• রবিবার, এপ্রিল ০৫, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৭:৩৩ রাত

অনুশীলন বই নিয়ে উদ্বেগে শিক্ষার্থী-অভিভাবক-শিক্ষকেরা

  • প্রকাশিত ১০:২৩ রাত ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২০
গাইড বই
ছবি: সৌজন্য

অভিভাবকরা বলছেন, বাস্তবতা থেকেই তারা অনুশীলন বই কিনছেন

শ্রেণিকক্ষে যথাযথ প্রক্রিয়ায় পাঠদান না হওয়া ও সৃজনশীল পদ্ধতির জটিলতাসহ বিভিন্ন কারণে শিক্ষার্থী তো বটেই, অনেক শিক্ষকের কাছেও এখন বড় ভরসা অনুশীলনমূলক বই। বাজারে যার প্রচলিত নাম ‘‘গাইড বই’’। দিনে দিনে অপরিহার্য হয়ে ওঠা এ অনুশীলনমূলক বইগুলো পড়ছে ৯৫ শতাংশেরও বেশি শিক্ষার্থী।

তবে প্রস্তাবিত শিক্ষা আইন-২০২০ এ নোট-গাইডের নামে প্রকাশিত অনুশীলন বই বন্ধের বিধি যুক্ত করা হয়েছে। এতে অভিভাবক ও শিক্ষা-সংশ্লিষ্টদের মনে শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। তারা মনে করছেন, বিদ্যমান বাস্তবতায় অনুশীলনমূলক বন্ধের উদ্যোগ সার্বিক শিক্ষার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনের খসড়া গত সপ্তাহে চূড়ান্ত করা হয়েছে। এটি অনুমোদনের জন্য শিগগিরই মন্ত্রিসভায় পাঠানো হবে বলে জানা গেছে। এ আইনে শিক্ষকের সবধরনের কোচিং-টিউশন নিষিদ্ধ এবং শর্তসাপেক্ষে ব্যবসায়িক কোচিংকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। শিক্ষানীতিতে চার স্তরের শিক্ষানীতিই রাখা হয়েছে। অবশ্য পরবর্তীতে তিন স্তরের শিক্ষানীতি প্রবর্তনের আভাস রাখা হয়েছে অন্য আইনে। এসব প্রস্তাবের ব্যাপারেও শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা উষ্মা প্রকাশ করেছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় বর্তমানে গ্রাম ও শহরে দুই ধরনের সংকট বিরাজমান। শহরের নামকরা প্রতিষ্ঠানে ঠিকমত ক্লাস হয় না। অতিরিক্ত ভর্তির কারণে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের এক একটি ক্লাসরুমে ৮০ থেকে ১০০ জন শিক্ষার্থী থাকে। শিক্ষকরা এতো বেশি শিক্ষার্থীর দিকে ভালো করে মনোযোগ দিতে পারেন না। আবার গ্রামাঞ্চলের বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের দক্ষতা ও যোগ্যতার ঘাটতি বিদ্যমান। প্রশিক্ষণে দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও এখন পর্যন্ত বিদ্যমান সৃজনশীল পদ্ধতির প্রশিক্ষণ বেশিরভাগ শিক্ষকই পাননি। আবার যারা পেয়েছেন তাদেরও প্রশিক্ষণের মান খুব ভালো ছিল না বলে অভিযোগ আছে। ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়েরই ভরসাস্থলে পরিণত হয়েছে অনুশীলন বই।

অভিভাবকরা বলছেন, বাস্তবতা থেকেই তারা অনুশীলন বই কিনছেন।

রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজের এক শিক্ষার্থীর মা নাহার ফেরদৌস বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া পুরোপুরি ঠিকমতো দেওয়া সম্ভব হলে প্র্যাকটিস বইয়ের দরকার হতো না। তিনি নিজের মেয়ের ক্লাসের দৃষ্টান্ত দিয়ে বলেন, তার শ্রেণিতে ৮০-৮৫ জন শিক্ষার্থী। বসে। এত ছাত্রীর রোল কল করা এবং আগে দেওয়া পড়া নিতেই শিক্ষকের সময় প্রায় শেষ হয়ে যায়। ফলে কেবল পাঠ দেখিয়ে পড়ে আসতে বলেই তাকে বিদায় নিতে হয়। ফলে ‘‘নোট-গাইডের’’ সাহায্য ছাড়া বিকল্প থাকে না। একই কথা বলেছেন ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পদার্থবিজ্ঞানের একজন শিক্ষিকাও।

উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রীর বাবা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. দাউদ খান বলেন, ‘‘সৃজনশীল পদ্ধতিতে পাঠ অনুশীলনের জন্য অনেক উদ্দীপকের দরকার হয়। এতো উদ্দীপক তৈরি করে দেওয়ার সময় সব অভিভাবকের নেই। শিক্ষকের পক্ষেও তা সম্ভব নয়। এ জন্য গাইডের সাহায্য নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।’’

নাম প্রকাশ না করে রাজধানীর একটি স্কুলের অধ্যক্ষ বলেন, সৃজনশীল পদ্ধতির ব্যাপারে সব শিক্ষক প্রশিক্ষণ পাননি। পাঠ্যবইও শিক্ষার্থীদের জন্য তুলনামূলকভাবে বেশ কঠিন। শিক্ষক ম্যানুয়াল দেখে পাঠদানের সক্ষমতা সব শিক্ষকের নেই। এ কারণে অনেক শিক্ষকই গাইড বইয়ের সহায়তা নেন।

আরেকজন অধ্যক্ষ বলেন, প্রচলিত নেতিবাচক ধারণার কারণে নোট-গাইডের পক্ষে নাম প্রকাশ করে কথা বলা কঠিন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, বছরের কর্মদিবসের সংখ্যা, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ঘাটতি ও দক্ষতার বিবেচনায় এসব গ্রন্থের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা কঠিন।

প্রায় একই কথা বলেন ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ফৌজিয়া।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং এই খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নোট-গাইড নিয়ে সরকারের আপত্তির বড় একটি কারণ হচ্ছে, অনেক প্রতিষ্ঠানে এসব গ্রন্থ কিনতে বাধ্য করা হয়। একশ্রেণির অসাধু শিক্ষক ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থ কিনতে শিক্ষার্থীদের বাধ্য করেন।

বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি (বাপুস) সহ-সভাপতি শ্যামল পাল বলেন, অনুশীলনমূলক গ্রন্থ প্রকাশ ও বিক্রির সঙ্গে অন্তত ৮টি পেশার ২৪ লাখ মানুষ জড়িত। এই খাতে সাড়ে ২১ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ আছে। এসব গ্রন্থ প্রকাশনা বন্ধ করা হলে সরকার একদিকে শত কোটি টাকা রাজস্ব বঞ্চিত হবে, আরেকদিকে কর্মহীন মানুষের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে।  

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘যদি কোনো গ্রন্থ নোট-গাইড না হয় এবং তা অনুশীলনের মাধ্যমে জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি হয় তবে সেসব গ্রন্থের ব্যাপারে আপত্তি থাকার কথা নয়। কেননা, বিশ্বের বহু দেশে এ ধরনের গ্রন্থ আছে।’’

প্রস্তাবিত আইনে কোচিংয়ের নীতি এবং চারস্তরের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রস্তাবের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘‘যেহেতু শিক্ষানীতি বহাল আছে, তাই তিন স্তরের শিক্ষাব্যবস্থাই আইনে রাখতে হবে। এটা বাস্তবায়ন বড় কোনো চ্যালেঞ্জ নয়।’’

নোট-গাইডের বিকল্প সরকার খুঁজছে বলে জানিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন বলেন, ‘‘নোট গাইড কেন চলে তা আমরা জানতে চাই। সেটা চিহ্নিত করার পরে আমরা পরবর্তী অ্যাকশনে যেতে পারি। আমরা নোট-গাইডের বিকল্প চাই। সেই বিকল্পটা কী হতে পারে, সেটা এক্সপ্লোর করছি। তবে কী করব তা এখনও চূড়ান্ত নয়। আমাদের হাতে কয়েকটা বিকল্প আছে।’’

শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট অনেকে মনে করেন, অনুশীলনমূলক বই বন্ধের ভাবনা থেকে সরে এসে প্রয়োজনে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরির মাধ্যমে এ ধরনের বইয়ে যৌক্তিক রদবদল আনা হতে পারে অন্যতম বিকল্প।