• বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ১২:০১ দুপুর

গ্রেফতার, পুলিশি হেফাজতে টাকা ‌‘লেনদেন’ ও একটি রহস্যজনক মৃত্যু!

  • প্রকাশিত ০৮:৩৮ সকাল জানুয়ারী ৪, ২০২০
আলমগীর উত্তরা পুলিশ মৃত্যু
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আলমগীর মিয়া পুলিশি নির্যাতনে মারা গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে ঢাকা ট্রিবিউন

কিভাবে ও কেন পুলিশি হেফাজতে থাকা অবস্থায় স্ত্রীকে ফোন করে তিনি ৫০ হাজার টাকা লোকমারফত থানায় পাঠাতে বলেছিলেন, তা একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে

ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগে উত্তরা থানা পুলিশের হাতে গত ১৬ ডিসেম্বর আটক হন আলমগীর হোসেন (৩৮) নামে এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।

চারদিন উত্তরা পুলিশ ও কেরাণীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারা হেফাজতে থাকার পর ২১ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে মারা যান তিনি।

পুলিশ তাকে ইয়াবা ব্যবসায়ী বললেও স্ত্রী আলো বেগমের অভিযোগ, তার নির্দোষ স্বামীকে পুলিশ “হাতে ইয়াবা ধরিয়ে দিয়ে ব্যবসায়ী সাজিয়েছে। পুলিশের নির্যাতনেই তার মৃত্যু হয়।”

ঢাকা ট্রিবিউনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, থানা হেফাজতে থাকা অবস্থায় আলমগীর মুঠোফোন ব্যবহার করে তার স্ত্রীর কাছে ৫০ হাজার টাকা থানায় পাঠাতে বলার বিষয়টি।

পুলিশ বাদী হয়ে করা মামলাটিতে তিন প্রত্যক্ষদর্শীর একজন পুলিশ সদস্য, অন্য দুইজন রাসেল ও শামীম নামে দুই সহোদর পুলিশের সোর্স (তথ্যদাতা)। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, আলমগীর হোসেনকে ১৬ ডিসেম্বর রাত সোয়া ৯টার দিকে উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টর গাউসুল আজম ব্রিজের উত্তর পাশে তল্লাশির পর ৮০ টি ইয়াবাসহ আটক করে থানা হেফাজতে নেওয়া হয়।

কিন্তু গ্রেফতারের প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে রাত ১০টা ৭ মিনিটে পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় স্ত্রী আলো বেগমকে ফোন করে এক ব্যক্তির কাছে ৫০ হাজার টাকা পাঠাতে বলেন আলমগীর। আলমগীরকে আটকের পর তার মুঠোফোন ও মানিব্যাগ জব্দ করে পুলিশ। কারা হেফাজতে তার মৃত্যুর পর স্ত্রীর কাছে সেসব হস্তান্তর করা হয়।

কিন্তু কিভাবে ও কেন পুলিশি হেফাজতে থাকা অবস্থায় আলমগীর তার স্ত্রীকে ফোন করে ৫০ হাজার টাকা লোকমারফত থানায় পাঠাতে বলেছিলেন, তা একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।

ঢাকা ট্রিবিউনের সংগ্রহে ১ মিনিট ২ সেকেন্ডের সেই কথোপকথনের রেকর্ডও রয়েছে।

মুঠোফোনে আলমগীর স্ত্রীকে লালু নামে এক ব্যক্তির কাছে ৫০ হাজার টাকা পাঠিয়ে দিতে বলেন। লালুর কাছে কিছু জিজ্ঞেস করতে স্ত্রীকে নিষেধ করেন আলমগীর। অন্য লোকের হাতে কেন টাকা দিতে হবে জানতে চাইলে তিনি স্ত্রীকে বলেন, “৫০ হাজার টাকা দিতে হবে (গোঙানির শব্দ...) তাড়াতাড়ি। আর আমারে ফোন দিওনা। ফোন দিলে পুলিশে ধরবে খবরদার।”

পুলিশ হেফাজতে থাকা আলমগীর আরও বলেন, “৫০ হাজার টাকা দাও। কাউকে কিছু বলার দরকার নাই।”

কথোপকথনের শেষদিকে তিনি বলেন, “আর আমার নম্বরে ফোন দিও না গো। আমি একেবারে শেষ হয়ে যাবো। ....লাভের ওপর লাগলে (প্রয়োজনে সুদে) বাড়িওয়ালার কাছ থেকে নাও।” এরপর তিনি মুঠোফোনে লালুর সঙ্গে কথা বলতে চান।

১৬ ডিসেম্বর রাতে কী ঘটেছিল?

উত্তরা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মিজানুর রহমানের দায়ের করা মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, “রাত সোয়া নয়টায় রাস্তায় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে একজন লোক দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে তাকে আটক করি। তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে সাক্ষী মো. রাসেল ও শামীমের সামনে তল্লাশি করে আলমগীরের প্যান্টের পকেটে পলিথিনে মোড়ানো ৮০ পিস ইয়াবা জব্দ করি। আটক ব্যক্তি পেশাদার মাদক ব্যবসায়ী।”

ঘটনার অনুসন্ধানে গাউসুল আজম ব্রিজে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় সাক্ষী রাসেল ও শামীম ফুটপাত ঘেঁষে চটপটির দোকান নিয়ে বসেছেন। তার আনুমানিক ৫ ফিট পেছনেই পুলিশ বক্স। মামলার বাদী এসআই মিজানুর রহমান সেখানে নিয়মিতই আসা-যাওয়া করেন।

রাসেল ও শামীম ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, আলমগীরের চেহারা ইয়াবা সেবনকারীর মতো। আমাদের সামনেই পুলিশ তাকে ইয়াবাসহ আটক করে।

চেহারা দেখে একজন মানুষকে কীভাবে ইয়াবা সেবনকারীর মতো মনে হতে পারে? এই প্রশ্নের জবাবে সহোদরেরা বলেন, আমরা এর আগেও বহু ইয়াবা সেবনকারীকে দেখেছি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ধারণা করে বলছি।

তাদের দোকানের পাশের ফুটপাতে রয়েছে একাধিক দোকান। সেখানকারই এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "তারা (রাসেল ও শামীম) দুই ভাই মূলত পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করে। তাদের দোকানের পেছনে পুলিশ বক্স থাকায় তাদের সঙ্গে এসআই মিজানুর রহমানের সম্পর্কও অনেক দিনের।"

উত্তরা পশ্চিম থানা। ছবি: ফেসবুককথা হয় আলমগীর যে ব্যক্তির হাতে টাকা দিতে বলেছিলেন সেই লাল মিয়া ওরফে লালুর সঙ্গে। তিনি উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর সড়কের মুখে জুতা সারাইয়ের কাজ করেন। ঢাকা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, “পূর্ব পরিচিত আলমগীর ওই রাতে তার মুঠোফোনে কল করে বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে যেন তার বাসায় গিয়ে স্ত্রীর কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা নিয়ে উত্তরা পশ্চিম থানায় পৌঁছে দেই। কথা অনুযায়ী আমি টাকা নিয়ে উত্তরা পশ্চিম থানায় গেলে লকআপে আলমগীরকে দেখি। কিছুক্ষণ পর এসআই মিজানুর রহমান আমার সামনে আলমগীরকে নিয়ে আসেন।”

লালু বলেন, “আমি টাকা দিতে গেলে সেখানে উপস্থিত শান্ত নামে এক যুবক এসআই মিজানের সামনেই আমাকে গালিগালাজ করেন। এরপর আমি টাকা নিয়ে থানা থেকে চলে আসি। পরদিন সকালে আলমগীরের স্ত্রীকে ওই টাকা ফেরত দেই।”

তবে টাকা ফেরত পাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে আলমগীরের স্ত্রী আলো বেগম দাবি করেছেন, “লালও হয়তো পুলিশের ভয়ে শেখানো কথা বলছেন। সে আমাকে ওই টাকা ফেরত দেয়নি।”

আলো জানান, লোক খাটিয়ে তিনটি ভ্যানে করে পোশাক ও জুতার ব্যবসা করতেন তার স্বামী। সেই ভ্যানগুলো নিয়েই শান্তর সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব ছিল। ঘটনার দিনই (১৬ ডিসেম্বর) আলমগীর ভ্যানগুলো বিক্রি করে দেন। লালুর মাধ্যমে পাঠানো ৫০ হাজারসহ ভ্যান বিক্রির ৩৫ হাজার টাকা পুলিশ নিয়ে গেছে বলে দাবি করেন তিনি।

পুলিশি নির্যাতন

আলো বেগমের অভিযোগ, উত্তরা পশ্চিম থানা হেফাজতে থাকা অবস্থায় আলমগীরের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে পুলিশ।

তিনি বলেন, “আদালতে নেওয়ার জন্য যখন গাড়িতে তোলার সময় সে খুবই অসুস্থ ছিল। কয়েকজন মিলে টেনে নিয়ে তাকে গাড়িতে তোলে। এমনকি এক পুলিশ সদস্য বিদ্রুপের সুরে বলেন, তোর স্বামীকে অনেক পিটিয়েছি। এরপরও কিছু বলছে না।”

আলো আরও বলেন, “তারা তাকে নির্যাতন করে মেরে ফেলেছে।”

উল্লেখ্য, আইন ও শালিস কেন্দ্রের (আসক) কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী গত বছরই পুলিশ হেফাজতে অন্তত ১৪ ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গত ১ জানুয়ারি উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুঠোফোনে ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “১৩ দিন পর আপনারা এটা নিয়ে কী নিউজ করবেন? নিউজ করলে অনুসন্ধান করেন।” এ কথা বলেই তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

আর একাধিকবার চেষ্টা করেও উত্তরা জোনের ডিসি ও এডিসির কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে, ডিএমপি উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, এই ঘটনায় কেউ আমাদের কাছে অভিযোগ করলে আমরা ব্যবস্থা নেব। আমরা এখনও কোনো অভিযোগ পাইনি।

শরীরে জখমের চিহ্ন

আলমগীরকে আটকের পরদিন তাকে আদালতের মাধ্যমে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, কেরাণীগঞ্জের সিনিয়র জেল সুপার ইকবাল কবীর চৌধুরী বলেন, অসুস্থ হয়ে পড়ায় আলমগীরকে ২১ ডিসেম্বর দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেখানে মারা যান তিনি।

তবে অসুস্থতার কারণ সম্পর্কে কিছু বলতে পারেননি জেল সুপার।

যদিও ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ বলেছেন, “মরদেহের নিতম্বে কিছু জখমের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তার হৃদযন্ত্রেও সমস্যা পাওয়া গেছে। ভিসেরা পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর সঠিক কারণ বলা যাবে।”

সিসিটিভি ফুটেজ থেকে সংগ্রহ করা যেতে পারে আলামত

পুলিশ হেফাজতে মুঠোফোন ব্যবহারের আইনি বৈধতা সম্পর্কে জানতে চাইলে আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, আটক ব্যক্তির কাছ থেকে ঘুষ দাবি তো দূরের কথা, তাকে মুঠোফোন ব্যবহার করতে দেওয়াটাও আইনের লঙ্ঘন। আইনানুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার পর দেহ তল্লাশি করে সঙ্গে থাকা মুঠোফোন, ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস, মানিব্যাগসহ গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান জিনিসগুলো জব্দ করার কথা।

সুপ্রিমকোর্টের এই আইনজীবী মনে করেন, গ্রেফতারের পর কোনো আসামি শারীরিক জখম পেয়ে মারা গেলে বোঝা যায়, পুলিশ হেফাজতে তিনি নির্যাতনের সম্মুখীন হয়েছেন। বিষয়টির সত্যতা প্রমাণে থানার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।

তিনি বলেন, “জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে পুলিশের উচিৎ দায়ী সদস্যদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়েরসহ উচ্চতর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া।”

কিন্তু, এ ধরনের বেশিরভাগ মামলার ক্ষেত্রেই পুলিশ সদস্যরা লঘু শাস্তি যেমন প্রত্যাহার অথবা আর্থিক জরিমানার মতো লঘু শাস্তিতেই পার পেয়ে যান, বলেন শাহদীন মালিক।