• মঙ্গলবার, এপ্রিল ০৭, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ১১:১৪ রাত

ওসির কক্ষে ঢুকতে লাগে না অনুমতি, ডাকতে হয় না স্যার

  • প্রকাশিত ১১:২৪ সকাল ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২০
রাজবাড়ী-গোয়ালন্দ-ওসি
গোয়ালন্দ ঘাট থানা ওসি'র রুমে ঢুকতেই চোখে পড়বে এমন ব্যানার ঢাকা ট্রিবিউন

সম্প্রতি দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর এক যৌনকর্মী মারা গেলে তার জানাযার নামাজ পড়িয়ে দাফনের ব্যবস্থা করেন এই ওসি

থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) রুমে ঢুকতে লাগবে না অনুমতি, ডাকতে হবে না স্যার। একজন সরকারি কর্মচারী হিসেবে সাধারণ মানুষের সেবায় জনগণের কাছে নিজেই এগিয়ে এসেছেন তিনি। সরাসরি শুনছেন অভিযোগ। ঘটনার সত্যতা যাচাই করে দিচ্ছেন আইনি সহায়তা। 

বলা হচ্ছে রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ ঘাট থানা পুলিশের অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আশিকুর রহমানের কথা।

ইতোমধ্যে যৌনপল্লীর মৃত যৌনকর্মীদের প্রথমবারের মতো জানাজার ব্যবস্থা ও জনগণের দরবার গড়ে তুলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছেন তিনি।

প্রথাগতভাবে থানায় ওসির কক্ষে ঢুকতে অনুমতির প্রয়োজন হয় সাধারণ মানুষের। গ্রামের মানুষ সরাসরি পুলিশ কর্মকর্তার কক্ষে গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলছেন, এমনটি সচরাচর দেখা যায় না। কিন্তু ব্যতিক্রম গোয়ালন্দ থানা।

সেখানকার ওসির রুমের দরজায় ঝুলছে ‘‘ইহা একজন গণ কর্মচারীর অফিস। যে কোনো প্রয়োজনে এই অফিসে ঢুকতে অনুমতির প্রয়োজন নাই। সরাসরি রুমে ঢুকুন। ওসি-কে স্যার বলার দরকার নাই’’।

অবাক করার মতো হলেও এমন উদ্যোগ নিয়েছেন রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ ঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আশিকুর রহমান। বিষয়টির প্রশংসা করেছেন পুরো রাজবাড়ীর জনগণ।

গত ১১ জানুয়ারি গোয়ালন্দ ঘাট থানায় ওসি হিসেবে যোগ দেন তিনি। তারপর থেকেই প্রশংসিত হচ্ছে তার নানা কর্মকাণ্ড। গত ২ ফেব্রুয়ারি দৌলতদিয়ার যৌনপল্লীর এক যৌনকর্মী মারা গেলে তার জানাযার নামাজ পড়িয়ে দাফনের ব্যবস্থা করেন আশিকুর রহমান। এই উদ্যোগের কারণে ইতোমধ্যেই তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছেন।

ওসি মো. আশিকুর রহমান ঢাকা ট্রিবিউন পাশাপাশি তিনি যৌনপল্লীর নারীদের নানাবিধ অভিযোগ ও আইনি সহাতা দিতে গড়ে তুলেছেন “জনগণের দরবার” নামে একটি আইনি সহায়তা কেন্দ্র। প্রতিদিন দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সেখানে গিয়ে আইনি সহায়তা দিয়ে থাকেন তিনি। এই কাজে তাকে সহায়তা করছে যৌনপল্লীর “অসহায় নারী ঐক্য সংগঠন”।

গোয়ালন্দের বাসিন্দা আব্দুল জব্বার মিয়া বলেন, থানায় এসে দেখলাম ওসির রুমের সামনে ঝুলানো ব্যানারে লেখা, তার রুমে ঢুকতে কোন অনুমতি লাগবে না।তাকে স্যারও ডাকতে হবে না। বিষয়টি অনেক ভালো লাগলো। ওসি নিজেই ভাই বলে ভেতরে ডেকে নিয়ে কথা বললেন। জিডি করতে সহায়তা করলেন। এমন অফিসারই তো চাই।

ওসির সঙ্গে খোলামেলাভাবে কথা বলতে পেরে খুশি সব শ্রেণি-পেশার স্থানীয় জনগণ। তারা মনে করেন, এভাবে সাধারণ মানুষ পুলিশের কাছে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারলে তা সবার জন্যই কল্যাণকর হবে।

আন্তরিকভাবে স্থানীয় মানুষের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেন ওসি আশিকুর ঢাকা ট্রিবিউন

দৌলতদিয়া পূর্বপাড়া যৌনপল্লীর ‘‘অসহায় নারী ঐক্য সংগঠন’’-এর সভানেত্রী ঝুমুর বেগম বলেন, ‘‘আমরা দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর বাসিন্দারাও তো সমাজের অন্য মানুষের মতোই মানুষ। আমাদেরও আছে অধিকার। আগে এখানে কেউ মারা গেলে তাকে নদীতে ভাসানো বা মাটিচাপা দেওয়া হতো। অথচ আমাদের বেশিরভাগই মুসলিম। আমরা প্রশাসনের কাছে মৃত্যুর পর যাতে জানাজা আর দাফন করা হয় সেই দাবি জানিয়ে আসছিলাম দীর্ঘদিন ধরে। সেই দাবি বাস্তবায়িত হওয়া আমাদের কাছে ভাগ্যের ব্যাপার। আমরা যে কেউ মারা গেলে থানায় খবর দেই। আমাদের কেউ মারা গেলে এখন প্রশাসনের সহযোগিতায় ধর্মীয়ভাবে দাফনের ব্যবস্থা করা হবে। এসব কাজে এগিয়ে এসেছেন ওসি আশিকুর রহমান ।তাকে জানাই অনেক অনেক সম্মান ও ধন্যবাদ।

দৌলতদিয়া ইউনিয়ন ৫ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য আব্দুল জলিল ফকির বলেন, শুধু রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ ঘাট থানাই নয়, দেশের প্রতিটি থানা হোক জনগনের আস্থার স্থল। পুলিশ সত্যিই পরিচিত হোক জনগণের বন্ধু হিসেবে।

ওসি আশিক জানান, ‘‘মুজিব বর্ষ উপলক্ষে পুলিশের স্লোগান হচ্ছে ‘মুজিব বর্ষের অঙ্গীকার, পুলিশ হবে জনতার’। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও আমাদের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চাচ্ছেন পুলিশ আরও জনবান্ধব হোক। আমি খেয়াল করেছি মানুষ ওসির রুমে ঢুকতে ইতস্তত বোধ করে, ভয় পায়। অনেক সময় অনুমতির জন্য ঘোরাফেরা করে। এতে জনগণের সঙ্গে একটা দূরত্ব থেকে যায়। আমি প্রজাতন্ত্রের কর্মচারি। মানুষ আমাকে তাদের একজন ভাববে এটাই আমি চাই। তাই রুমের বাইরে ওই লেখা টানিয়েছি।’’