• মঙ্গলবার, এপ্রিল ০৭, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:০৯ সকাল

খননের ৩ বছরেই ফের অস্তিত্ব সংকটে খুলনার ময়ূর ও হাতিয়া নদী

  • প্রকাশিত ০৫:৫৬ সন্ধ্যা ফেব্রুয়ারি ১, ২০২০
খুলনা
খননের তিন বছরেই আবার পুরনো রূপে ফিরে এসেছে ময়ূখ ও হাতিয়া নদী। ইউএনবি

মেয়র বলেন, ময়ূর ও হাতিয়া নদীর খনন কাজ হিসাব অনুযায়ী হয়নি। বড় ধরনের পুকুর চুরি হয়েছে। খনন কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হওয়ায় এ দুর্দশার সৃষ্টি হয়েছে


খননকাজের মাত্র তিনবছরের মাথায় আবারও অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে খুলনা মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ ময়ূর ও হাতিয়া নদী। ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ের খননকাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, গল্লামারী ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় ময়ূর নদের দুইপাশে যত্রতত্র পলিথিনসহ গৃহস্থালীর ময়লা-আবর্জনার স্তুপ। মাঝখানে পানি শূন্য উঁচু সমতল ভূমিতে শুকিয়ে পড়েছে কচুরিপানা, কোথাও কোথাও জন্মেছে সবুজ ঘাস ও লতা-পাতা। শক্ত ও উঁচু নদীর বুকে সুবিধাজনক স্থানে পথ বানিয়ে স্যান্ডেল পায়ে পারাপার হচ্ছেন জনসাধারণ।

জলাবদ্ধতা নিরসনে মাত্র তিন বছর আগে ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ময়ূর ও হাতিয়া নদীর ১২ কিলোমিটার খনন হলেও বর্তমান চিত্র এটি। এ অবস্থায় জলাবদ্ধতা নিরসনে নদী দুটি খননের যে আসল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তা ভেস্তে গেছে।

খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) সূত্রে জানা গেছে, খুলনা মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ সাতটি ড্রেনের মুখ ময়ূর ও হাতিয়া এই দুই নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ বছর সংস্কার না হওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ময়ূর নদ ও হাতিয়া নদী ভরাট হয়ে যায়। কোনো কোনো স্থানে নদী দখলেরও ঘটনা ঘটে। সঙ্গত কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। চরম দুর্ভোগে পড়ে জনসাধারণ।


আরও পড়ুন - মাগুরায় নদী দখল করে একগ্রামেই ৩০ ইটভাটা!


এই অবস্থা থেকে উত্তরণে সিটি করপোরেশন নগর উন্নয়ন প্রকল্পে নদী দুটির তলদেশের পলি ও ময়লা অপসারণসহ জোয়ার-ভাটা নিশ্চিতকরণের বিষয়টি গুরুত্ব দেয়। বিশেষ করে কেসিসি’র সিআরডিপি’র (নগর উন্নয়ন প্রকল্পে) আওতায় দুই নদীর অন্তত ১১.৬৬ কিলোমিটার খননে প্রকল্প গ্রহণ করে। এডিবির অর্থায়নে খনন কাজের ব্যয় ধরা হয় ১৪ কোটি ৫২ লাখ ৫১ হাজার টাকা।

২০১৩ সালের ৬ অক্টোবর এই খনন কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়। একই বছর ১৩ ডিসেম্বর ওয়ার্ক অর্ডার দেওয়া হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স জামিল ইকবাল (জেবি) ও কামরুল এন্টারপ্রাইজ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে।

কাজের প্রথম পর্যায়ে শ্মশানঘাট এলাকায় পানি কম থাকায় ম্যানুয়ালি নদী খনন শুরু হয়। কিন্তু ম্যানুয়াল ব্যবস্থা পাল্টে নদীর গভীরতম স্থানে ১২টি সেমি ড্রেজার ব্যবহার করে এই খননকাজ চালানো হয়। ২০১৬ সালে খননকাজ শেষ হয়। কিন্তু কাজে অনিয়ম হওয়ায় প্রকল্পের সফলতা নিয়ে তখনই প্রশ্ন দেখা দেয়।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নদী দু’টিতে নামমাত্র খনন করা হয়েছে। খননের নামে শুধুমাত্র পানি পরিষ্কার করা হয়। নদী থেকে উত্তোলন করা পানিতে তেমন কোনো মাটির অস্তিত্ব ছিল না বা পর্যাপ্ত পরিমাণ মাটি জমা হতে দেখা যায়নি। তবে কিছু পলিথিন উঠিয়ে নদীর দু’পাশে রাখা হয়েছিল।


আরও পড়ুন - দখল-দূষণে হারিয়ে যাচ্ছে শীতলক্ষ্যা


তারা বলেন, সেমি ড্রেজার দিয়ে কোনোভাবেই নদীর তলদেশের মাটি খনন করা সম্ভব না। ফলে যে অবস্থা ছিল তাই রয়ে গেছে। ফলে সিটি করপোরেশনের উদ্যোগ বিফলে গেছে। ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে নদী খনন করা উচিত ছিল।

বেসরকারি সংস্থা সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) জেলা সম্পাদক কুদরত-ই-খুদা বলেন, ভরাট হওয়া নদী দুটির পলি ও ময়লা অপসারণ করার কথা থাকলেও ড্রেজারের মাধ্যমে শুধুমাত্র পানি অপসারণ করা হয়। লোক দেখানো খননে কচুরিপানার শেকড়সহ মাটি পানির নিচেই রয়ে গেছে। এছাড়া খননে যা উঠানো হয়েছিল, রোদ ও বৃষ্টিতে তা ফের নদীতে গিয়ে পড়েছে। ফলে দ্রুতই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

নদীর খনন কাজে অনিয়মের কথা স্বীকার করে সিটি করপোরেশনের মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক বলেন, ময়ূর ও হাতিয়া নদীর খনন কাজ হিসাব অনুযায়ী হয়নি। বড় ধরনের পুকুর চুরি হয়েছে। খনন কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হওয়ায় এই দুর্দশার সৃষ্টি হয়েছে। তাই দুদকের উচিত এব্যাপারে সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।

প্রসঙ্গত, নেদারল্যান্ডস ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে ময়ূর নদকে ঘিরে নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ফিজিবিলিটি স্টাডি শুরু হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ময়ূর নদ খননসহ প্রটেকশন ওয়াল, ওয়াকওয়ে, উন্মুক্ত স্থান ও সেতু নির্মাণ করা হবে।