• মঙ্গলবার, নভেম্বর ২৪, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৯:১৫ রাত

ত্বকী হত্যাকাণ্ড: সাত বছর পেরিয়ে গেলেও শেষ হয়নি তদন্ত

  • প্রকাশিত ১০:৩১ সকাল মার্চ ৬, ২০২০
তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী
২০১৩ সালের ৬ মার্চ অপহরণের পর হত্যা করা হয় নারায়ণগঞ্জের কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীকে সৌজন্য

মৃত্যুর কয়েকদিন আগে ত্বকী লিখে গিয়েছিল, ' আমি প্রস্তর হয়ে মরলাম উদ্ভিদ হতে..উদ্ভিত গয়ে মরি, তো উত্থিত প্রাণে'

“১৯৯৫ সালের ৫ অক্টোবর বিকেলে ত্বকীর জন্ম। দিনটি ছিল বিজয়া দশমী। মৃত্যু ২০১৩ সালে ৬ মার্চ। ঘাতকের জবানবন্দি থেকে জানা যায়, ৬ মার্চ রাত ১১টায় ত্বকীর মৃত্যু হয়। দিনটি ছিল ২২ ফাল্গুন। ফাল্গুনের পথিক আমার ত্বকী। অবশেষে ফাল্গুনের আগুনের ঢেউ বুকের কান্নার সাথে এসে মিশে গেলো আরেক ফাল্গুনে।”

এভাবেই সন্তানের মৃত্যুর বর্ণনা দিয়েছেন নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীর বাবা ও নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি।

আদালতে এক ঘাতকের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির বরাত দিয়ে রফিউর আরও বলেন, গজারির লাঠি দিয়ে পিটিয়ে অজ্ঞান করার পর বুকের ওপর উঠে গলা টিপে হত্যা করা হয় তাকে। ঘাতকরা যখন ওকে মাথায় আঘাত করে আমি জানি না জোরে না কথা বলতে না চাওয়া আমার ত্বকী তখন চিৎকার করেছিলো কি না। কী বলেছিল ওদের?

অপহরণের পর ২০১৩ সালের ৬ মার্চ হত্যা করা হয় ত্বকীকে। পরদিন ৭ মার্চ পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছিলো। ‘এ’ লেভেল প্রথম পর্বের পরীক্ষায় রেকর্ড নম্বর পেয়েছিল সে। কিন্তু আর সামনে বাড়েনি তার পথচলা। ৮ মার্চ সকালে শীতলক্ষ্যার পাড়ে পাওয়া যায় তার মরদেহ।

অবচেতন মনে হয়তো এ পরিণতির কথা আগেই টের পেয়েছিলো সে। তাই নিখোঁজ হওয়ার কয়েকদিন আগে মনের কথা কবিতায় কবিতায় বলে গিয়েছিলো- 

 “আমি প্রস্তর হয়ে মরলাম উদ্ভিদ হতে

উদ্ভিত গয়ে মরি, তো উত্থিত প্রাণে

মানুষ হয়ে উঠলাম পরে, যখন সত্য উদ্ভাসিত হলো

ভয় কিসের মৃত্যুতে, দ্বিধা কেন মৃত্যুতে?”

তানভীর মাহমুদ ত্বকী। ছবি: সৌজন্য

ত্বকীর আগ্রহ ছিলো জগৎ, মহাকাশ ও এর সৃষ্টি রহস্য নিয়ে। ভালোবাসতো ছবি আঁকতে, আবৃত্তি ও গান করতে। কিন্তু এসব এখন কেবলই স্মৃতি। 

২০১৩ থেকে ২০২০; পেরিয়ে গেছে সাতটি বছর। দীর্ঘ এই সময়ে সন্তানের স্মৃতিগুলো আঁকড়ে ধরে খুনের বিচারের আশায় প্রতিবাদ কর্মসূচীসহ বিভিন্নভাবে দাবি জানিয়ে যাচ্ছেন রফিউর রাব্বী ও তার পরিবার। 

তবে মামলার অগ্রগতি বলতে কেবল ২০১৪ সালে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়নের (র‌্যাব) তদন্ত করে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছিলো। অল্প সময়ের মধ্যে চার্জশিট দেওয়ার কথা থাকলেও তা আজও জমা পড়েনি।

ত্বকী হত্যার বিচার কার্যক্রমের বর্তমান অবস্থা, অগ্রগতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে ঢাকা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা হয় রফিউর রাব্বির সঙ্গে।

তিনি বলেন, “সবই ঠিকঠাক চলছিলো। প্রথমে পুলিশ ত্বকী হত্যা মামলার তদন্ত শুরু করে। পরবর্তীতে তিনমাসের মাথায় র‌্যাব উচ্চ আদালতের নির্দেশে র‌্যাব এ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শুরু করে। ত্বকীকে যেখানে হত্যা করা হয়েছিলো, আজমেরী ওসমানের সেই টর্চার সেলে অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে র‍্যাব। হত্যাকাণ্ডে জড়িত ইউসুফ হোসেন লিটন ও সুলতান শওকত ভ্রমর ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেয়। কারা, কীভাবে হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছিল তার বর্ণনা দিয়েছিল লিটন ও ভ্রমর। ২০১৪ সালের ৫ মার্চ র‌্যাবের প্রধান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যমের কাছে ত্বকী হত্যার রহস্য উদঘাটনের সময় এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়। কিন্তু ওই সংবাদ সম্মেলনের ৩ মাসের মাথায় ২০১৪ সালের ৩ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার কার্যালয়ে একটি বক্তব্য ওসমান পরিবারের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতির দেন। ঠিক এর পরপরই ত্বকী হত্যাকাণ্ডের বিচারকার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এরপরেও এটার কোনো অগ্রগতি নেই।”

র‌্যাবের তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসানের বরাত দিয়ে রফিউর আরও জানান, আজমেরী ওসমানের নির্দেশে ও তার উপস্থিতিতে ১১ জন তার টর্চার সেলে ত্বকীকে হত্যা করেছে। অপহরণ থেকে হত্যাকাণ্ড ও মরদেহ ফেলে দেওয়া পর্যন্ত সবকিছুর বর্ণনা দেওয়া হয়েছিল ওই সংবাদ সম্মেলনে। এমনকি উপস্থিত সাংবাদিকদের তারা একটি খসড়া অভিযোগপত্রও সরবরাহ করে। জানিয়েছিলেন যে অতিদ্রুতই তারা এটা আদালতে পেশ করবে।

তার অভিযোগ, ঘাতকদের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক রয়েছে এবং তারা সরকারি দল ও সরকারের বিভিন্ন পর্যায় রয়েছে। তাই সরকার বিচারকাজ বন্ধ করে রেখেছে।

তিনি বলেন, শুধুমাত্র ত্বকী নয়, সাগর-রুনি, তনু হত্যারও বিচার হচ্ছে না। কিন্তু ওই হত্যাকাণ্ডগুলোর রহস্য উদঘাটিত হয়নি। ত্বকী হত্যার ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। এক্ষেত্রে ঘাতকরা সরকারি দলের বিভিন্ন পর্যায় থাকায় বিচার হচ্ছে না।

কেন মরতে হয়েছিল ত্বকীকে?

ত্বকীর না ছিল কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, না ছিল কারও সঙ্গে কোনো দ্বন্দ্ব। তবুও তাকে মরতে হয়েছিল নির্মমভাবে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট র‌্যাব কর্মকর্তারা (একাধিক গণমাধ্যমের তৎকালীন প্রতিবেদন অনুযায়ী) জানান, ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসি) নির্বাচন নিয়ে বিরোধের জের ধরে এই হত্যার ঘটনা ঘটে। সেবার সেলিনা হায়াৎ আইভীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ছিলেন রফিউর রাব্বি। অন্যদিকে, শামীম ওসমান ছিলেন দল সমর্থিত আওয়ামী লীগ প্রার্থী। ওই নির্বাচনে আইভীর কাছে বিপুল ভোটে পরাজিত হন শামীম ওসমান। এছাড়া, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে চলাচলকারী বিভিন্ন পরিবহনের মালিকরা ওসমান পরিবারের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ আনেন। যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ ফোরামের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি এই চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করেন। মূলত রফিউর রাব্বিকে “শায়েস্তা” করতেই তার ছেলেকে হত্যা করা হয়।

এ বিষয়ে কর্নেল জিয়াউল আহসান গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, আজমেরী ওসমানের (নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য নাসিম ওসমানের ছেলে এবং শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের ভাতিজা) পরিকল্পনা, নির্দেশনা ও উপস্থিতিতেই ত্বকীকে হত্যা করা হয়েছিল।

যারা অভিযুক্ত- তদন্তে আজমেরী ওসমান ছাড়া অন্য যাদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে তারা হলো- রাজীব, কালাম শিকদার, মামুন, অপু, কাজল, শিপন, জামশেদ, ইউসুফ হোসেন, সুলতান শওকত ওরফে ভ্রমর ও তায়েবউদ্দিন ওরফে জ্যাকি। তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে আজমেরীসহ প্রথম সাতজন পলাতক রয়েছেন। বাকিরা কারাগারে। 

ত্বকী হত্যা মামলার  অগ্রগতি  নিয়ে র‍্যাব-১১ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আলেপ উদ্দীন ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন , ‘‘ত্বকী হত্যা মামলার তদন্ত চলছে। শিগগিরই চার্জশিট জমা দেওয়া হবে।’’

বাবা-মায়ের সঙ্গে ত্বকী। ছবি: সৌজন্য

আসামিদের কে কোথায়? 

ত্বকী হত্যা মামলায় ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়া ইউসুফ হোসেন লিটন ও সুলতান শওকত ভ্রমর বর্তমানে উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মু্ক্ত। ভ্রমর ইতোমধ্যে দেশের বাইরে চলে গেছেন। আজমেরী ওসমান ও অন্যান্য আসামিরাও জামিনে বাইরে রয়েছে।

এই সরকারের আমলে না হলেও অন্য সরকারের আমলে হলেও ত্বকী হত্যার বিচার সম্পন্ন ও আসামীদের আইনের আওতায় আনা হবে এমন আশা ব্যক্ত করে ত্বকীর বাবা বলেন, “এ সরকার তো চিরস্থায়ী নয়। সরকারের বদল হবে, বিচারও অবশ্যই হবে। বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার হয়েছে তিনযুগ পরে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে চার দশক পরে। ত্বকী হত্যারও বিচার হবে এবং যারা এ হত্যাকাণ্ডের বিচার বন্ধ করে রেখেছে তাদেরকেও জবাবদিহি করতে হবে।”

ত্বকী হত্যার বিচারের দাবি জানিয়ে নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান বলেন, “ত্বকী হত্যাকান্ডের বিচার হচ্ছে না প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের কারণেই। তার নির্দেশেই এ হত্যাকাণ্ডের কার্যক্রম থেমে গেছে। কারণ তিনি সংসদে দাড়িয়ে হত্যাকারী পরিবারটির দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তবে আশা করি একা না একদিন এ হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে।”

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের বিভাগীয় প্রধান অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান মাসুম জানান, আমরা সবসময়ই বলি ত্বকী হত্যার বিচার চাই। বারবার আবেদন করার পরেও আমরা সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাচ্ছি না। আর এর কারণ হলো ওসমান পরিবার। এই গডফাদারদের প্রভাব যতদিন থাকবে ততদিন হয়তো ত্বকী হত্যার বিচার হবে না। তবে আমরা বিশ্বাস করি ত্বকী হত্যাকারীদের বিচার একদিন না একদিন হবেই। 

৬ মার্চ তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যাকাণ্ডের সাত বছর উপলক্ষে- ৬, ৭, ৮ ও ১৩ মার্চ নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকায় বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।

২০১৩ সালের ৬ মার্চ বিকেলে পাঠাগারে যাওয়ার পথে নারায়ণগঞ্জের বঙ্গবন্ধু সড়ক থেকে তানভীর মুহম্মদ ত্বকীকে অপহরণ করা হয়। ঘটনার দিন রাতেই তার বাবা রফিউর রাব্বি নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় বিষয়টি উল্লেখ করে সাধারণ ডায়েরি করেন এবং র‌্যাব-১১ এর কার্যালয়ে চিঠি দেন। এর দু'দিন পর ৮ মার্চ সকালে শীতলক্ষ্যা নদীর খালের পাড় থেকে পুলিশ ত্বকীর মরদেহ উদ্ধার করে। সেই রাতেই ত্বকীর বাবা বাদী হয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় দ-বিধি ৩০২/৩৪ ধারায় আসামি অজ্ঞাত উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। ১৮ মার্চ তিনি জেলা পুলিশ সুপারের কাছে ত্বকী হত্যার জন্য শামীম ওসমান ও তার ছেলে অয়ন ওসমানসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে একটি অবগতিপত্র দেন।

58
50
blogger sharing button blogger
buffer sharing button buffer
diaspora sharing button diaspora
digg sharing button digg
douban sharing button douban
email sharing button email
evernote sharing button evernote
flipboard sharing button flipboard
pocket sharing button getpocket
github sharing button github
gmail sharing button gmail
googlebookmarks sharing button googlebookmarks
hackernews sharing button hackernews
instapaper sharing button instapaper
line sharing button line
linkedin sharing button linkedin
livejournal sharing button livejournal
mailru sharing button mailru
medium sharing button medium
meneame sharing button meneame
messenger sharing button messenger
odnoklassniki sharing button odnoklassniki
pinterest sharing button pinterest
print sharing button print
qzone sharing button qzone
reddit sharing button reddit
refind sharing button refind
renren sharing button renren
skype sharing button skype
snapchat sharing button snapchat
surfingbird sharing button surfingbird
telegram sharing button telegram
tumblr sharing button tumblr
twitter sharing button twitter
vk sharing button vk
wechat sharing button wechat
weibo sharing button weibo
whatsapp sharing button whatsapp
wordpress sharing button wordpress
xing sharing button xing
yahoomail sharing button yahoomail