• শুক্রবার, জুন ১৮, ২০২১
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৮:৩৯ রাত

সুন্দরবনে হঠাৎ হরিণ শিকারের মহোৎসব

  • প্রকাশিত ০৭:০৩ রাত ফেব্রুয়ারি ২, ২০২১
সুন্দরবন
সুন্দরবন। সৈয়দ জাকির হোসেন/ঢাকা ট্রিবিউন

ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা, জনপ্রতিনিধি ও অসাধু বন কর্মকর্তারা শিকারি চক্রের কাছ থেকে হরিণের মাংসসহ আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করায় হরিণ শিকারিরা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে

সুন্দরবনে হঠাৎ হরিণ শিকার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। জানুয়ারি মাসের শেষ ১০ দিন ও চলতি ফেব্রুয়ারির প্রথম দিনে সুন্দরবন থেকে শিকার করা হরিণের ১টি মাথা, ১৯টি হরিণের চামড়া, ৭৮ কেজি মাংস জব্দ ও ১০ জন চোরা শিকারি আটক হয়। সুন্দরবন বিভাগ, কোস্ট গার্ড ও পুলিশ সদস্যরা এ সামগ্রীসহ শিকারীদের আটক করে। তাদের বিরুদ্ধে বন্যপ্রাণী নিধন আইনে মামলা হয়েছে।

জানা গেছে, সংঘবদ্ধ চোরা শিকারিরা সুন্দরবনের গহীনে কেওড়া গাছের স্থানে অবস্থান নিয়ে নৌকা, ট্রলার ও গাছে মাচা পেতে হরিণের গতিবিধি লক্ষ্য করে। হরিণ নদী ও খালের চরাঞ্চলে ঘাস খেতে আসে। শিকারিরা এসব স্থানে ফাঁদ পেতে হরিণ শিকার করে। কখনো তারা গুলি ছুড়েও শিকার করে। পরে গোপন আস্তানায় মাংস তৈরি করে সুন্দরবন সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করে। সুন্দরবন সংলগ্ন মোংলা, শরণখেলা, কয়রা, দাকোপ, পাইকগাছাসহ বনের আশপাশ এলাকায় সবচেয়ে বেশি হরিণের মাংস পাওয়া যায়। এভাবে হরিণ শিকার করে মাংস বিক্রি করতে গিয়ে অনেকে ধরাও পড়েন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে।

অভিযোগ রয়েছে, শিকারিদের ধরতে সুন্দরবনে স্মার্ট প্যাট্রল এবং বন বিভাগের টহল থাকলেও অদৃশ্য কারণে শিকার কমছে না। বনবিভাগের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ম্যানেজ করে আবার কখনো এদের চোখ ফাঁকি দিয়ে চুরি করে বনে ঢুকে শিকারিরা ফাঁদ পেতে হরিণ শিকার করে। পরে বিভিন্ন কৌশলে এ হরিণের মাংস খুলনা-বাগেরহাট এমনকি ঢাকায় নিয়ে চড়া দামে বিক্রি করা হয়। তবে বেশি দামে বিক্রি হয় চামড়া। আর এভাবে বিক্রি করতে গিয়ে মাঝে মধ্যে পথেঘাটে ধরা পরে দুই এক জন শিকারি। ধরা পড়া দুই একজন ব্যক্তিকে অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেয় কিছু অসাধু বন কর্মকর্তা ও পুলিশ।

অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা ও জনপ্রতিনিধি এ সব শিকারি চক্রের কাছ থেকে হরিণের মাংসসহ আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করায় দিন দিন সুন্দরবনে হরিণ শিকার বেড়ে যাচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবন ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে পেশাদার হরিণ শিকারিদের বিশেষ সিন্ডিকেট রয়েছে এবং তাদের সঙ্গে থাকে এজেন্ট ব্যবসায়ীরা। এসব এজেন্টের মাধ্যমে কখনো অগ্রিম অর্ডার আবার কখনো মাংস এনে তারপর বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করা হয়। 

দাকোপ উপজেলার বাণীশান্তা গ্রামের বাসিন্দা আবেদ খান জানান, “বনবিভাগের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের খুশি করতেও তদবির হিসেবে হরিণের মাংস সরবরাহ করে থাকে শিকারিরা। এসব কারণেই প্রধানত লোকালয়ের অনেক লোকই হরিণ শিকারকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন।”

তিনি অভিযোগ করেন, “শিকারিদেরকে বন বিভাগের লোকজন চেনেন, কিন্তু তাদেরকে কখনো গ্রেফতার করে না।”

বন বিভাগের মতে, বনে ডাকাতরা এখন তুলনামূলকভাবে কম সক্রিয়, কিন্তু হরিণ শিকারিদের চক্রগুলোর উৎপাত সুন্দরবন ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে আবার বেড়েছে। তবে হরিণ নিধন এবং শিকারের বিরুদ্ধে তাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে পাচারকারীদের আটক করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে কালো রঙের ব্যাগের ভেতর পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় হরিণের মাংস উদ্ধার করা হয়। পরে তাদের বিরুদ্ধে বন্যপ্রাণী নিধন আইনে মামলা দায়ের করা হয়। কিন্তু কোথাও এই শিকারি চক্রের মূল হোতাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি।

স্থানীয়রা জানান, কর্তৃপক্ষের কাছে চিহ্নিত হরিণ শিকারি এবং মাংস ব্যবসায়ীদের একটি তালিকা থাকার পরও প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে কোনোরকম ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না। উল্টো, বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের বেশ কিছু কর্মচারীর সঙ্গে এসব শিকারি চক্রের যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে। দাকোপ উপজেলার অনেক গ্রামে হরিণের মাংস নিয়মিত বিক্রি হচ্ছে এবং এই প্রবণতা বেড়েই চলছে। অনেকেই ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা কেজি দরে খুশি মনে হরিণের মাংস কিনছে বলে জানান স্থানীয়রা।

দাকোপ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সেকেন্দার আলী বলেন, “হরিণ শিকার ও পাচাররোধে আমরা সব সময় সতর্ক। বিভিন্ন সময় আমরা অভিযান চালিয়ে হরিণের মাংসসহ পাচারকারীদের গ্রেফতার করা হয়েছে।”

ওসি দাবি করেন, “আগের তুলনায় হরিণ শিকার অনেকটাই কমে এসেছে। এটি জিরো টলারেন্সে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। হরিণ শিকারের মূল হোতাদের গ্রেফতারের জন্য অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”

বাগেরহাটের পুলিশ সুপার (এসপি) পংকজ চন্দ্র রায় বলেন, “এর আগে একসঙ্গে এতগুলো হরিণের চামড়া কখনো উদ্ধার হয়নি। গত ২২ জানুয়ারির ওটাই হল হরিণের চামড়ার সবচেয়ে বড় চালান।”

তিনি বলেন, “চামড়াসহ পাচারকারীদের গ্রেফতারের পর আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে আদালতে তাদের মঞ্জুর হলে জিজ্ঞাসাবাদে নিয়ে হরিণ শিকারের ফাঁদ জব্দ করা হয়েছে। গ্রেপ্তার দুজন চিহ্নিত পাচারকারী। এই চক্রের সঙ্গে আরও কারা জড়িত আছে তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। সুন্দরবনের প্রাণী ও বনজ সম্পদ রক্ষায় পুলিশ তৎপর রয়েছে। বন রক্ষায় ও ওই চক্রের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকবে।”

সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক ও সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) খুলনার সভাপতি অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, “বন্যপ্রাণী শিকার নিষিদ্ধ হলেও আইন অমান্য করে হরিণ শিকার করছে একটি চক্র। এতে সুন্দরবনে দিন দিন কমে যাচ্ছে হরিণের সংখ্যা। সম্প্রতি সময়ে হরিণ শিকার বেড়ে যাওয়া আমাদের জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। যেখানে বনদস্যু আটক হয়ে সুন্দরবন দস্যুমুক্ত হচ্ছে। সেখানে ফাঁদ পেতে হরিণ শিকার বেড়ে যাচ্ছে। এর পেছনে বনবিভাগ ও আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর মধ্যে সমন্বয়হীনতা রয়েছে।”

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহার ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মাদক ব্যবসায়ীদের মোটরসাইকেল বা গাড়ি নিয়ে ধরতে পারে। কিন্তু বনের মধ্যে তা সম্ভব না। বিস্তীর্ণ বনের প্রত্যেকটি খালের আলাদা আলাদা বনরক্ষী দিতে পারলে হয়তো হরিণ শিকার কমে যেত। মানুষের নৈতিকতার অবক্ষয় হয়েছে। শিকারি ধরা পড়লে মামলা হচ্ছে ঠিকই কিন্তু দুই দিন পর আদালত থেকে তারা জামিন নিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে।”

উল্লেখ্য, গত ২২ জানুয়ারি দিবাগত রাত পৌনে দুইটার দিকে বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলা সদরের ব্র্যাক অফিসের সামনে থেকে সুন্দরবন থেকে শিকার করে আনা হরিণের ১৯টি চামড়াসহ দুই পাচারকারীকে গ্রেফতার করে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। 

গ্রেফতার হলেন, শরণখোলা উপজেলার রাজৈর গ্রামের মো. ইলিয়াস হাওলাদার (৩৫) এবং একই উপজেলার ভদ্রপাড়া গ্রামের মো. মনিরুল ইসলাম শেখ (৪৫)। গ্রেপ্তারের পরদিন বিকেলে তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠান পুলিশ। ২৫ জানুয়ারি দিবাগত রাত একটার দিকে খুলনার দাকোপ উপজেলার পানখালী এলাকায় অভিযান চালিয়ে স্থানীয় মাসুদের দোকানের সামনে রাস্তার ওপর সুন্দরবন থেকে শিকার করে আনা হরিণের ১১ কেজি মাংসসহ দুইজনকে গ্রেফতার করে থানা পুলিশ। এর আগে গত রবিবার উপজেলার কৈলাশগঞ্জ ইউনিয়নের রামনগর গ্রামের ধোপাদী গেটের পাশে গভীর রাতে অভিযান চালিয়ে ওই গ্রামের পাকা রাস্তার ওপর থেকে হাতেনাতে সাড়ে চার কেজি হরিণের মাংসসহ তিন পাচারকারীকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন, খুলনার খানজাহান আলী থানার আটরা পালপাড়া এলাকার খান মুজিবুল সুলতান (৩৩) ও একই থানার মসিয়ালী পশ্চিমপাড়া এলাকার মো. টিটু হোসেন(২৪) এবং চট্টগ্রামের জোয়ারগঞ্জ (পুরাতন মিরসরাই) থানার বরাইয়া গ্রামের রুহুল আমিন ভুইয়া, রাঙ্গামাটির নানিয়ারচর থানার ইসলামপুর গ্রামের আব্দুস সোবাহান (৬৫) ও দাকোপ উপজেলার কৈলাশগঞ্জ ইউনিয়নের রামনগর উত্তরপাড়া গ্রামের কুমারেশ রায় (৫৫)। ৩০ জানুয়ারী গভীর রাতে মোংলা উপজেলার দিগরাজ বাজার সংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি হরিণের মাথা ও ৪৭ কেজি মাংসসহ তিন চোরাকারবারিকে আটক করে কোস্ট গার্ড সদস্যরা। এ সময় তিনটি মোবাইল ফোন, একটি হরিণের মাথা, ভুড়িসহ ৪৭ কেজি মাংস জব্দ করে কোস্টগার্ড।

১ ফেব্রুয়ারি  দিবাগত রাত সাড়ে ১০টায় শরণখোলা উপজেলার সুন্দরবন সংলগ্ন রসুলপুর বেড়িবাঁধের উপর থেকে ২০ কেজি হরিণের মাংসসহ মিলন মোড়ল (৩৫) নামের এক পাচারকারীকে আটক করেছে বনরক্ষীরা। আটক মিলন যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার উত্তর দেওলী গ্রামের আব্দুর লতিফ মোড়লের ছেলে। সে পরিবার নিয়ে শরণখোলার রায়েন্দা বাজারে বাসা ভাড়া করে থাকেন।

আটক মিলন বন কর্মকর্তাদের জানায়, গত ৩০ জানুয়ারি ঢালীরগোপ এলাকার হাবিব তালুকদার ও তানজের বয়াতী বগী গ্রামের মৎস্য ব্যাবসায়ী চান্দুর ট্রলারে সুন্দরবনের কটকা এলাকায় যায়। সেখান থেকে তারা হরিণ শিকার করে জেলে নৌকায় তার কাছে বিক্রির জন্য পাঠায়। তারা আরও হরিণ শিকারের জন্য কটকায় অবস্থান করছে।

বন বিভাগের শরনখোলা স্টেশন কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান বলেন, “স্টেশনের ও দাসের ভাড়ানী টহল ফাঁড়ি এলাকায় বনরক্ষীদের দেখতে পেয়ে পাচারকারী মিলন পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে তাকে ধাওয়া করে আটক করা হয়। হাবিব তালুকদার ও তানজের বয়াতীর নামে বন বিভাগের একাধিক মামলা রয়েছে। আটক মিলনের বিরুদ্ধে বন আইনে মামলা দিয়ে ২ ফেব্রুয়ারি আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়।”

50
Facebook 50
blogger sharing button blogger
buffer sharing button buffer
diaspora sharing button diaspora
digg sharing button digg
douban sharing button douban
email sharing button email
evernote sharing button evernote
flipboard sharing button flipboard
pocket sharing button getpocket
github sharing button github
gmail sharing button gmail
googlebookmarks sharing button googlebookmarks
hackernews sharing button hackernews
instapaper sharing button instapaper
line sharing button line
linkedin sharing button linkedin
livejournal sharing button livejournal
mailru sharing button mailru
medium sharing button medium
meneame sharing button meneame
messenger sharing button messenger
odnoklassniki sharing button odnoklassniki
pinterest sharing button pinterest
print sharing button print
qzone sharing button qzone
reddit sharing button reddit
refind sharing button refind
renren sharing button renren
skype sharing button skype
snapchat sharing button snapchat
surfingbird sharing button surfingbird
telegram sharing button telegram
tumblr sharing button tumblr
twitter sharing button twitter
vk sharing button vk
wechat sharing button wechat
weibo sharing button weibo
whatsapp sharing button whatsapp
wordpress sharing button wordpress
xing sharing button xing
yahoomail sharing button yahoomail