• শনিবার, জুলাই ৩১, ২০২১
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৩:৫৫ বিকেল

দুইবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেন বৃদ্ধ ফরিদ

  • প্রকাশিত ১২:২২ দুপুর মে ২৪, ২০২১
ফরিদ আহমেদ শেখ
বৃদ্ধ ফরিদ আহমেদ শেখ। ঢাকা ট্রিবিউন

'বলতাছে, যে টাকা খরচ হইছে তা দিব সরকার। কিন্তু আমার মানসম্মান কি দিতে পারবো'

সরকারি সহায়তা চেয়ে ৩৩৩ হটলাইনে কল দেয়াই কাল হল বৃদ্ধ ফরিদ আহমেদ শেখের (৬৫)। লোক লজ্জার ভয়ে অনেকটা গোপনেই ফোন দিয়েছিলেন ত্রাণের জন্য। কিন্তু টের পাননি কী হতে চলেছে এর পরিণতি।

"আমি জীবনের ভাবি নাই এ বয়সে এ দিন দেখবো। দুই বার স্ট্রোকের পর চোখ ও মাথায় সমস্যা শুরু হয়। নিয়মিত ঔষধ সেবন করতে না পারায় চোখ দুটো প্রায় নষ্ট হওয়ার পথে। অল্প বেতনে একটি চাকরি করলেও চোখের জন্য কাজ করতে পারছি না। কিন্তু পেট তো এত কিছু মানে না। প্রতিমাসে ছেলের জন্য ৮ হাজার টাকা লাগে। সেই সাথে সংসার খরচতো আছেই। অর্থাভাবে মেয়ের পড়াশুনা বন্ধ।” 

“কী করবো ভাবতে পারছিলাম না। তাছাড়া হাতও তো পাততে পারি না মানুষের কাছে। কোনো উপায়ন্তর না পেয়ে রেডিও'র মাধ্যমে জানতে পেরে ৩৩৩ হটলাইনে ফোন দেই। কিন্তু সহযোগিতার বদলে দিতে হলো জরিমানা। তার সাথে মিলল লাঞ্ছনা, অপমান। এখন সমাজে মুখ দেখাবো কেমনে সেটাই ভাবতাছি। বলতাছে, যে টাকা খরচ হইছে তা দিব সরকার। কিন্তু আমার মানসম্মান কি দিতে পারবো?”

রোববার (২৩ মে) দুপুরে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন ফরিদ আহমেদ শেখ। এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেলে ৩৩৩ নম্বরে ফোন দিয়ে সরকারি সহযোগিতা চাওয়ায় তাকে শাস্তিস্বরূপ ১০০ জনকে খাদ্য সহায়তা প্রদানের নির্দেশ দেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফা জহুরা। এ কারণে তিনি আত্মহত্যা করতে যান বলে উল্লেখ করেছেন ফরিদ। 

প্রথমে সম্পদশালী ভেবে এ শাস্তি দেওয়া হলেও কিন্তু শনিবার ত্রাণ বিতরণকালে জানা যায় ফরিদ শেখ চারতলা ভবনের নয় তিনি এ ভবনের মাত্র দু’টি কামরার মালিক।

ফরিদ শেখ নারায়ণগঞ্জের সদর উপজেলা ফতুল্লা কাশিপুর ইউনিয়নের সুরুজ্জামান খানের ছেলে। স্ত্রী, দুই মেয়ে ও ষোল বছর বয়সী প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে কাশিপুর দেওভোগ এলাকার নাগবাড়ি ৮ নম্বর ওয়ার্ডে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া চারতলা ভবনের দুটি কক্ষে বসবাস করেন তিনি।

ফরিদ আহমেদ শেখ জানান, ১৬ থেকে ১৭ বছর আগে সৌদি আরব থেকে ফিরে পোশাকের নিজস্ব ব্যবসা গড়ে তুললেও সেই ব্যবসা আর নেই। বর্তমানে একটি হোসিয়ারিতে ১৫ হাজার টাকার বিনিময়ে কাটিং মাস্টার হিসেবে নিযুক্ত আছেন। এ বেতনে প্রতিবন্ধী ছেলের চিকিৎসা খরচ যোগাতে পারলেও পরিবারের খরচ যোগাতে হিমশিম খেতে হয় তার।

এদিকে করোনাভাইরাস মহামারিতে এ ভোগান্তি আরও বৃদ্ধি পায়। তাই স্থানীয় মেম্বারসহ বিভিন্নজনের সহযোগিতা নিয়েই চলছিলেন তিনি। সর্বশেষ রেডিও'র মাধ্যমে ৩৩৩ হটলাইনে ফোন দিয়ে সহযোগিতা চান উপজেলা প্রশাসনের কাছে। 

কী হয়েছিলো সেদিন

ঘটনার দিনে বর্ণনা দিতে গিয়ে ফরিদ জানান, মঙ্গলবার ফোন দিলে পরদিন নাম-ঠিকানা নিয়ে যায়। পরে কাশিপুর ইউনিয়ন মেম্বার আইয়ুব আলী সেদিন রাতে তার জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি নেন। পরদিন বৃহস্পতিবার বিকেলে ইউএনও বাসার সামনে এসে ডাক দিলে  তিনি নিচে গিয়ে দেখতে পান বেশ কয়েকটা গাড়ি দাঁড় করানো। 

তিনি আরও বলেন, “তখন ইউএনও আরিফা জহুরা জিজ্ঞেস করে, ‘এ বাড়ি কার?’ আমি বলি, ‘আমাদের।’ এরপর কাজকর্মের কথা জিজ্ঞেস করলে আমি বেকার বললে, পাশ থেকে ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী আমাকে থামায় দিয়া বলে, আমার ব্যবসা আছে কিন্তু মিথ্যা কথা বলছি। এ সময় আমি বিস্তারিত বলতে চাইলেও তারা আমার কোনো কথা না শুনেই সরকারিভাবে যে পরিমাণ খাদ্য বরাদ্দ রয়েছে সমপরিমাণ খাদ্য ১০০ জন গরীব দুঃস্থ পরিবারের মাঝে বিতরণের শাস্তি দিয়ে দেয়।”

“আমি উপায় না পেয়ে দুইবার আত্মহত্যা করার চেষ্টা করি। কী করবো? এত মানুষের খাবার কোথা থেকে যোগাড় করবো, যেখানে নিজের পরিবারের খরচ যোগাতে পারি না।”

স্বর্ণালঙ্কার বন্ধক রেখে মাসিক ৩ হাজার টাকা সুদে টাকা এনে ত্রাণ বিতরণ 

ফরিদ শেখের স্ত্রী হিরণ বেগম জানান, “এর কিছুই জানতাম না আমি। নিচে কে যেন ডাকলো। কিছুক্ষণ পর  উপরে এসে বলতাছে, আমি শেষ। দুইবার আত্মহত্যার চেষ্টাও করে। পরে উপায় না পেয়ে একজনের কাছে এক ভরি স্বর্ণ ৩ হাজার টাকা সুদের বিনিময়ে বন্ধক রেখে ৪৫ হাজারা টাকা এনে দেই। বাকি টাকা ধার দেনা করে যোগাড় করি। এখনও ১০ হাজার টাকা চালের দোকানে পাওনা। অথচ নিজেদের খাওয়ার চাল নাই ঘরে। ছেলেটাকে ডাক্তার কাছে নিতে পারছি না টাকার জন্য।”

কাঁদতে কাঁদতে হিরণ বেগম বলেন, “চারতলা বাড়ি হলে কী হবে কিন্তু অংশীদার তো সাতজন। ভাগে আমাদের দুই কামরার একটি ঘর। তারা শিক্ষিত মানুষ হয়ে কেমনে এটা পারলো। টাকা পয়সা কম থাকলেও আমাদের মান সম্মান তো আছে। লোক সমাজে এখন মুখ দেখাবো কেমনে।”

ঘটনার তদন্তে তিন সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন 

এদিকে এ  ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে জেলা প্রশাসন ঘটনা তদন্তে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোস্তাইন বিল্লাহ ঢাকা ট্রিবিউনকে জানান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (প্রশাসন) শামীম বেপারীকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ঘটনায় তদন্ত চলছে।

পাশাপাশি ইউএনও আরিফা জহুরাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ফরিদ যে পরিমাণ টাকা খরচ করেছেন তা রবিবারের মধ্যে ফেরত দিয়ে দেওয়ার জন্য।

তিনি আরও বলেন, “এ ধরনের ঘটনা কখনওই কাম্য না। ৩৩৩ হটলাইনটি মূলত গরীব-দুঃস্থ পরিবারগুলোকে সহযোগিতা করার জন্য খোলা হয়েছে। কিন্তু আমরা প্রায়ই বিভ্রান্তির শিকার হই। ফলে তদন্ত সাপেক্ষে ত্রাণ বিতরণ করা হয়। আর এ বিষয়টা অনেকটাই এমন ছিলো। কিন্তু তথ্য বিভ্রাটে এ ঘটনা ঘটেছে।”

এদিকে এ ব্যাপারে কথা বলতে ইউএনও আরিফা জহুরাকে একাধিক কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

এর আগে নারায়ণগঞ্জ ইউএনও আরিফা জহুরা জানান, “করোনা মহামারির শুরু থেকেই ৩৩৩ নম্বরের মাধ্যমে সরকারিভাবে আমরা দুঃস্থ-অসচ্ছল পরিবারগুলোকে সহায়তা করে আসছি। কিন্তু গত বুধবারের ঘটনাটা একটু অন্যরকম ছিলো। ফরিদ আহমেদ নামের ওই লোক ৩৩৩ নম্বরে বার্তা পাঠায় ত্রাণের সাহায্যে চেয়ে। নিয়ম অনুযায়ী আমরা যাচাই বাছাই শুরু করি। কিন্তু যাছাই বাছাইয়ে জানতে পারি ওই লোকের নাকি চারতলা একটি ভবন আছে। পরে আমি ঘটনাস্থলে নিজে গিয়ে তার এ কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি স্বীকার করেন। পরে তাকে শাস্তিস্বরূপ ১০০ জন গরীব দুঃস্থকে খাবার বিতরণের নির্দেশ দেওয়া হয়।”

 

50
Facebook 50
blogger sharing button blogger
buffer sharing button buffer
diaspora sharing button diaspora
digg sharing button digg
douban sharing button douban
email sharing button email
evernote sharing button evernote
flipboard sharing button flipboard
pocket sharing button getpocket
github sharing button github
gmail sharing button gmail
googlebookmarks sharing button googlebookmarks
hackernews sharing button hackernews
instapaper sharing button instapaper
line sharing button line
linkedin sharing button linkedin
livejournal sharing button livejournal
mailru sharing button mailru
medium sharing button medium
meneame sharing button meneame
messenger sharing button messenger
odnoklassniki sharing button odnoklassniki
pinterest sharing button pinterest
print sharing button print
qzone sharing button qzone
reddit sharing button reddit
refind sharing button refind
renren sharing button renren
skype sharing button skype
snapchat sharing button snapchat
surfingbird sharing button surfingbird
telegram sharing button telegram
tumblr sharing button tumblr
twitter sharing button twitter
vk sharing button vk
wechat sharing button wechat
weibo sharing button weibo
whatsapp sharing button whatsapp
wordpress sharing button wordpress
xing sharing button xing
yahoomail sharing button yahoomail