• রবিবার, এপ্রিল ০৫, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৭:১০ রাত

'দৈত্যাকার' মাছে জমজমাট পোড়াদহ মেলা

  • প্রকাশিত ০৪:৪৮ বিকেল ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২০
বাঘাইড় মাছ
মেলার প্রধান আকর্ষণ ছিল লক্ষাধিক টাকা মূল্যের ৭৩ কেজি ওজনের একটি বাঘাইড় মাছ। ঢাকা ট্রিবিউন

এ মেলায় গাঙচিল, চিতল, বোয়াল, রুই, কাতলা, মৃগেল, হাঙড়ি, গ্রাসকার্প, সিলভারকার্প, বিগহেড, কালবাউশ, পাঙ্গাসসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাঝারি ও বড় আকারের মাছ পাওয়া যায়

বগুড়ার গাবতলী উপজেলায় উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহ মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। একদিনের এ মেলায় "দৈত্যাকার" সব মাছ দেখতে ও কিনতে লাখো মানুষের ঢল নেমেছে। 

বুধবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকেই জমে উঠেছে মেলা। ১৫৩ বছর ধরে মেলাটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আজ মেলার প্রধান আকর্ষণ ছিল লক্ষাধিক টাকা মূল্যের ৭৩ কেজি ওজনের একটি বাঘাইড় মাছ। আগামীকাল বৃহস্পতিবার সকালে শুধু নারীদের কেনাকাটার জন্য বসবে "বউমেলা"।


১৫৩ বছরের ঐতিহ্য

স্থানীয়রা জানান, গাবতলীর মহিষাবান ইউনিয়নের গোলাবাড়ি বন্দর এলাকায় গাড়িদহ নদী তীরে সন্ন্যাসী পূজা উপলক্ষে একদিনের "পোড়াদহ" মেলা বসে। প্রায় ১৫৩ বছর ধরে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে স্থানীয়রা এ মেলার আয়োজন করেন। মেলার প্রধান আকর্ষণ বিশাল আকৃতির নদীর মাছ। 

প্রতি বছর মাঘ মাসের শেষ বা ফাল্গুনের প্রথম বুধবার "পোড়াদহ" মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় জমিতে কোনো চাষাবাদ হয় না। মেলাকে ঘিরে উৎসবের আমেজে মেতে উঠেন আশপাশের গ্রামের নানা ধর্ম ও বর্ণের মানুষ। মেলা একদিনের হলেও এর আমেজ দুই-তিন দিন থাকে। ঈদ বা অন্য কোনো উৎসবে মেয়ে-জামাই বা আত্মীয়-স্বজনদের দাওয়াত না দিলেও পোড়াদহ মেলায় দাওয়াত করা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। 

মেলাকে সামনে রেখে নারীরা আগেই বাড়িঘর পরিষ্কার করে নেন। মুড়ি, খৈ ভাজা, নাড়কেলের নাড়ু ও হরেক রকম পিঠা তৈরি করেন। মেলার দিন মেলা থেকে বড় মাছ কিনে স্বজনদের আপ্যায়ন করা হয়। মেলায় নদী ও সাগরের বড় বড় মাছ, মিষ্টি, আসবাবপত্র ও তৈজষপত্রসহ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বিক্রি হয়। 

মেলায় ওঠা ১২ কেজি ওজনের কাতলা। ঢাকা ট্রিবিউন


বিশাল বাঘাইড়ে আকর্ষণ 

এবারের মেলায় ৭৩ কেজি ওজনের যমুনা নদীর একটি বাঘাইড় মাছ তোলা হয়েছিল। মাছের মালিক উপজেলার মহিষাবান গ্রামের মাছ ব্যবসায়ী বিপ্লব। তিনি প্রথমে প্রতি কেজি এক হাজার ৮০০ টাকা দাবি করেন। ওই হিসাবে এ মাছের দাম এক লাখ ৩১ হাজার ৪০০ টাকা আসে। পরে চাহিদা কমে যাওয়ায় প্রতি কেজি এক হাজার ৬০০ হাজার টাকায় ধার্য হয়। এককভাবে এ মাছ কেনা সম্ভব ছিলনা। তাই ক্রেতারা কেজি দরে মাছ কিনতে রাজি হন। 

মাছ ব্যবসায়ী বিপ্লব জানান, প্রতি বছর তিনি বড় মাছ আমদানির চেষ্টা করে থাকেন। এ মাছটি তিনি যমুনা নদীর মাঝিদের কাছে কেনার দাবি করলেও স্থানীয়রা বলছেন, বিপ্লব মাছটি বগুড়ার চাষী বাজার থেকে সংগ্রহ করেছেন। 

মেলায় এ মাছের ক্রেতার চেয়ে দর্শক বেশি ছিলেন। অনেকে মোবাইল ফোনে ছবি সংগ্রহ ছাড়াও, সেলফি তুলেছেন। 

বগুড়া শহরের কারবালা এলাকার ব্যবসায়ী রুহুল আমিন জানান, পরিবারের সদস্যরা বড় মাছ খেতে পছন্দ করে। তাই তিনি প্রতি বছর পোড়াদহ মেলায় আসেন। কিন্তু এত বড় মাছ এককভাবে কেনা সম্ভব নয়। তাই তিনি তিন কেজি কাটা মাছ কিনেছেন। 

উপজেলার মহিষাবান গ্রামের কৃষক আশরাফ আলী জানান, তিনি দুই কেজি মাছ কিনেছেন। 


আছে হরেক রকম মাছ

শফিকুল ইসলাম, মিনার, শাহিন, জিহাদ ইসলাম, দেলবরসহ একাধিক মাছ বিক্রেতা জানান, এ মেলায় গাঙচিল, চিতল, বোয়াল, রুই, কাতলা, মৃগেল, হাঙড়ি, গ্রাসকার্প, সিলভারকার্প, বিগহেড, কালবাউশ, পাঙ্গাসসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাঝারি ও বড় আকারের মাছ পাওয়া যায়। এসব মাছ ওজনে পাঁচ থেকে ২০ কেজি পর্যন্ত। 

মাছ বিক্রেতারা জানান, প্রতি কেজি গাঙচিতল ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকা, চিতল ৮০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা, বোয়াল ৭৫০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা, রুই ৫০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, কাতলা ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা, মৃগেল ৩৫০ থেকে ৮০০ টাকা, হাঙড়ি ২৫০ থেকে ৬০০ টাকা, গ্রাসকার্প ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা, সিলভার কার্প ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা, বিগহেড ৪০০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা, কালবাউশ ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা, পাঙ্গাস ৩৫০ থেকে ৭০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

মেলায় হরেক রকম মিষ্টান্নও বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কেজি মিষ্টি ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়। আট কেজি ওজনের একটি মাছ আকৃতি মিষ্টি বিক্রি হয়েছে ৫ হাজার টাকায়। বিনোদনের জন্য মেলায় রয়েছে মোটরসাইকেল খেলা, সার্কাস, জাদু খেলা ও নাগরদোলা।

মেলায় হরেক রকম মিষ্টান্নও বিক্রি হচ্ছে। ঢাকা ট্রিবিউন

মেলার পরিচালক মহিষাবান ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম জানান, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পোড়াদহ মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সকালে শুধু নারীদের কেনাকাটার জন্য "বউমেলা" অনুষ্ঠিত হবে। 

গাবতলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাবের রেজা আহমেদ জানান, শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহ মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। 

বগুড়া পুলিশ সুপার (এসপি) আলী আশরাফ ভূঞা জানান, ঐতিহ্যসমৃদ্ধ এই পোড়দহ মেলা। মেলায় সকল প্রকার নিরাপত্তায় কাজ করছেন পুলিশ সদস্যরা।