• শনিবার, আগস্ট ০৮, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৩:০৩ বিকেল

‘বাংলাদেশে কঠোর লকডাউন জরুরি’

  • প্রকাশিত ১০:১৯ রাত জুন ২৬, ২০২০
রাজাবাজার-লকডাউন-করোনাভাইরাস
এর আগে রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজার এলাকা লকডাউন করা হয়। মেহেদী হাসান/ঢাকা ট্রিবিউন

ড. রাজীব চৌধুরী সম্প্রতি একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন যাতে বলা হয় বিরতিহীন লকডাউন কোভিড-১৯ সংক্রমণের হারকে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে পারে

যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সহযোগী অধ্যাপক ও গ্লোবাল হেলথ এপিডেমিওলজির বৈজ্ঞানিক পরিচালক ড. রাজীব চৌধুরী সম্প্রতি একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন। ওই গবেষণাপত্রে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন- টানা লকডাউন করোনাভাইরাস (কোভিড-৯১) সংক্রমণকে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে পারে।

ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদক কোহিনুর খৈয়াম তিথিলাকে দেওয়া একটি একান্ত সাক্ষাত্কারে তিনি বাংলাদেশের নিজস্ব ধারণায় লকডাউন পদ্ধতির নকশা, এলাকাভিত্তিক লকডাউনের কার্যকারিতা ইত্যাদি নিয়ে কথা বলেছেন।

আপনার গবেষণাপত্রে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে যদি বাংলাদেশে ৫০ দিনের কঠোর লকডাউন এবং ৩০ দিনের শিথিল লকডাউন ব্যবস্থা চক্রাকারে পরিচালনা করা হয়, তবে কোভিড-১৯ সংক্রমণ ও মৃত্যু উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে। তবে, আপনি কি মনে করেন যে বাংলাদেশের মতো একটি নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ এই ধরনের লকডাউন কার্যকর করতে পারে?

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যু কমাতে এই মুহুর্তে অন্য কোনো বিকল্প নেই (যেমন জোনাল লকডাউন বা শিথিল লকডাউন)। যদি আমরা মানুষের প্রাণ বাঁচাতে এবং হাসপাতাল/আইসিইউগুলোকে উপচে পড়া ভিড় থেকে রক্ষা করতে চাই তবে আমার মতে একমাত্র উপায় হলো কিছু সময়ের জন্য কঠোর লকডাউন কার্যকর করা।

আমাদের গবেষণায় ৫০ দিনের কঠোর এবং ৩০ দিনের শিথিল  লকডাউনের চক্রটি কেবল ১৬টি দেশের জন্য চিত্রিত করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে গবেষণায় আমাদের মূল বার্তাটি ছিল, মৃত্যু ও হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে চক্রাকার লকডাউনের উপকারী ভূমিকাটি তুলে ধরা। এটি দুটি লকডাউনের মধ্যবর্তী সময়ে কোনো দেশকে ব্যবসায়ের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়। ফলে এই কৌশলটি বিশেষত দরিদ্র অর্থনীতিগুলোর জন্য বিশেষ উপযুক্ত।

বিশেষত, এটি বাংলাদেশের সাথে খুবই প্রাসঙ্গিক, যেখানে: ১) জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা ঐতিহাসিকভাবে নিম্নমানের, অগোছালো ও সমন্বয়হীন (সুতরাং অল্প সময়ের মধ্যে লাখ লাখ কোভিড-১৯ রোগী মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না), ২) এখানে সংক্রমণের ঘটনা অধিক এবং জনসংখ্যার ঘনত্বও বেশি (তাই ট্রেসিংভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি খুব কঠিন) এবং ৩) কোভিড-১৯ এর পরীক্ষা করা ও ফলাফল প্রদানের সক্ষমতা খুব কম (এখানে জোনভিত্তিক লকডাউন কার্যকর করাও খুব কঠিন)

আপনি কি মনে করেন জোন ভিত্তিক লকডাউন পদ্ধতি সংক্রমণের হারকে নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়তা করবে? জোনাল লকডাউন সম্পর্কে আপনার ধারণা কী?

জোনাল লকডাউনস, যদি যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হয় তবে নির্দিষ্ট অঞ্চলে সংক্রমণের হার হ্রাস করতে পারে, যেখানে প্রাদুর্ভাব গুচ্ছ আকারে রয়ে গেছে। যখন প্রায় প্রতিটি জেলায় সংক্রমণ ক্লাস্টার আকারে উপস্থিত হয়, তখন সেটি পুরো দেশকে প্রভাবিত করে। আসলে জোনাল লকডাউন বাস্তবায়ন ও পরিচালনা করা খুব কঠিন হয়ে যায়।

এছাড়াও, বাংলাদেশে অন্যান্য চ্যালেঞ্জ রয়েছে: ১) এলোমেলোভাবে নির্বাচিত ব্যক্তিদের উপর ভিত্তি করে দেশব্যাপী জনসংখ্যার ওপর নজরদারি ব্যবস্থা নেই এবং ২) পরীক্ষার জন্য পরীক্ষাগারের সুবিধা এবং দক্ষতা সাথে প্রতিবেদন তৈরির ক্ষমতাও নেই। এই উভয় ঘাটতিই সমগ্র দেশে রিয়েল-টাইমে সংক্রমণের হার ধারাবাহিকভাবে পর্যবেক্ষণের সামর্থ্যকে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে (যা হলুদ জোনকে লাল, বা একটি লাল অঞ্চলকে হলুদে রূপান্তরিত করার জন্য প্রয়োজন)।

জোন ম্যানেজমেন্ট, জোনে এবং আশেপাশে অঞ্চলে চলাচল নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা রয়েছে (এসব এলাকার লোকেরা অবাধে চলাফেরা করছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে)। ভারত এবং অন্যান্য দেশগুলোকে অনুসরণ করে এই জাতীয় ব্যবস্থার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু আমার ধারণা হলো সংক্রমণের হার বা মৃত্যু কার্যকরভাবে হ্রাস করতে বাংলাদেশে এটি কাজ করবে না।

আপনি বলেছিলেন স্থানীয়ভাবে করতে হবে। ঠিক কী ধরনের লকডাউন পদ্ধতি বাংলাদেশের জন্য উপযোগী?

আমি বিশ্বাস করি দেশব্যাপী (বা কমপক্ষে বৃহৎ এলাকাজুড়ে) লকডাউন বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন হবে। এখন, আমাদের জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও সংক্রমণের পরিমাণ হিসেব করে এই লকডাউনের সময়কাল ও সীমাবদ্ধতা বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকেরা নির্ধারণ করতে পারেন।

উদাহরণস্বরূপ, ডাব্লিউএইচও সম্প্রতি তাদের ক্রমবর্ধমান মহামারি নিয়ন্ত্রণে পাকিস্তানকে রোলিং লকডাউন অবলম্বন করার পরামর্শ দিয়েছে। এতে টানা ১৪ দিন কঠোর লকডাউন এবং অপর ১৪ দিন শিথিলতার কথা বলা হয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য বর্তমানের উচ্চ সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে, তাই আমি কমপক্ষে ২৮ দিনের কঠোর লকডাউন/২৮ দিনের শিথিলতার পরামর্শ দেব। নীতি-নির্ধারকরা মহামারি বিষয়ক বৈজ্ঞানিক তথ্য, স্থানীয় জনগণ ও ব্যবসায়ীদের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, কতদিনের লকডাউন চক্র দেওয়া যেতে পারে।

বাংলাদেশের জনসংখ্যার আকারের তুলনায় পরীক্ষার সংখ্যা এখনও কম। আপনি কি মনে করেন যেখানে পর্যাপ্ত তথ্য নেই, তবে কর্তৃপক্ষের পক্ষে যথাযথ লকডাউন পদ্ধতির মানচিত্র তৈরি করা সম্ভব?

আমি উল্লেখ করেছি যে, বর্তমানে পরীক্ষার সংখ্যা বাংলাদেশে পর্যাপ্ত নয়। এই মুহূর্তে প্রতি একলক্ষ লোকের মধ্যে মাত্র ৩৮০টি পরীক্ষা করা হচ্ছে। আমাদের এর চেয়ে কমপক্ষে পাঁচ গুণ বেশি পরীক্ষা করা দরকার।

এছাড়াও, বাংলাদেশে, পরীক্ষার পদ্ধতির বিষয়টি এখনও পর্যন্ত “উদ্দেশ্যমূলক” এবং মূলত নির্দেশিত নমুনাগুলোর উপর বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া হচ্ছে, সুতরাং এই পদ্ধতিটি পুরো দেশে রোগের প্রকৃত পরিমাণের চিত্র দেয় না।

সুতরাং, পরীক্ষার তথ্যের অভাবে (পুরো দেশ থেকে এলোমেলোভাবে নির্বাচিত লোকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা), সাধারণ অঞ্চলভিত্তিক লকডাউনগুলো দুর্ভাগ্যক্রমে কার্যকর হবে না।

আপনি কি মনে করেন যে বাংলাদেশের সংক্রমণ যখন দ্বিতীয় পর্যায়ে ছিল, তখন দেশের নীতি নির্ধারকরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন?

নীতিনির্ধারকরা অনেক বিবেচনার ভিত্তিতে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেন। তাই আমি তাদের পূর্ববর্তী সিদ্ধান্তগুলিতে মন্তব্য করতে পারি না। তবে ন্যায়সঙ্গতভাবে বলতে গেলে, কোভিড-১৯ মোকাবেলা করা বিশ্বব্যাপী সব সরকারের পক্ষে কঠিন ছিল। আমি সেই নীতিনির্ধারকদের প্রতি সহানুভূতি জানাই যাদের জীবন ও জীবিকা রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়।

তবে, আমি বলব প্রথম দিকে যারা এসেছিলেন তাদের ক্ষেত্রে কঠোর আইসোলেশনে নিয়ে গেলে বাংলাদেশের জন্য ভালো হতো।

এছাড়া লকডাউনটিকে একটি “সাধারণ ছুটি” বলায় সম্ভবত লোকেরা যথাযথভাবে তা পালন করেনি। তারপর যখন সংক্রমণের হার বাড়ছিল, তখনই লকডাউন তুলে নেওয়া হলো। এটিও কোনো ভালো সিদ্ধান্ত ছিল না।

যাইহোক, যা করা হয়েছে তা হয়েছে, এটি এখন কম গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এখন থেকে এখানে যা করব তা গুরুত্বপূর্ণ এবং মূল ফোকাস হওয়া উচিত। আমি সত্যিকার অর্থে বিশ্বাস করি যে বৈজ্ঞানিক বিকল্প গ্রহণ করা গেলে বাংলাদেশ এখনও এই পরিস্থিতিকে ঘুরিয়ে দিতে পারে,  আমাদের নীতিনির্ধারকরা এটি করতে সক্ষম।

বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য কোনো সুপারিশ?

প্রথমত, আমাদের সকলকে উপলব্ধি করা দরকার যে জীবন ও অর্থনীতি উভয় বাঁচানোই দেশের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। যখন একটি দেশ এমন প্রাণঘাতী রোগের কবলে পড়ে, যেখানে মৃত্যুর পরিমাণ বেশি এবং অনিয়ন্ত্রিত, মহামারিটি যখন নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে চলতে থাকে, আপনি সব চেষ্টা করলেও এ জাতীয় নেতিবাচক পরিবেশে সাফল্য অর্জন করা খুব কঠিন।

এছাড়াও, যদি কোনও দেশ কোভিড-১৯ এর হটস্পট হয় তবে অন্যদেশগুলো সেই দেশের সাথে ভ্রমণ বা ব্যবসায়ের অনুমতি নাও দিতে পারে। এতে অর্থনীতিকে আঘাত আসার বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়। সুতরাং, জনগণ ও শ্রমিকদের স্বাস্থ্যের সুরক্ষা অর্থনীতির যে কোনও সমস্যার মোকাবেলা এবং ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের জন্য খুবই অত্যাবশ্যক।

এটা মানছি যে, কঠোর লকডাউন অনেক দেশের জন্যই অর্থনৈতিকভাবে খুবই কঠিন পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, কিন্তু সেটি (লকডাউন) না হওয়া দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে (বা স্বাস্থ্য) সহায়তা করে না। সুইডেন এবং ব্রাজিল এর সর্বোত্তম উদাহরণ, যেখানে কঠোর লকডাউনের মাধ্যমে কোভিড -১৯ সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ না করে জীবন ও জীবিকা উভয়ই নেতিবাচকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।

আমরা যুদ্ধের মতো পরিস্থিতিতে রয়েছে, যেখানে আমরা প্রতিনিয়ত অদৃশ্য শত্রুর সাথে লড়াই করে চলেছি, জাতির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার করতে আমাদের স্বল্পমেয়াদী অর্থনৈতিক কষ্ট সহ্য করার মতো নমনীয়তা থাকতে হবে। এটি স্বাভাবিক সময় নয়।

সুতরাং, আমার বৈজ্ঞানিক মত হচ্ছে, রোগটি তাত্ক্ষণিকভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্য কঠোর (এমনকি স্বল্প-মেয়াদী হলেও) লকডাউন করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। যখন এই কঠোর লকডাউন প্রক্রিয়া চলছে, কিছু “মূল ব্যবসা” (যেমন আর্থিক ক্ষেত্র, ওষুধ বা পিপিই সরবরাহকারী, গার্মেন্টস কারখানা) ব্যতিক্রম হিসাবে বিবেচিত হতে পারে, এখানে কর্মক্ষেত্রে যথাযথ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করা উচিত। তবে নীতি নির্ধারকদের অবশ্যই এই বিষয়গুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

57
50
blogger sharing button blogger
buffer sharing button buffer
diaspora sharing button diaspora
digg sharing button digg
douban sharing button douban
email sharing button email
evernote sharing button evernote
flipboard sharing button flipboard
pocket sharing button getpocket
github sharing button github
gmail sharing button gmail
googlebookmarks sharing button googlebookmarks
hackernews sharing button hackernews
instapaper sharing button instapaper
line sharing button line
linkedin sharing button linkedin
livejournal sharing button livejournal
mailru sharing button mailru
medium sharing button medium
meneame sharing button meneame
messenger sharing button messenger
odnoklassniki sharing button odnoklassniki
pinterest sharing button pinterest
print sharing button print
qzone sharing button qzone
reddit sharing button reddit
refind sharing button refind
renren sharing button renren
skype sharing button skype
snapchat sharing button snapchat
surfingbird sharing button surfingbird
telegram sharing button telegram
tumblr sharing button tumblr
twitter sharing button twitter
vk sharing button vk
wechat sharing button wechat
weibo sharing button weibo
whatsapp sharing button whatsapp
wordpress sharing button wordpress
xing sharing button xing
yahoomail sharing button yahoomail