• শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ১২:২২ দুপুর

গরীবের হোটেল রবিনহুড

  • প্রকাশিত ০৫:১১ সন্ধ্যা জানুয়ারী ২১, ২০২০
গরীবের হোটেল রবিনহুড
টাঙ্গাইল শহরের শহীদ মিনার চত্বরে প্রতি শুক্রবার জুমআর নামাজের পর পেটপুরে আহার করানো হয় দরিদ্রদের। ঢাকা ট্রিবিউন

ইউরোপের একটি হোটেলে বিনামূল্যে গরীব মানুষদের খাওয়ানো হয়। সেই হোটেলের নাম ‘রবিনহুড’

টাঙ্গাইল শহরের শহীদ মিনার। প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজের পর সেখানে হাজির হয় দুই শতাধিক মানুষ। সবাই সুশৃঙ্খলভাবে বসে পড়ে শহীদ মিনার চত্বরেই। তারপর শুরু হয় পেটপুরে আহার। আর এই খাবার মেলে বিনামূল্যেই। 

দরিদ্রদের জন্য এই ব্যবস্থা করেছেন টাঙ্গাইল শহরের নিরালা রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী মির্জা মাসুদ রুবল। তিনি এই আয়োজনের নাম দিয়েছেন "গরীবের হোটেল রবিনহুড"। 


কেন এই নাম

রুবল বলেন, "ইউরোপের একটি হোটেলে বিনামূল্যে গরীব মানুষদের খাওয়ানো হয়। সেই হোটেলের নাম ‘রবিনহুড’। আমি সেই নাম থেকে রবিনহুড নাম নিয়ে এই নাম দিয়েছি। তারা হোটেলের ভেতরে খাওয়ায়। আর আমি হোটেলের বাইরে খোলা জায়গায় ব্যবস্থা করে থাকি। যাতে গরীবদের মধ্যে এই খবর পৌঁছে যায় এবং তারা সময় মতো এখানে এসে একত্রে বসে খেতে পারে।"

তিনি আরও বলেন, "গরিবের হোটেল রবিনহুড" সত্যি গরীব মানুষের জন্য সপ্তাহে একদিন বিনামূল্যে খাবার তুলে দিচ্ছে। আড়াই বছরের বেশি সময় ধরে চলছে এই আয়োজন।

টাঙ্গাইল শহরের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায় দরিদ্র, অসহায় খেটে খাওয়া শতাধিক মানুষ তৃপ্তি নিয়ে খাচ্ছে। কারো দিকে খেয়াল করার মতো সময় নেই তাদের। কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবী সবাইকে খাবার তুলে দিচ্ছেন। সময় মতো পানিও দেওয়া হচ্ছে তাদের। তেমন কোনো হৈচৈ নেই, এমনকি খাবার পাওয়ার জন্য কোনো হুড়োহুড়ি নেই। কারণ, সবাই জানে এখানে কাউকে না খেয়ে ফিরে যেতে হয় না। 

ঢাকা ট্রিবিউন


একটু ভালো খাবারের আশায়

খাবার খেতে আসা মর্জিনা বেগম বলেন, "আমার স্বামীর টাঙ্গাইল শহরে পানের দোকান ছিল। কয়েক বছর আগে তিনি মারা গেছেন। একমাত্র মেয়েটিও শারীরিক প্রতিবন্ধী। আমি নিজেও বেশকিছুদিন ধরে কিডনি রোগে ভুগছি। শহরের এক ব্যক্তির বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি আমি। আগে অন্যের বাসা-বাড়িতে কাজ করে সংসার চালাতাম। এখন অসুস্থ হওয়ায় কাজ করতে পারি না। অন্যের সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে চলতো হয় আমার। শহীদ মিনার চত্বরে প্রতি শুক্রবারে বিনামূল্যে খাবারের আয়োজন করা হয় বলে শুনেছিলাম। তারপর থেকে প্রায়ই মেয়েকে নিয়ে এখানে আসি। সপ্তাহে অন্তত একদিন একটু ভালো খাবার খাওয়া যায় এখানে। সেই তৃপ্তি পেতেই এখানে আসি।"

শহরের রিকশাচালক জাহের মোল্লার সংসারে সদস্য সংখ্যা সাতজন। তিনি একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। জাহের মোল্লা বলেন, ‘রিকশা চালাই। হোটেলে খেতে অনেক টাকা লাগে। একদিনে একবেলা ভালো খাওয়ায় এখানে। কোনো টাকা লাগে না। তাই এখানে আসি। যে মানুষ এ কাজ করেছেন আল্লাহ তার ভালো করবেন। আমাগো মতো গরীব মানুষরে বিনা পয়সায় খাওয়াচ্ছেন।" 

ঢাকা ট্রিবিউন


কোনো সহযোগিতা ছাড়াই চলছে এই উদ্যোগ 

মির্জা মাসুদ রুবল ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, শহরে "নিরালা হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট" নামের তার একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেখান থেকে যা আয় হয় তার একটা অংশ দিয়ে চালান বিনামূল্যের "গরিবের হোটেল রবিনহুড"। এই হোটেলে প্রথম দিকে প্রতিদিন দুপুরের খাবার দেওয়া হতো। কিন্তু আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে এখন সপ্তাহে একদিন (শুক্রবার) দুপুরে তাদের খাওয়ানো হয়। তবে ইচ্ছা আছে ভবিষ্যতে আগের নিয়মে প্রতিদিন একবেলা করে তাদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার। শীতের সময় খিচুড়ি আর মাংস খাওয়ানো হয়। আর বাকি সময়ে ভাত আর মাংস খাওয়ানো হয়। এতে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার মতো খরচ হয়। 

তিনি আরও বলেন, "এই হোটেলটি চালানোর জন্য কারো কাছে কখনো সাহায্য চাইনি। তবে কেউ যদি স্বপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে আসেন তাহলে অবশ্যই তা গ্রহণ করা হবে। দেশ-বিদেশ থেকে অনেকেই আশ্বাস দিয়েছেন সাহায্য করার জন্য। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাদের কারো সাহায্য হাতে এসে পৌঁছেনি।" 

ঢাকা ট্রিবিউন


'অনাহারির মুখে খুশির ঝিলিক আমাকে আপ্লুত করে'

কেন "গরীবের হোটেল রবিনহুড" খুলে দরিদ্র শ্রমজীবী, দুস্থ্য ও ভিক্ষুকদের বিনামূল্যে খাওয়ার ব্যবস্থা করলেন-এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা মাসুদ রুবল বলেন, "আমার পূর্ব-পুরুষরা এক সময় অসহায়, দুঃস্থ ও দরিদ্র মানুষের জন্য নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই তাদের আর্তমানবতার জন্য নানামুখী কর্মকাণ্ড দেখে এসেছি। এরই ধারাবাহিকতা এবং অনাহারির মুখে একবেলা খাবার তুলে দেওয়ায় তাদের মুখে যে আনন্দের ঝিলিক ফুটে উঠে তা আমাকে আপ্লুত করে। তারা যখন পেট ভরে খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলে সেটা দেখে আমার মনটা ভরে যায়। তাই শত সীমাবদ্ধতার মাঝেও এ আয়োজনটা করে থাকি।"

মির্জা মাসুদ রুবলের এ উদ্যোগ ইতিমধ্যে টাঙ্গাইলে সাড়া জাগিয়েছে। তার এ উদ্যোগকে শহরের বিশিষ্টজনরাও সাধুবাদ জানিয়েছেন। টাঙ্গাইল সাধারণ গ্রন্থাগারের সম্পাদক কবি ও অধ্যাপক মাহমুদ কামাল বলেন, "মির্জা মাসুদ রুবলের উদ্যোগটি অবশ্যই প্রশংসনীয়। তার সামর্থ্য অনুযায়ী তিনি গরীব মানুষদের মুখে ভালো মানের খাবার তুলে দিচ্ছেন। তিনি খুব বিত্তবান নন, তবে তার মনটা বিত্তশালী। তার মতো বিত্তবানরা যদি এভাবে এগিয়ে আসতেন তাহলে অসহায়, গরীব মানুষরা পেটভরে খাবার সুযোগ পেতো।"