদে কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, পরিবেশ বিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত ও পরিসংখ্যান, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং, মার্কেটিং, একাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস ও ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ। দুটি ইনস্টিটিউট হলো- ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি ও ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। এসব বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে “উইকেন্ড” নামে পরিচালিত হচ্ছে বাণিজ্যিক কোর্স।

সান্ধ্য ও উইকেন্ড কোর্সগুলোতে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা সাধারণত এক থেকে দুই বছরের মধ্যে তাদের কোর্স শেষ করেন। স্নাতকোত্তর শ্রেণির এসব কোর্স ভেদে জাবিতে একজন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে নেওয়া হয় ৯৫ হাজার থেকে শুরু করে দুই লাখেরও বেশি টাকা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সান্ধ্য ও উইকেন্ড কোর্সে এক বছরে (তিন সেমিস্টার) ভর্তি হন আনুমানিক ২৫০০ শিক্ষার্থী। এসব শিক্ষার্থীর কাছ থেকে বছরে বিভাগ ও ইনস্টিটিউটগুলোর আয় প্রায় সাড়ে ৩৬ কোটি টাকা। এই আয়ের ৪০ শতাংশ অর্থ বিভাগ ও ইনস্টিটিউটগুলো বিশ্ববিদ্যালয়কে দেওয়া হয় বলে দাবি করলেও প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সব বিভাগ ও ইনস্টিটিউট যথাযথভাবে বিশ্ববিদ্যালয়কে অর্থ দিচ্ছে না।

এমন পরিস্থিতির মধ্যেই “উইকেন্ড কোর্স” চালু থাকা বিভাগগুলোতে নতুন সেমিস্টারে শিক্ষার্থী ভর্তির তোড়জোড় চলছে। আর যেসব বিভাগে এ প্রোগ্রাম চালু নেই তারাও বাড়তি অর্থের লোভে “উইকেন্ড কোর্স”-এর নামে বাণিজ্যিক কোর্স চালুর পায়তারা করছেন।

প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের ১০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত সাধারণ সভায় সপ্তাহে দুইদিন প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধের জন্য সিন্ডিকেটের কাছে সুপারিশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সে অনুযায়ী সমিতির নেতারা সপ্তাহে দু’দিন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখার প্রস্তাব দিলে ওই বছরের ২১ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের বিশেষ সভায় শিক্ষকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সপ্তাহে দুইদিন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই বছরের ডিসেম্বর থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়। মূলত বিশ্রামের কারণেই শিক্ষকরা দু'দিন সাপ্তাহিক ছুটির সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

বাস্তব চিত্র হলো, দু’দিন ছুটির সিদ্ধান্ত কার্যকরের পর থেকেই সপ্তাহের দুই ছুটির দিন (শুক্র ও শনি) সকাল নয়টা থেকে সন্ধ্যা এমনকি রাত পর্যন্ত সাপ্তাহিক কোর্সের ক্লাস-পরীক্ষা নিতেই ব্যস্ত সময় পার করছেন। বেতনের থেকে কয়েকগুণ বেশি অর্থ আয়ের সুযোগ থাকায় শিক্ষকরা নিয়মিত শিক্ষার্থীদের ক্লাস-পরীক্ষা না নিলেও সান্ধ্য ও উইকেন্ড কোর্সের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে অনেক বেশি সক্রিয় থাকেন বলে অভিযোগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের।

এসব বাণিজ্যিক কোর্স থেকে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা আয় করেন মোটা অংকের অর্থ। তাই শুধুমাত্র ছুটি ও শারীরিক অসুস্থতাজনিত কারণ ছাড়া এসব কোর্সে তারা সচরাচর অনুপস্থিত থাকেন না।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, প্রতি উইকেন্ড কোর্সের জন্য প্রতি সেমিস্টারে (চার মাস অন্তর) একজন প্রভাষক ৭৫ হাজার, সহকারী অধ্যাপক ৮৫ হাজার, সহযোগী অধ্যাপক ৯৫ হাজার এবং অধ্যাপক প্রতি সেমিস্টারে এক লাখ দশ হাজার টাকা পেয়ে থাকেন। আবার সেমিস্টারে একাধিক কোর্স পড়ানো শিক্ষকদের আয় আরও বেশি।

সাপ্তাহিক এসব কোর্সের আয়ের অর্থের ভাগ যায় প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারাদের পকেটেও। ২০১৮ সালে সিন্ডিকেটের ৩০৩তম সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ কমিটি সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে দাপ্তরিকভাবে শীর্ষ কর্মকর্তাদের সম্মানীর হার নির্ধারণ করা হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাণিজ্যিক কোর্সগুলো থেকে উপাচার্য পান মাসিক ৫০ হাজার টাকা, উপ-উপাচার্যরা (দুইজন) ৪০ হাজার, কোষাধ্যক্ষ ৩৫ হাজার ও রেজিস্ট্রার ২৫ হাজার টাকা। এছাড়া, ১৬ টি আবাসিক হলের প্রাধ্যক্ষরা পান ২ হাজার ৪০০ টাকা করে।

এছাড়া ফলাফল প্রকাশ, সনদপত্র, ট্রান্সক্রিপ্ট প্রদানসহ আনুষঙ্গিক অন্যান্য কাজের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরের ১২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করেন। এরমধ্যে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মাসিক ৫ হাজার ৬০০ টাকা, উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ৩ হাজার ২০০ টাকা, সহকারী নিয়ন্ত্রক ও অন্যান্য ১ হাজার ৭০০ টাকা করে পান। এছাড়া তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী ও পিয়নরা পান ১ হাজার ৩০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত।

এদিকে, কয়েকটি বিভাগে নতুন করে উইকেন্ড কিংবা সান্ধ্যাকালীন কোর্স চালু করায় শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে নূন্যতম যোগ্যতার দিকে লক্ষ্য রাখছেন না। নিয়মানুযায়ী, এসব কোর্সে ভর্তি হওয়ার ক্ষেত্রে পরীক্ষা (লিখিত ও বহুনির্বাচনী) নেওয়ার কথা থাকলেও কম শিক্ষার্থী ভর্তি হতে আসায় শুধুমাত্র মৌখিক পরীক্ষা নিয়েই তাদের ভর্তি করানো হচ্ছে।

সান্ধ্য ও উইকেন্ড কোর্সের বিষয়ে দর্শন বিভাগের অধ্যাপক রায়হান রাইন ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “উইকেন্ড ও সান্ধ্যকোর্সে জড়িত বিভাগগুলোর শিক্ষকরা ছুটির দিনেও বিশ্রামের সুযোগ পান না। এছাড়া অনেক শিক্ষক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেন। ফলে তারা বিভাগের নিয়মিত ক্লাস নিতে ব্যর্থ হন। এতে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) থেকে সান্ধ্যকোর্স বন্ধের বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছে। সান্ধ্য কিংবা উইকেন্ড আলাদা কিছু না। তাই আমার মনে হয়, উইকেন্ড কোর্সকেও ইউজিসির নির্দেশনার আওতাধীন করা উচিৎ। কারণ এতে শিক্ষার্থীরা লাভবান না বরং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”

নাম প্রকাশ না করা শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেন, “বিভাগগুলো ঠিকভাবে ৪০ শতাংশ অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়কে দিচ্ছে না। আর ইউজিসি সান্ধ্যকোর্স বন্ধের নিদের্শনা দিয়েছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে সান্ধ্যকোর্স নয় বরং উইকেন্ড কোর্স আছে। তাই এটা বন্ধের বিষয়ে আমরা ভাবছি না। আর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সিন্ডিকেট নেবে।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের সান্ধ্য ও উইকেন্ড কোর্সের দায়িত্বে থাকা উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) আমির হোসেন বলেন, “ইউজিসি সান্ধ্য প্রোগ্রামগুলো বন্ধ করার নিদের্শনা দিয়েছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যেহেতু উইকেন্ড প্রোগ্রাম চালু আছে সেহেতু এখন বিষয়টি নিয়ে ভাবছি না। তবে উইকেন্ড প্রোগ্রাম বন্ধের ঘোষণা কিংবা নিদের্শনা দিলে আমরা তখন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করব।”

55
50
blogger sharing button blogger
buffer sharing button buffer
diaspora sharing button diaspora
digg sharing button digg
douban sharing button douban
email sharing button email
evernote sharing button evernote
flipboard sharing button flipboard
pocket sharing button getpocket
github sharing button github
gmail sharing button gmail
googlebookmarks sharing button googlebookmarks
hackernews sharing button hackernews
instapaper sharing button instapaper
line sharing button line
linkedin sharing button linkedin
livejournal sharing button livejournal
mailru sharing button mailru
medium sharing button medium
meneame sharing button meneame
messenger sharing button messenger
odnoklassniki sharing button odnoklassniki
pinterest sharing button pinterest
print sharing button print
qzone sharing button qzone
reddit sharing button reddit
refind sharing button refind
renren sharing button renren
skype sharing button skype
snapchat sharing button snapchat
surfingbird sharing button surfingbird
telegram sharing button telegram
tumblr sharing button tumblr
twitter sharing button twitter
vk sharing button vk
wechat sharing button wechat
weibo sharing button weibo
whatsapp sharing button whatsapp
wordpress sharing button wordpress
xing sharing button xing
yahoomail sharing button yahoomail