• বুধবার, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:২৩ রাত

বিদেশি শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় নেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

  • প্রকাশিত ১১:৪০ সকাল জানুয়ারী ২৪, ২০২০
জাবি
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার। সংগৃহীত

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অবহেলা, ওয়েবসাইটে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তি প্রক্রিয়ার ব্যাপারে কোনো ধরনের দিক নির্দেশনা না থাকা, বিদেশিদের জন্য প্রতিকূল পরিবেশ, ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভর্তিপ্রক্রিয়ায় জটিলতা ইত্যাদি কারণে বিদেশি শিক্ষার্থী পাচ্ছে না জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

এক সময় দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বর্হিবিশ্বে সুনাম কুড়নো বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশি-বিদেশি শিক্ষার্থীদের সমারোহে মুখরিত থাকতো। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে পাল্টে গেছে সে চিত্র, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে বিদেশি শিক্ষার্থী। বর্তমানে হাতেগোনা কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু সংখ্যক বিদেশি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করলেও বিদেশি শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় নেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি খ্যাত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে বহু বিদেশি শিক্ষার্থী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা নিতে এসেছে। তবে বিগত বছরগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা একেবারেই কমে গেছে। বর্তমানে এই আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষ (স্নাতক সম্মান) থেকে স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) পর্যন্ত ছয়টি ব্যাচে ১৫ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। কিন্তু ১৫ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে বর্তমানে জাবিতে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র এক!

বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সাথে বলে জানা যায়, ভর্তির ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ওয়েবসাইটে বিষয়ভিত্তিক পরিপূর্ণ তথ্য না থাকায় এবং বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তিসংক্রান্ত তথ্য বা গাইডলাইন ও প্রচারণা না থাকায় বিদেশি শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ভর্তি হতে পারছে না। এছাড়া বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ-সুবিধার অভাব, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অবহেলা, ভর্তিপ্রক্রিয়ায় জটিলতা, বিদেশিদের জন্য প্রতিকূল পরিবেশ, ভিসাসংক্রান্ত জটিলতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, অনেক বিভাগে শুধু বাংলায় পাঠদান, ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সেশনজটসহ নানা কারণে আগ্রহ হারাচ্ছে বিদেশি শিক্ষার্থীরা।


আরও পড়ুন - জাবি’তে ইট-পাথরের দেওয়াল কথা বলে শিল্পীর তুলিতে


বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার সূত্র জানায়, ২০১৩-১৪ ও ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে কোনো বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি। ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে একজন বিদেশি শিক্ষার্থী (নেপালি) ফার্মেসি বিভাগে ভর্তি হয়। ২০১৬-১৭ ও ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে কোনো বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি। ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে একজন বিদেশি শিক্ষার্থী (নাপালি) ফার্মেসি বিভাগে ভর্তি হয়েছে। সর্বশেষ ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে এখনো কোনো বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি।

ফার্মেসী বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে ভর্তিকৃত বিদেশি শিক্ষার্থী (নেপালি) স্নাতক শেষ করার পূর্বেই নিজ দেশে ফিরে গেছেন। কিন্তু কেন ফিরে গেছেন তার সঠিক কারণ জানা জানাতে পারেননি কেউ।

উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী উমা চৌহান আঁখি বলেন, “জাহাঙ্গীরনগর দেশের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অন্যতম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এখানে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা একেবারেই নগন্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান, গবেষণাসহ ভালো দিকগুলো ওয়েবসাইটে উপস্থাপন করতে পারলে এবং ভর্তি প্রক্রিয়াটা সহজ করলে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়তে পারে। আর বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির বিষয়টা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করলে এ সংখ্যার উন্নতি হবে।”


আরও পড়ুন - দর্শনার্থীদের ভিড়ে উত্যক্ত জাবির অতিথিরা


পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. জামাল উদ্দীন রুনু বলেন, “একটা সময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশ ছিলো। কিন্তু বিগত কয়েক বছরে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা একেবারে কমে গেছে। বিদেশি শিক্ষার্থী কম ভর্তি হওয়ার মূলত কারণ দুইটা। একটা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে এ বিষয়ের পরিচিতি সারা বিশ্বের কাছে তুলে ধরার ক্ষেত্রে প্রশাসনের এক ধরনের উদাসীনতা রয়েছে। এছাড়া ওয়ার্ল্ড র‍্যংকিংয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো অবস্থানই নেই। তারপর ওয়েবসাইটে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তি প্রক্রিয়ার ব্যাপারে কোনো ধরনের দিক নির্দেশনা না থাকায়, বিস্তারিত তথ্যের অভাব, প্রচার-প্রচারণার ঘাটতি থাকার কারণে বিদেশি শিক্ষার্থী পাচ্ছে না।”

অধ্যাপক জামাল উদ্দীন আরও বলেন, “ভৌগোলিক দিক দিয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা শহরের অদূরে অবস্থিত হওয়ায় উপমহাদেশের সংস্কৃতি কিছুটা মিললেও অন্যান্য দেশের পরিবেশ কিংবা সংস্কৃতির সাথে খাপ খাওয়াতে না পারায় অনেক বিদেশি শিক্ষার্থী আসে না। তাছাড়া পরিবর্তিত বিশ্বের দেশগুলোতে শিক্ষা ব্যবস্থায় বিশেষ করে বিজ্ঞান চর্চায় বেশ আধুনিক। সেই তুলনায় আমরা পিছিয়ে আছি যার ফলে আমরা বিদেশি শিক্ষার্থী কম পাচ্ছি।”


আরও পড়ুন - ভিসি'র অপসারণের দাবিতে জাবিতে মুখোশ মিছিল


বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মো. নূরুল আলম বলেন, “বিদেশি শিক্ষার্থীর জন্য আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বার আমরা সবসময় উন্মুক্ত রেখেছি। কিন্তু বিদেশি শিক্ষার্থীরা কেন ভর্তি হচ্ছে না এ বিষয়টি আমার জানা নেই। সাধারণত শিক্ষা মন্ত্রণালয় হয়ে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়ে থাকে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে যে সমস্ত বিদেশি শিক্ষার্থীদের নির্বাচিত করা হয় আমরা সেসব শিক্ষার্থীদের ভর্তি করে থাকি। বিদেশি শিক্ষার্থী দেশে আসুক এটা আমরা চাই এবং যে সমস্ত শিক্ষার্থী আসবে তাদের জন্য আমরা হলে আসনের ব্যবস্থা করে দিবো। এছাড়া বিদেশি শিক্ষার্থী যাতে বেশি ভর্তি হতে আগ্রহ পায় এজন্য আমরা এবার শিক্ষাবৃত্তির পরিমাণও বাড়িয়েছি।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. আমির হোসেন বলেন, “আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার পরেও অধ্যয়নরত আমাদের দেশীয় শিক্ষার্থীরাই আবাসন সংকটে ভুগছে। তারা থাকার জন্য আসন পাচ্ছে না, গণরুমে থাকতে হচ্ছে তাদের। এই পরিস্থিতিতে বিদেশি শিক্ষার্থীরা আসলে তো আমরা তাদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দিতে পারবো না।”

তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে আলাদাভাবে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির ব্যাপারে প্রচারণা বা দিক-নির্দেশনা নেই। ফলে অনেক বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হতে চাইলেও ভর্তি হতে পারছে না। তবে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় উন্নয়নের বরাদ্দকৃত ১৪ শত ৪৫ কোটি টাকার মধ্যে একটা প্লান আছে যেখানে একটি কনভেনশন সেন্টার নির্মিত হবে সেখানে যেন বিদেশি শিক্ষার্থীরা থাকতে পারে এবং গবেষণা করতে পারে সে ব্যবস্থা করা হবে।”


আরও পড়ুন - প্রজাপ্রতির ডানায় ভর করে রঙ মেখেছিল জাবি