• সোমবার, ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ১২:৪০ রাত

প্রশাসনের নাকের ডগায় অবৈধ ইটভাটা, হুমকিতে পরিবেশ-কৃষি

  • প্রকাশিত ০৬:০৪ সন্ধ্যা জানুয়ারী ৮, ২০২০
বগুড়া
ইউএনবি

ফসলি জমির মাটি কাটার কারণে জমিগুলো উর্বরতা শক্তি হারাচ্ছে, শত শত একর জমি পরিণত হয়েছে ডোবা-নালায়

বগুড়া জেলার শাহজাহানপুর উপজেলায় স্কুল ও কলেজের আশপাশে আবাদযোগ্য জমিতে শতাধিক অবৈধ ইটভাটা গড়ে তুলেছে একটি শক্তিশালী চক্র। যারা ইট তৈরির জন্য আবাদযোগ্য জমির উর্বর মাটি কেটে ফেলছে এবং কৃষিকাজের জন্য ব্যবহার অযোগ্য করে তুলছে।

ভূমিদস্যুদের দৌরাত্ম্যে কৃষি উর্বর জমিগুলো একের পর এক ডোবা-নালা ও গর্তে পরিণত হচ্ছে। আর এসব ঘটছে প্রশাসনের নাকের ডগায়।

স্থানীয়রা বলছেন, তারা প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানালেও অবস্থার কোনো পরিবর্তন আসেনি। তারা বলেন, এসব ইটভাটায় মাটি সরবরাহের জন্য মালিক ও সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট স্থানীয় প্রশাসনের কতিপয় কর্মকর্তাদেরকে ম্যানেজ করে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই আবাদি জমির উর্বর মাটি কেটে দেদারছে নিয়ে যাচ্ছে। বাধা দিতে গেলে তাদেরকে জীবননাশের হুমকি দেওয়া হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বলেন, “মাটি কাটার বিরুদ্ধে কেউ কথা বলার সাহস পায় না।”

ইট উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ বাংলাদেশ। ২০১৭ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী- বাংলাদেশে সাত হাজারেরও বেশি ইটভাটা রয়েছে এবং বছরে ২৩ বিলিয়ন ইট উৎপাদন হয়।

২.৫৩ বিলিয়ন ডলারের এই শিল্পটি জিডিপির প্রায় ১ শতাংশ হিসাবে কাজ করে এবং এক মিলিয়নেরও বেশি লোকের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। এটি ৩.৩৫০ বিলিয়ন ঘনফুট মাটি ব্যবহার করে এবং প্রতি বছর ৫.৬৮ মিলিয়ন টন কয়লা ব্যবহার করে। এই খাতটি ১৫.৬৭ মিলিয়ন টন কার্বনডাই অক্সাইড নির্গত করার জন্য দায়ী।

বাংলাদেশ ইট প্রস্তুতকারী মালিক সমিতির মহাসচিব আবু বকর ইউএনবি’কে বলেন, এই শিল্প প্রতিবছরে প্রায় দশ শতাংশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

শাজাহানপুর পরিসংখ্যান অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার মোট আবাদি জমির পরিমান ১৬ হাজার ১৮০ হেক্টর এবং ইটভাটার সংখ্যা শতাধিক।

উপজেলার মাদলা, খোট্রাপাড়া, মাঝিড়া ইউনিয়ন ইউএনবি’র এই প্রতিনিধি দেখেন, কৃষি জমির উপরিভাগের মাটি (টপ সয়েল), আবার কোথাও কৃষি জমির মাটি গভীর গর্ত করে স্কেভেটর দিয়ে তুলে প্রতিদিন শত শত ট্রাকে ভূমিদস্যুরা বিভিন্ন ইটভাটায় বিক্রি করছে।

অতিরিক্ত মাটি সরানোর কারণে ইতোমধ্যেই খোট্রাপাড়া ইউনিয়নের জালশুকা ও চান্দাই এলাকার আবাদি জমিগুলো বিশাল বিলে পরিণত হয়েছে।

শাহজাহানপুর উপজেলার মাদলা, মালিপাড়া, জালশুকা, চান্দাই, সাজাপুর, বেলপুকুর, ডুমুনপুকুর, চকজোড়া, খলিশাকান্দি, দুবলাগাড়ি, দুরুলিয়া, ঘাষিড়া, পারতেখুর, ফটকি, জামুন্না ও দাড়িগাছা এলাকার কৃষি জমিগুলো বড় বড় গর্ত, ডোবা-নালা, পুকুর ও জলাশয়ে পরিণত হয়েছে।

শুধু তাই নয়, ফসলি জমির মাটি কাটার কারণে জমিগুলো উর্বরতা শক্তি হারাচ্ছে, ফলে বিলুপ্ত হয়েছে শত শত একর কৃষি জমি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নূরে আলম বলেন, “মোটা অঙ্কের টাকার লোভে ভূমিদস্যুরা ক্ষতিকর এসব কাজ করছেন। জমির উপরিভাগের চার-ছয় ইঞ্চি মাটিতেই মূলত বেশি পুষ্টি থাকে, যা ফসল উৎপাদনে সহায়ক। তারা বুঝতে পারছে না যে, ভবিষ্যতে এ জমি পরিত্যক্ত হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া জমির হারানো পুষ্টি ফিরে পেতেও ১৫ থেকে ২০ বছর সময় লাগবে।”

তিনি আরও বলেন, “এ উপজেলার কৃষি জমিগুলো অত্যন্ত উর্বর। অল্প খরচে প্রচুর শস্য উৎপাদন হয়। ফলে সারাবছর এ উপজেলা থেকে খাদ্যশস্য ও প্রতিদিন শত শত ট্রাকে বেগুন, মরিচ, আলুসহ দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কৃষি পণ্য ঢাকা চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যায় এবং দেশের খাদ্য চাহিদা পূরণ করে। অবৈধভাবে মাটি কাটার কারণে হুমকিতে রয়েছে কৃষি উৎপাদন।”

শাজাহানপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদা পারভিন জানান, তারা যখন অভিযান পরিচালনা করেন তখন ভূমিদস্যুদের পাওয়া যায় না।

তাহলে ভূমিদস্যুদের দৌরাত্ম্যের কাছে প্রশাসন ব্যর্থ কিনা এমন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর এড়িয়ে তিনি বলেন, “যাদের অসুবিধা হচ্ছে তারা আদালতে মামলা দায়ের করতে পারেন।”