• রবিবার, এপ্রিল ০৫, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ১২:৫৯ দুপুর

থানায় ঝুলন্ত লাশ: পুলিশ বলছে আত্মহত্যা, পরিবারের দাবি হত্যা

  • প্রকাশিত ১০:১৬ রাত মার্চ ২৬, ২০২০
বরগুনা
নিহত শানু হাওলাদার। সংগৃহীত/ঢাকা ট্রিবিউন

‘মুই টাকা দেতে রাজি অই নাই হেইয়্যার লইগ্যা মোর স্বামীকে পুলিশে পিডাইয়্যা মাইরা হালাইছে’

বরগুনার আমতলী থানা হাজতে শানু হাওলাদার নামের এক ব্যক্তির রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। মৃতের পরিবারের অভিযোগ, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল বাশার (ওসি, তদন্ত) মনোরঞ্জন মিস্ত্রির দাবিকৃত তিন লক্ষ টাকা না দেওয়ায় নির্যাতন করে হত্যা করা করা হয়েছে। তবে পুলিশের দাবি, আত্মহত্যা করেছে শানু হাওলাদার।

বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সকালে বরগুনার আমতলী থানায় এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আমতলী থানার ওসি (তদন্ত) মনোরঞ্জন মিস্ত্রি ও ডিউটি অফিসার মো. আরিফুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। গঠন করা হয়েছে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি।

নিহতের পরিবার ও স্থানীয়দের সূত্রে জানা গেছে, আমতলী উপজেলার গুলিশাখালী ইউনিয়নের কলাগাছিয়া গ্রামে ২০১৯ সালে বছর ৩ নভেম্বর ইব্রাহিম নামের এক জনকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ওই হত্যা মামলার এজাহারে নিহত শানু হাওলাদারের সৎ ভাই মিজানুর রহমান হাওলাদারকে আসামি করা হয়। আসামির ভাই শানু হাওলদারকে গত সোমবার রাত সাড়ে এগারটার দিকে সহেন্দভাজন হিসেবে জিজ্ঞেসাবাদের জন্য আমতলী থানা পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। গত মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) থানায় গিয়ে শানু হাওলাদারকে খাবার দিয়ে যায় তার ছেলে সাকিব। কিন্তু বুধবার (২৫ মার্চ) শানু হাওলাদারের সাথে কাউকে দেখা করতে দেয়নি পুলিশ। পরে বৃহস্পতিবার সকালে থানা থেকে খবর দেওয়া হয়, শানু হাওলাদার ওসি কক্ষে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে।


আরও পড়ুন - নারীর সাথে আপত্তিকর অবস্থায় পুলিশ কর্মকর্তা আটক


তবে পরিবারের অভিযোগ, শানুকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর আমতলী থানা ওসি আবুল বাশার ও মনোরঞ্জন মিস্ত্রি তাদের কাছে তিন লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। টাকা দিতে না পারায় আসামি শানু হাওলাদারকে থানা হাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে।  

নিহত শানু হাওলাদারের ছেলে সাকিব হোসেন বলেন, আমার বাবাকে ধরে এনে তিন লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেছেন ওসি। মঙ্গলবার দুপুরে আমি ওসিকে ১০ হাজার টাকা দেই। কিন্তু ১০ হাজার টাকায় ওসি তুষ্ট হয়নি। টাকার জন্য নির্যাতনের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়ে বারবার আমার কাছে ঘুষের টাকা দাবি করেন।

তিনি আরও বলেন, বুধবার সকালে আমি বাবার সাথে দেখা করতে থানায় গেলে তারা আমাকে দেখা করতে দেয়নি। এ সময় ওসি বলেন, টাকা নিয়ে আস তারপর দেখা করতে দেব।

নিহত শানু হাওলাদারের শ্যালক রাকিবুল ইসলাম বলেন, দুলাভাইকে ধরে আনার টাকার জন্য পুলিশ তাকে বেধড়ক মারধর করেছে। বহুবার চেষ্টা করেছি তার সাথে দেখা করতে, কিন্তু পুলিশ দেখা করতে দেয়নি। উল্টো আমাদের সাথে খারাপ আচরণ করেছে।


আরও পড়ুন - থানায় জব্দ মোটরসাইকেল চুরি করে পালানোর সময় হাতেনাতে ধরা এসআই 


নিহত শানু হাওলাদারের স্ত্রী ঝর্ণা বেগম বলেন, “পাঁচজন পুলিশ যাইয়া সোমবার রাইতে মোর স্বামীরে বাড়ি গোনে ধইর‌্যা আনছে। আনার সময় মোর কাছে টাকা চাইছে। মুই টাকা দেতে রাজি অই নাই হেইয়্যার লইগ্যা মোর স্বামীকে পুলিশে পিডাইয়্যা মাইরা হালাইছে। মুই এইয়্যার বিচার চাই।”

আমতলী উপজেলা গুলিশালালী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মো. নুরুল ইসলাম ও উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মো. মজিবুর রহমান জানান, শানু হাওলাদারকে বাড়ি থেকে ধরে এনে টাকা না পেয়ে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। আত্মহত্যার ঘটনা পুলিশের সাজানো।

আমতলী উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র মতিয়ার রহমান বলেন, “পুলিশ পরিকল্পিতভাবে শানুকে নির্যাতন করে হত্যা করেছে। এ ঘটনার বিচার দাবি করছি।”

আমতলী থানার ওসি মো. আবুল বাশার বলেন, “আসামি শানু হাওলাদার বৃহস্পতিবার সকাল সোয়া ৬টার দিকে ওয়াশরুমে যাওয়ার জন্য বলে। সে ওয়াশরুম থেকে ফিরে এসে এক ফাঁকে হাজত খানার ফ্যানের সাথে গলায় রশি পেচিয়ে আত্মহত্যা করেছে।”


আরও পড়ুন - ইয়াবা দিয়ে ফাঁসাতে গিয়ে গণধোলাইয়ের শিকার ৩ পুলিশ


কিন্তু হাজতখানায় কোনো ফ্যান নেই সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আগের বক্তব্য পাল্টে বলেন, “ওসি (তদন্ত) মনোরঞ্জনের কক্ষে ফ্যানের সাথে রশি পেঁচিয়ে আত্মত্যা করেছে।” টাকা না দেওয়ায় তাকে নির্যাতন করে হত্যার প্রসঙ্গটি এড়িয়ে যান তিনি।

আমতলী উপজেলা স্বাস্থ্য পরিবার ও পরিকল্পনা কর্মকর্তা শংকর প্রসাদ অধিকারী বলেন, “নিহত শানু হাওলাদারের শরীরে আঘাতের চিহৃ রয়েছে। তবে ময়না তদন্ত ছাড়া মৃত্যুর সঠিক কারণ বলা যাবে না।”

এ ঘটনার তদন্তকারী প্রধান বরগুনা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অপরাধ) মো. তোফায়েল আহম্মেদ বলেন, “দায়িত্ব অবহেলার দায়ে ওসি (তদন্ত) মনোরঞ্জন মিস্ত্রি ও ডিউটি অফিসার এএসআই মো. আরিফুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।”

বরগুনার পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন পিপিএম বলেন, “এ ঘটনায় তিন সদস্যের একটি তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” পুলিশ টাকা না পেয়ে নির্যাতন করে হত্যা করেছে কী না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যান তিনি।

তিনি আরও বলেন, “অপরাধী যেই হোক, নিরপেক্ষ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”


আরও পড়ুন - রাজধানীতে ধর্ষণের অভিযোগে পুলিশের এসআই গ্রেফতার