• শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ১২:৫৪ দুপুর

‘পানিপথে মালয়েশিয়া যাচ্ছি, ট্রলারে উঠেছি, এখনই রওনা দেব’

  • প্রকাশিত ০৯:৫৫ রাত জানুয়ারী ১৩, ২০২০
যশোর
বাঁ থেকে অমিত হাসান মুকুল, আজিজুর রহমান, ফুলজার হোসেন, শরিফুল ইসলাম খোকন, শফিকুল ইসলাম। আজিজুর রহমান/সৌজন্য

২০১৩ সালের ১২ জুন বাড়িতে ফোন করে অমিত হাসান মুকুল বলেন, ‘আমরা সবাই পানিপথে মালয়েশিয়া যাচ্ছি। ট্রলারে উঠেছি, এখনই রওনা দেব, ওই কথাই ছিল পরিবারের সঙ্গে তাদের শেষ কথা’

যশোরের চৌগাছায় দালালের খপ্পরে পড়ে দীর্ঘ সাত বছর নিখোঁজ রয়েছেন একই পরিবারের চারজনসহ সাত ব্যক্তি। মালয়েশিয়ায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফেরেননি তারা। 

ঘটনার প্রায় সাত বছর পর রবিবার (১২ জানুয়ারি) রাতে এক দালালকে চৌগাছা শহর থেকে ধরে পুলিশে দেওয়া হয়েছে। ওই রাতেই নিখোঁজ অমিত হাসান মুকুলের বাবা আতিয়ার রহমান চৌগাছা থানায় মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে একটি মামলা করেন। 

পুলিশ এ মামলায় পরিবারের লোকদের হাতে পাকড়াও দালাল ফজলুর রহমান রাজুকে (৪৮) গ্রেফতার করে।

চৌগাছা থানায় দায়ের ভুক্তভোগী পরিবারের লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, চৌগাছা উপজেলার পাতিবিলা ইউনিয়নের মুক্তদাহ গ্রামের আতিয়ার রহমানের ছেলে অমিত হাসান মুকুল (৩০), অমিত হাসান মুকুলের চাচাতো ভাই আজিজুর রহমান (৪০), ছোটচাচা ফুলজার হোসেন (৪৬), জ্ঞাতি চাচা শরিফুল ইসলাম খোকন (৪০) এবং একই গ্রামের মৃত আত্তাপ হোসেনের ছেলে শফিকুল ইসলাম (২৭), রোস্তমপুর গ্রামের মৃত সেকেন্দার আলীর ছেলে রমজান আলী (৪৫) ও ফুলসারা ইউনিয়নের দুর্গাবরকাটি গ্রামের উসমান আলীর ছেলে লিটন হোসেন (২৭) ২০১৩ সালের ১ জুন মালয়েশিয়ায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হন। এরপর থেকেই তারা নিখোঁজ রয়েছেন। 

এদের মধ্যে প্রথম ৫ জনের নিখোঁজের ঘটনায় চৌগাছা থানায় মামলা হয়েছে।

নিখোঁজ অমিত হাসান মুকুলের চাচাতো ভাই আনোয়ার হোসেন মিলন ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, জনপ্রতি ৩ লাখ টাকায় মালয়েশিয়ায় যাওয়ার প্রলোভনে দরিদ্র পরিবারের এসব ব্যক্তিরা আদম ব্যাপারির খপ্পড়ে পড়েন। মুক্তদাহ গ্রামে বিয়েসূত্রে বসবাসকারী সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার রতনপুর ইউনিয়নের গোয়ালপোতা গ্রামের ইসমাঈল হোসেনের ছেলে ফজলুর রহমান রাজু তাদের ফুঁসলিয়ে পানিপথে (বঙ্গোপসাগর দিয়ে) মালায়েশিয়ার উদ্দেশে পাঠানোর পর থেকে আজও তারা নিখোঁজ রয়েছেন। ২০১৩ সালের ১ জুন বাড়ি থেকে একযোগে বের হন তারা। ১২ জুন অমিত হাসান মুকুল বাড়িতে ফোন করে বলেন, ‘আমরা সবাই পানিপথে মালয়েশিয়া যাচ্ছি। ট্রলারে উঠেছি, এখনই রওনা দেব’, ওই কথাই ছিল পরিবারের সঙ্গে তাদের শেষ কথা।”

গ্রেফতারকৃত দালাল ফজলুর রহমান রাজু। ঢাকা ট্রিবিউন

মুকুলের স্ত্রী চামেলী খাতুন সাংবাদিকদের বলেন, যে নাম্বার থেকে ফোন দিয়েছিল, পরে তা বন্ধ পেয়েছি। বারবার চেষ্টা করেও ফোনে কাউকে পাওয়া যায়নি। এরপর ছয়টি বছর কেটে গেলেও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি।

তারা জানায়, নিখোঁজের তিনমাস পর তারা আদম ব্যাপারি রাজুর কাছে যান। স্বজনদের ফেরত পেতে চাপ দিতে থাকেন। এ সময় রাজু তার সহযোগী চট্টগ্রামের টেকনাফের রাশেদুল ইসলামের সঙ্গে তাদের কথা বলিয়ে দেন। রাশিদুল তাদের আশ্বস্ত করেন- কোনও সমস্যা নেই, তারা দুই-একদিনের মধ্যেই মালয়েশিয়ায় পৌঁছে যাবেন। 

এর কিছুদিন পর দালাল রাজু তার স্ত্রীকে তালাক দিয়ে রাতের আঁধারে আত্মগোপনে চলে যান। পরে দু’দালালের ব্যবহৃত মোবাইলফোনও বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর রাজু একই উপজেলার মাধবপুর গ্রামের আতিয়ার রহমানের মেয়ে রনি বেগমকে বিয়ে করেন। সেখানে যাতায়াত করলেও নিখোঁজদের পরিবারগুলো তা জানতেন না। দীর্ঘ প্রায় ৭ বছর পর রবিবার রাতে রাজুকে চৌগাছা বাজারে দেখতে পেয়ে ওই পরিবারের সদস্যরা ধরে তাকে মুক্তদাহ গ্রামে নিয়ে যান। পরে তাকে চৌগাছা থানায় সোপর্দ করে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। 

নিখোঁজ মুকুলের বাবা আতিয়ার বলেন, ঘটনার প্রথম দিকে সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় অনেক খোঁজ করেছি। কিন্তু আদম ব্যাপারিদের সন্ধান পাইনি। আমার ছেলেসহ চৌগাছার ৭ জন, ঝিকরগাছা উপজেলার আরও আটজন এই দালালদের খপ্পরে পড়ে পানিপথে মালয়েশিয়ায় রওনা দেয়। প্রায় সাত বছর পার হতে চললেও কারও সন্ধান মেলেনি। অবশেষে রবিবার সন্ধ্যায় দালাল রাজুকে চৌগাছা বাজারে দেখতে পেয়ে কৌশলে গ্রামে নিয়ে যাই। অনেক জিজ্ঞাসাবাদেও সে কিছুই বলেনি। অবশেষে আমরা তাকে পুলিশে দিয়েছি এবং মামলা করেছি।

চৌগাছা থানার ওসি (তদন্ত) এবং এই মামলার তদন্তকারী অফিসার এনামুল হক ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “ পাঁচ জনের নিখোঁজের ঘটনায় মামলা হয়েছে। গ্রেফতার দালাল রাজুকে মানব পাচার প্রতিরোধ আইনের মামলায় আদালতে পাঠানো হয়েছে। আমরা তার রিমান্ড চাইবো।”