• মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ১১:০২ রাত

মিসরের উপহার দেওয়া ট্যাংক যেভাবে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছিলো

  • প্রকাশিত ০৯:৪৪ সকাল আগস্ট ১৫, ২০২০
বঙ্গবন্ধু
সৈয়দ জাকির হোসেন/ঢাকা ট্রিবিউন

১৫ আগস্ট যখন বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে হামলা হয় তখন মেজর ফারুক দু’টো ট্যাংক নিয়ে শেরেবাংলা নগরে রক্ষীবাহিনী হেডকোয়ার্টার ঘিরে ফেলে এবং সেখানে উপস্থিত ব্যাটালিয়নকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে

মিসরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার আল সাদাত ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে ৩০টি ট্যাংক উপহার দিয়েছিলেন। আর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেই ট্যাংক শেখ মুজিবকে হত্যার কাজে ব্যবহার করা হয়েছিলো।

শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যের সাথে হত্যার সময় ঘাতক সেনা কর্মকর্তারা শহরে ত্রাস সৃষ্টির জন্য সেসব ট্যাংক ব্যবহার করেছিলো। যদিও সেসব ট্যাংকে কোনও গোলা-বারুদ ছিলো না। এক বিশেষ প্রতিবেদনে এসব খবর জানিয়েছে ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি।

মিসর কেন ট্যাংক উপহার দিয়েছিল?

১৯৭৩ সালে আরব ইসরায়েল যুদ্ধের সময় সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ আরবদের সমর্থন দিয়েছিলো। আরবদের প্রতি সমর্থন ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে মিসরে চা পাঠিয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান।

আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর মিসরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার আল সাদাত বাংলাদেশের পাঠানো সেই উপহারের কথা ভোলেননি। ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মিসরের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ সফরে আসেন।

তখন আনোয়ার আল সাদাতের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবকে জানানো হয় যে মিসর বাংলাদেশকে ৩০টি ট্যাংক উপহার দিতে চায়। উদ্দেশ্য ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের অস্ত্রভাণ্ডার গড়ে তোলা।

পাকিস্তানি সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তার লেখা “বাংলাদেশ: আ লিগ্যাসি অব ব্লাড” বইতে সেই ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। বইটির বাংলা অনুবাদ করা হয়েছে “বাংলাদেশ রক্তের ঋণ” শিরোনামে। ১৯৮৮ সালে অনুবাদ করা সে বইটি প্রকাশ করেছে হাক্কানি পাবলিশার্স।

অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের বর্ণনা অনুযায়ী শেখ মুজিবুর রহমান ট্যাংক গ্রহণ করতে খুব একটা রাজি ছিলেন না। কিন্তু পররাষ্ট্র দপ্তর ও মন্ত্রীরা তাকে বোঝাতে সক্ষম হন যে উপহার ফিরিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। ট্যাংকগুলো নিয়ে আসার জন্য তৎকালীন সেনাবাহিনীর একটি প্রতিনিধি দল মিসর সফরে যায়। ১৯৭৪ সালের জুন মাস নাগাদ এসব ট্যাংক বাংলাদেশে আসে।

তখন ঢাকা ব্রিগেড কমান্ডার ছিলেন, মইনুল হোসেন চৌধুরী, যিনি মেজর জেনারেল হিসেবে অবসর নিয়েছেন এবং ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অন্যতম উপদেষ্টা ছিলেন। ২০১০ সালে জেনারেল চৌধুরী মৃত্যুবরণ করেন। তার লেখা “এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক” বইতে মিসরের উপহার দেওয়া ট্যাংক সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে।

জেনারেল মইনুল লিখেছেন, "একদিন কথা প্রসঙ্গে আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে ট্যাংকগুলোকে উত্তরবঙ্গের রংপুর সেনানিবাসে পাঠানোর প্রস্তাব করি। ..কিন্তু প্রধানমন্ত্রী আমার কথার কোন গুরুত্ব দেননি। দুঃখজনক হলেও সত্যি, ১৯৭৫ সালে মুজিব হত্যার সময় ওই ট্যাংকগুলোই ব্যবহার করা হয়েছিল।"

১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড ও মিসরের দেওয়া ট্যাঙ্ক

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোর চারটার দিকে ঘাতক ফারুক রহমানের সহযোগী ও অনুগত সৈন্যরা পরিকল্পনা অনুযায়ী সংগঠিত হতে লাগলো। ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে রাতের আঁধারে এতো বড় ধরণের প্রস্তুতি গোয়েন্দারা টের পায়নি কেন সেটি আজও এক বিরাট প্রশ্ন। জড়ো হওয়ার আধাঘণ্টার মধ্যেই ফারুক রহমান তার বাহিনী নিয়ে যাত্রা শুরু করলো।

সাংবাদিক অ্যন্থনি মাসকারেনহাসের বর্ণনা অনুযায়ী গন্তব্যের পথে ফারুক ক্যান্টনমেন্টের গোলাবারুদের সাব-ডিপোর সামনে থামলো। সে ধারণা করেছিলো সেখানে ট্যাংকের গোলা-বারুদ ও মেশিনগানের কিছু বুলেট পাওয়া যাবে। কামানের ব্যারেলের ধাক্কায় ডিপোর দরজা খোলা হলো কিন্তু সেখানে গোলা-বারুদ বা মেশিনগানের বুলেট কিছুই পাওয়া যায়নি।

মাসকারেনহাস লিখেছেন, "সুতরাং ধোঁকা দিয়ে কার্যসিদ্ধি করা ছাড়া আর কোনও গতি রইলো না।"

ফারুকের ট্যাংক বহর যখন এগিয়ে যাচ্ছিলো তখন ৪র্থ ও ১ম বেঙ্গল পদাতিক বাহিনীর একদল সৈন্যের সাথে তাদের দেখা হলো। এসময়ে তারা প্রাতঃকালীন পিটি করতে বের হয়েছিল। কিন্তু ফারুকের নেতৃত্বে ট্যাংক বহর প্রশিক্ষণ এলাকা ছাড়িয়ে শহরের মূল সড়কের দিকে গেলেও কারো মনে কোন প্রশ্ন জাগেনি।

ফারুক রহমানসহ ঘাতকদের মনে তৎকালীন রক্ষীবাহিনী নিয়ে উদ্বেগ ছিলো। তারা ভেবেছিলো, মুজিবকে হত্যা করতে গেলে রক্ষীবাহিনীর তরফ থেকে প্রতিরোধ আসতে পারে। সেজন্য ক্যান্টনমেন্ট থেকে ট্যাংকের বহর নিয়ে বের হয়ে ফারুক রহমান গিয়েছিল শেরে বাংলা নগরে রক্ষীবাহিনীর সদরদপ্তরে। আরেকটি দল গিয়েছিল শেখ মুজিব, শেখ ফজলুল হক মনি ও আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের বাড়িতে।

ট্যাংক নিয়ে ধোঁকা দিয়েছিলো ফারুক রহমান

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সকাল ১০:৩০ মিনিট নাগাদ ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারে কর্নেল সাফায়াত জামিলের রুমে আসেন সাখাওয়াত হোসেন।

সাখাওয়াত হোসেন পরবর্তীতে ব্রিগেডিয়ার হিসেবে অবসর নেন এবং ২০০৭ সালে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার এম সাখাওয়াত হোসেন তার “বাংলাদেশ: রক্তাক্ত অধ্যায় ১৯৭৫-৮১” বইতে।

ব্রিগেডিয়ার হোসেন লিখেছেন, সেখানে কিছুক্ষণ পরে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশারফ ও তার একটু পরে মেজর ফারুক রহমান (হত্যাকারী) আসেন। ট্যাংকের কালো পোশাক পরিহিত অবস্থায় মেজর ফারুক সে রুমে প্রবেশ করেন। মেজর ফারুক তখন বলেন, তার ট্যাংকে কোন গোলাবারুদ নেই।

ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত লিখেছেন, "এই প্রথম আমি জানলাম যে, ফারুকের কোন ট্যাংকেরই মেইন গানের কোন গোলাবারুদ রাতের অভিযানের সময় এবং প্রায় সকাল ১০টা পর্যন্ত ছিলনা। .... ফারুক আরো জানালো গোলাবারুদ না থাকা সত্ত্বেও তারা খালি ট্যাংক নিয়ে সকলকে, এমনকি রক্ষীবাহিনীকেও ফাঁকি দিতে পেরেছে।"

"১৫ই অগাস্টে যখন বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে হামলা করা হয় তখন ফারুক দুটো ট্যাংক নিয়ে শেরেবাংলা নগরে রক্ষীবাহিনী হেডকোয়ার্টার ঘিরে ফেলে এবং সেখানে উপস্থিত ব্যাটালিয়নকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে।"

শেখ মুজিবকে হত্যার জন্য ফারুক রহমান যেসব ট্যাঙ্ক নিয়ে রাস্তায় বের হয়েছিলেন সেগুলোতে যে কোনও গোলাবারুদ ছিলো না, সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের বইতেও এই তথ্য উঠে এসেছে। মাসকারেনহাস ঘাতক ফারুক রহমানের সাক্ষাৎকারও নিয়েছিলেন।

তার সাথে কথোপকথনের ভিত্তিতে মাসকারেনহাস লিখেছেন, " ফারুক আমাকে পরে জানিয়েছিলো, মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র হিসেবে ট্যাংকগুলো যে কতটা কার্যকরী তা খুব কম লোকই জানে। ট্যাংক দেখে জীবনের ভয়ে পালাবার চেষ্টা করবে না, এমন সাহসী লোক খুব কম পাওয়া যাবে।"

ফারুক যখন ট্যাংক নিয়ে রক্ষীবাহিনীর সদরদপ্তরের দিকে যাচ্ছিলো তখন তার মনেও সন্দেহ ও উদ্বেগ ছিলো। যেহেতু ট্যাংকে কোনও গোলাবারুদ ছিলো না সেজন্য ফারুক তার সহযোগীদের বলেছিল চোখে মুখে সাহসী ভাব ফুটিয়ে রাখতে।

অ্যান্থনি মাসকারেনহাসকে ফারুক রহমান বলেন, " আমরা যখন ওদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন রক্ষীবাহিনীর লোকেরা অবাক হয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে দেখছিল। আমরা তাদের দিকে তীক্ষ্ণ-ভাবে তাকিয়ে ছিলাম। সে ছিলো এক ভয়ঙ্কর অবস্থা। আমি ড্রাইভারকে বললাম, ওরা যদি কিছু করতে শুরু করে, দেরি না করে তাদের উপরেই ট্যাংক চালিয়ে দেবে।"

"তার আর দরকার হয়নি।...নিজেদের সামনে হঠাৎ ট্যাঙ্ক দেখে, ওরা গায়ের মশা পর্যন্ত নাড়াবার সাহস পেলনা।"

মাসকারেনহাসের সাথে সাক্ষাৎকারে ফারুক রহমান স্বীকার করেন, ওই অবস্থায় কেউ যদি তাকে সত্যিকারভাবে প্রতিরোধ করতে চাইতো, তাহলে তার কিছুই করার থাকতো না।

75
50
blogger sharing button blogger
buffer sharing button buffer
diaspora sharing button diaspora
digg sharing button digg
douban sharing button douban
email sharing button email
evernote sharing button evernote
flipboard sharing button flipboard
pocket sharing button getpocket
github sharing button github
gmail sharing button gmail
googlebookmarks sharing button googlebookmarks
hackernews sharing button hackernews
instapaper sharing button instapaper
line sharing button line
linkedin sharing button linkedin
livejournal sharing button livejournal
mailru sharing button mailru
medium sharing button medium
meneame sharing button meneame
messenger sharing button messenger
odnoklassniki sharing button odnoklassniki
pinterest sharing button pinterest
print sharing button print
qzone sharing button qzone
reddit sharing button reddit
refind sharing button refind
renren sharing button renren
skype sharing button skype
snapchat sharing button snapchat
surfingbird sharing button surfingbird
telegram sharing button telegram
tumblr sharing button tumblr
twitter sharing button twitter
vk sharing button vk
wechat sharing button wechat
weibo sharing button weibo
whatsapp sharing button whatsapp
wordpress sharing button wordpress
xing sharing button xing
yahoomail sharing button yahoomail