• শনিবার, মে ৩০, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ১১:৫১ রাত

বীরাঙ্গনা: বঙ্গবন্ধুর কন্যারা

  • প্রকাশিত ০১:১৭ রাত মার্চ ১৭, ২০২০
বীরাঙ্গনা
নাম না জানা একজন বীরাঙ্গনা। সৈয়দ জাকির হোসেন/ঢাকা ট্রিবিউন

বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন, ‘বীরাঙ্গনা’রা তাদের ঠিকানায় ধানমণ্ডি ৩২ এর উল্লেখ করবেন এবং তাদের পিতার নামের জায়গায় ব্যবহার করবেন বঙ্গবন্ধুর নাম 

পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর সঙ্গে নয়মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ফলে জন্ম হয় স্বাধীন বাংলাদেশের। সদ্য স্বাধীন দেশের গল্পে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কাহিনী স্থান পেয়েছে। ১৯৭১ সালের শেষদিকে স্বাধীনতা অর্জিত হওয়ায় দেশের সকল জনগণ ছিলো আনন্দে উদ্বেলিত। তবে, পাকিস্তানি সেনাদের পরাজয়স্বীকার ও আত্মসমর্পণের পরও অনেক নারীর যুদ্ধ শেষ হয়নি। আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও সেইসব নারীদের কাউকে নির্বাসিত অথবা তাদেরকে ভুলভাবে উপস্থাপিত কিংবা চরম অবমাননার শিকার হতে হয়েছে। 

কী তাদের অপরাধ?

মুক্তিযুদ্ধকাল তারা ধর্ষিত হয়েছেন, অকথ্য নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, পাকিস্তানি সেনা ও আধা-সামরিকবাহিনী তাদেরকে যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করেছে। পাকিস্তানি ক্যাম্পে তুলে নিয়ে যাওয়া এইসব ভ্যাগ্যহত নারীদের কখনোই মুক্তিযুদ্ধের গৌরবের ভাগ দেওয়া হয়নি। 

তবে, একজন মহান নেতা ছিলেন যিনি এসব সাহসিকাদের নিজের হৃদয়ে জায়গা দিয়েছিলেন এবং একইসাথে “বীরাঙ্গনা” উপাধি দিয়ে তাদেরকে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করেছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাড়া আর কেউ নন। বঙ্গবন্ধু তাদের জন্য পুনর্বাসনকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেখানে তাদের নানারকম দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো যেন তারা নিজেদের জীবন নিজেরাই চালাতে পারেন।

১৯৭২ সালের মে মাসে নিউইয়র্ক টাইমস একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে যেখানে এই সম্পর্কে বলা হয়: “প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক প্রতিষ্ঠাকৃত ন্যাশনাল বোর্ড অব দ্য বাংলাদেশ উইমেন’স রিহ্যাবিলিটেশন প্রোগ্রাম, যার প্রধান কার্যালয় ঢাকায় (Dacca) স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে দেশব্যাপী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।”

“ঢাকায় প্রকাশিত বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা থেকে জানা যায় সুসংগঠিত ধর্ষণ ছিলো দখলদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি নীতি। এর মূল উদ্দেশ্যই ছিলো বাঙালি নারীর গর্ভে অ-বাঙালি পিতার সন্তান জন্ম দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে দুর্বল করে দেওয়া।” 

প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা শাহিনা হাফিজ ডেইজী মুক্তিযুদ্ধে বীরাঙ্গনাদের নিয়ে একদশকের বেশি সময় যাবৎ গবেষণা করেছেন। তিনি ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, বঙ্গবন্ধুর মহৎ উদ্যোগ ছাড়া বীরাঙ্গনাদের সমাজে পুনর্বাসন সেসময় কখনই সম্ভব ছিলো না। 

তিনি বলেন, “বহিঃশত্রু ও তাদের দোসরদের দ্বারা ধর্ষিত হওয়ায় সমাজের অবমাননার শিকার নারীদের পুনর্বাসনে জাতির পিতাই প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তবে দুর্ভাগ্য হলো, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর বীরাঙ্গনাদের জন্য চলমান সকল সহায়তা বন্ধ করে দেওয়া হয়।”

শাহিনা আরও জানান, মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর যখন মুক্তিযোদ্ধাদের বীরের মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে, তখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের এদেশীয় সহায়তাকারীরা জোরপূর্বক যেসব নারীদের ক্যাম্পে নিয়ে গিয়েছিলো তাদের থেকে সমাজের মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেয়। সবচেয়ে ঘৃণ্য অধ্যায় ছিলো, অনেক পরিবার বীরাঙ্গনাদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারিভাতা নিলেও তাদেরকে পরিবারে ফিরিয়ে নেয়নি।

তিনি বলেন, যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত এসকল নারীকে এক জনসমাবেশে বঙ্গবন্ধুই প্রথম “বীরাঙ্গনা” নাম দেন। 

শাহিনা বলেন, “এক বীরাঙ্গনা বঙ্গবন্ধুর কাছে এসে সমাজে তাদের অবর্ণনীয় দুর্দশার কথা জানালে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন তারা এখন থেকে বীরাঙ্গনা হিসেবে সম্মানীয় হবেন। বঙ্গবন্ধু পরে এরকমও ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, তারা ঠিকানা হিসেবে ধানমণ্ডি ৩২ এর উল্লেখ করবেন এবং তাদের পিতার নামের জায়গায় ব্যবহার করবেন বঙ্গবন্ধুর নাম।” 

বীরাঙ্গনার অগ্নিপরীক্ষা

নীলিমা ইব্রাহীমের “আমি বীরাঙ্গনা বলছি” বইতে মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানি ক্যাম্পে নারীদের ওপর চলা যৌনসহিংসতার বর্ণনা করেছেন। তারা ক্যাম্পের ভেতরে থাকা নারীদের কখনো শাড়ি বা ওড়না পরতে দিতো না। কারণ কয়েকজন নারী গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। তাদের সাথে রাস্তার কুকুর-বেড়ালের মতো আচরণ করা হতো।

তারা ছিলেন একজন বীরাঙ্গনা।

বইটিতে তারা বর্ণনা করেছেন, “আমি এক নার্সের মুখে শুনতে পেলাম যে প্রধানমন্ত্রী আমাদের বীরাঙ্গনা উপাধি দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু আমাদেরকে এভাবে সম্মান দিয়েছেন জানার পরই আমার চোখ জলে ভরে ওঠে। আমাদের মহান নেতার প্রতি আমার হৃদয় গভীর শ্রদ্ধায় ভরে যায়।” 

বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়ার আগে তারার সুযোগ হয়েছিলো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করার। তারা জানান, তার মনে হচ্ছিলো তাদের আর কাউকে প্রয়োজন নেই কারণ বঙ্গবন্ধু তাদের পাশে আছেন।

বঙ্গবন্ধু বলেন, “তুমি আমার মা। এই জাতির স্বাধীনতার জন্য তুমি নিজেকে উৎসর্গ করেছো। তুমি মহান। তোমার দুশ্চিন্তার কী কারণ আছে যেখানে আমি আছি তোমার পাশে?”

আরেকজন বীরাঙ্গনা মমতাজ, যাকে শ্রীপুর উপজেলায় আট পাকিস্তানি হানাদার গণধর্ষণ করেছিলো। একপর্যায়ে তিনি সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়েন। পরে তিনি একটি মৃত সন্তান জন্ম দেন। এরপর তিনি একটি হাসপাতালে তিনমাস ছিলেন। তিনি বেঁচে গেলেও তার যৌনাঙ্গ ও মলদ্বার এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো যে সেগুলো আর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায়নি।

এরপর দীর্ঘপ্রতীক্ষিত স্বাধীনতার ক্ষণ উপস্থিত হলেও এইসকল অসহনীয় নির্যাতনের শিকার নারীরা সবরকম উদযাপনের বাইরে ছিলো। 

তিনি হলেন বঙ্গবন্ধু। অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ ও বিশাল হৃদয়ের এক মহান নেতা, যিনি বীরাঙ্গনাদের সম্মানের সাথে গ্রহণ করেছিলেন নিজের কন্যা হিসেবে।    

53
50
blogger sharing button blogger
buffer sharing button buffer
diaspora sharing button diaspora
digg sharing button digg
douban sharing button douban
email sharing button email
evernote sharing button evernote
flipboard sharing button flipboard
pocket sharing button getpocket
github sharing button github
gmail sharing button gmail
googlebookmarks sharing button googlebookmarks
hackernews sharing button hackernews
instapaper sharing button instapaper
line sharing button line
linkedin sharing button linkedin
livejournal sharing button livejournal
mailru sharing button mailru
medium sharing button medium
meneame sharing button meneame
messenger sharing button messenger
odnoklassniki sharing button odnoklassniki
pinterest sharing button pinterest
print sharing button print
qzone sharing button qzone
reddit sharing button reddit
refind sharing button refind
renren sharing button renren
skype sharing button skype
snapchat sharing button snapchat
surfingbird sharing button surfingbird
telegram sharing button telegram
tumblr sharing button tumblr
twitter sharing button twitter
vk sharing button vk
wechat sharing button wechat
weibo sharing button weibo
whatsapp sharing button whatsapp
wordpress sharing button wordpress
xing sharing button xing
yahoomail sharing button yahoomail