• বুধবার, ডিসেম্বর ০১, ২০২১
  • সর্বশেষ আপডেট : ০২:২৭ দুপুর

চিঠি লিখে সিলেটের মেয়ে নুবায়শার বিশ্বজয়

  • প্রকাশিত ০৯:০৬ রাত সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২১
সিলেট

নুবায়শার সাফল্যে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার সবাইকে চিঠিটি পড়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন

বিশ্ব চিঠি লেখা প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে সিলেটের মেয়ে নুবায়শা ইসলাম। বিশ্ব ডাক সংস্থার (ইউপিইউ) ৫০তম চিঠি লেখা প্রতিযোগিতায় লক্ষাধিক কিশোর-কিশোরীকে পরাজিত করে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট ছিনিয়ে নেয় সে।

রবিবার (১২ সেপ্টেম্বর) নুবায়শা ইসলামের বাবা মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

তিনি বলেন, “গত ২৭ আগস্ট সুইজারল্যান্ডে সংস্থার কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে প্রতিযোগিতার ফল ঘোষণা করা হয়। ফল প্রকাশের পর বিশ্ব ডাক সংস্থা নুবায়শাকে নিয়ে একটি ভিডিও ডকুমেন্টরি তৈরি করে প্রতিষ্ঠানের ইউটিউবে এবং ওয়েবসাইটে আপ করেছে।”

বাংলাদেশ ব্যাংক সিলেটের যুগ্ম পরিচালক মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, “নুবায়শা সিলেটের আনন্দ নিকেতনের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। সে তার অনাগত বোনকে উদ্দেশ করে ৮০০ শব্দের আবেগঘন একটি চিঠি লিখে। চিঠিতে সে করোনাকালে মৃত্যুভয়, স্বজন হারানোর ভয়ের কথা উল্লেখ করে। সে একটি ভালো সময়ের জন্যে প্রত্যাশা করে ওই চিঠিতে।”

তার সাফল্যে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার সবাইকে চিঠিটি পড়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে নিজের ফেসবুক আইডিতে লিখেছেন, “নুবায়শাকে অভিনন্দন। পাশাপাশি আমরা তার মা-বাবা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও অভিনন্দন জানাই। জয় বাংলা। ভালো থাকো আমাদের স্বর্ণ কিশোরী।”

নুবায়শার পরিবার সিলেটের পূর্ব শাহী ঈদগাহ এলাকায় বসবাস করে। তাদের গ্রামের বাড়ি হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার ধর্মঘর ইউপির আমবাড়িয়া গ্রামে।


নুবায়াশার লেখা চিঠি:

 

প্রিয় অমল,

যখন মা-বাবা আমাকে বলেছিল যে, আমি একটি ছোট বোন পেতে যাচ্ছি, তখন আমি মোটেই ঈর্ষান্বিত হইনি। এমনকি যখন তারা তোমার জন্য একটি বাচ্চাদের বিছানা কিনেছিল, যেখানে আমার জীবনের প্রথম দুই বছর কেটেছে মেঝেতেই একটি সাদামাটা তোষকের ওপর। কিন্তু আমি ঠিক তখনই আমি তোমাকে ঈর্ষা করতে শুরু করলাম, যখন আমি বুঝতে পারলাম যে; তুমি পৃথিবীর ভয়ঙ্কর ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশের তুলনায় মাতৃগর্ভে নিরাপদে আছো, যেমনটা নিরাপদ আমি নেই। আমার এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে যে, তুমি বড় হয়ে এসব পড়বে এবং তোমার বোনের মতো বুদ্ধিমতী হবে। আমি আশা করি তুমি একটি সুখী জীবনযাপন করছো, যেটা আমি করিনি।

 

তুমি কখনই জানো না যে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি থেকেও ভয়ংকর ঝড়ের সৃষ্টি হয়।

 

দুই সপ্তাহেই আমার মধ্যে-বসন্তকালীন বিরতি নিজ বাড়িতে কারাবাস হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে 

আকস্মিকতা জীবনে কীভাবে একটি মোড় এনে দিল।

 

তুমি নিশ্চয়ই জানো যে, আমি কি নিয়ে কথা বলছি। আমার মতো আরও লক্ষ লক্ষ মানুষের সংগ্রামের গল্প নিয়ে অবশ্যই বই থাকবে। কিন্তু এটা আমার গল্প; বোন থেকে বোন, যেটা কখনও অন্য কারও জানা হবে না।

পেছন ফিরে তাকালে বুঝতে পারি আমি কতটা নির্বোধ ছিলাম। মহামারী, কোয়ারেন্টিন, সার্স  এমন কিছু বিষয় যা আমি আগে কখনও শুনিনি। যতই সবকিছু জেনেছি, ততই আমার হৃদয় সঙ্কুচিত হয়েছে। প্রযুক্তির প্রতি আমার বিশ্বাসের কারণে আমি এমন অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম যে, সম্ভাব্য প্রাদুর্ভাবের চিন্তা আমার কখনোই আসেনি। ১৯৩ টি দেশ, ৭.৯ বিলিয়ন মানুষ বনাম একটি ভাইরাস।

 

তুমি কল্পনা করতে পারো? এটা কি মাতৃ প্রকৃতির রাগ? সে কি প্রতিহিংসাপরায়ণ? আমরা কি তার পৃথিবী নষ্ট করার জন্য শাস্তি পাচ্ছি?  এর ফলেই কি আমরা আমাদের নিজেদের বাড়িতে বন্দি আছি?  হতে পারে এটি আমাদের সতর্ক করছে, আমাদের ভুলগুলো চেতনায় এনে দিচ্ছে। যেভাবে মা আমাদের ভুল ধরিয়ে দেন। হয়তো এই কারণেই প্রকৃতি মানবজাতির জন্য একজন মা।

 

ভাইরাসটি মারাত্মক এবং তাই আশা হারাচ্ছি। ইতোমধ্যে বিপর্যস্ত পৃথিবীতে স্তব্ধ হয়ে গেলাম কি করতে হবে তা জানতাম না। প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক মৃত্যুর খবর শুনতে হচ্ছিল। রং তুলি আমার আগ্রহে আসেনি। প্রথমবারের মতো আমি আমার একটি ছবি আঁকা অসমাপ্ত রাখলাম।”

 

মা যখন হতাশায় ডুবেছিলেন তখন আমি কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। আমি সেখানে নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম যখন সে ঘুম এবং ক্ষুধা নিয়ে লড়াই করছিল। আমি কিছু করিনি কেন? আমি তার মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলকে পারতাম "মা চিন্তা করো না সব ঠিক হয়ে যাবে।" সত্যি কথা বলতে, আমি জানতাম না যে সবকিছু ঠিক হবে কিনা। আমি আমাদের মাকে সাহায্য করতে পারিনি। এটা আমাকে কোন ধরনের মেয়ে হিসেবে সাব্যস্ত করে?

 

মাঝে মাঝে আমি কামনা করতাম এই সব দুঃস্বপ্ন। অ্যালার্ম বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে আমি হতবাক হয়ে গেলাম এবং মা আমাকে বলছে যে স্কুলে যেতে দেরি হয়ে যাবে। একবার আমার তৃতীয় শ্রেণির ইংরেজি শিক্ষক জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে আমি সবচেয়ে বেশি ভয় পাই। আমার মনে আছে, আমি বলেছিলাম বজ্রঝড় এবং মাকড়সা। কিন্তু এখন আমি বলব, এটি মৃত্যু এবং কাউকে হারানোর ভয়।

ঠিক যখন আমরা এই ভয়ংকর পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিচ্ছিলাম, তখনই অকল্পনীয় ঘটনা ঘটেছিল - ফুফু মারা গেলেন। তুমি হয়তো তাকে চেনো না অমল। কিন্তু তিনি ছিলেন চমৎকার একজন মানুষ, আমাদেরে একমাত্র ফুফু, দাদা-দাদীর একমাত্র মেয়ে।

 

সকালে একটু অসুস্থ, সন্ধ্যায় বেঁচে থাকার জন্য শ্বাস নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা এবং রাতে চলে যাওয়া কোভিডের আচরণটাই এরকম। ফুফুকে আমাদের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছিল। যখন আমি সেখানে যাই, তখন আমার হৃদয়ে ব্যথা অনুভব করি। আমি তার সাথে কাটানো সময়গুলোকে মনে করি। প্রতিবছর ঈদে আমার দেওয়া শাড়ি পরার পর তার মুখে যে হাসি ফুটতো সেটি আর দেখতে পাবো না।

 

তার দাফনের সময় আমি গাছের আড়ালে লুকিয়েছিলাম, কারণ; তার প্রাণহীন মুখ দেখে সহ্য করতে পারছিলাম না। অমল, সে তোমাকে নিয়ে খুব আগ্রহী ছিল; বাচ্চাদের জন্য নরম একটি নকশিকাঁথা আমি তার ঘরে পেয়েছি। এটির চারপাশে পুষ্পশোভিত নকশায় কালো সূচিকর্ম করা হয়েছিল। ভাগ্য তাকে বাকী কাজ করতে দেয়নি। কিন্তু আমি করতে চাই  জানুয়ারির ঠান্ডায় তুমি আসার সাথে সাথেই তোমাকে উষ্ণ রাখতে।

 

কারণ পৃথিবী এমন একটি চাকা যা কখনও ঘোরা বন্ধ করে না। অন্যরা যা রেখেছে তা তোমাকে বহন করতে হবে। তোমাকে দুর্ভাগ্যজনক সময়ের বিশ্বাস এবং ধৈর্যের সাথে লড়াই করতে হবে।

 

গাছের পেছনে সূর্য অস্ত যাচ্ছে, বছরের শেষ দিন নতুন বছরের নতুন ভোরের আগমনকে চিহ্নিত করে। আমি হয়তো ফুফুকে হারিয়েছি, তবুও আমি শীঘ্রই তোমার দেখা পাওয়ার আশা করছি। নামের অর্থ "আশা" অমল। এবং এটিই তোমার জন্য অনন্য। তুমি ভাল সময়ের জন্য আমার প্রত্যাশাকে বাড়িয়ে তুলেছেন।

 

এই গল্প এখানেই শেষ নয়। তুমি জানো না যে, পরবর্তী পরবর্তী কি আসছে। কিন্তু কখনোই নিরাশ হয়ো না অমল।

 

তোমার বোন,

নুবায়শা

 

51
Facebook 50
blogger sharing button blogger
buffer sharing button buffer
diaspora sharing button diaspora
digg sharing button digg
douban sharing button douban
email sharing button email
evernote sharing button evernote
flipboard sharing button flipboard
pocket sharing button getpocket
github sharing button github
gmail sharing button gmail
googlebookmarks sharing button googlebookmarks
hackernews sharing button hackernews
instapaper sharing button instapaper
line sharing button line
linkedin sharing button linkedin
livejournal sharing button livejournal
mailru sharing button mailru
medium sharing button medium
meneame sharing button meneame
messenger sharing button messenger
odnoklassniki sharing button odnoklassniki
pinterest sharing button pinterest
print sharing button print
qzone sharing button qzone
reddit sharing button reddit
refind sharing button refind
renren sharing button renren
skype sharing button skype
snapchat sharing button snapchat
surfingbird sharing button surfingbird
telegram sharing button telegram
tumblr sharing button tumblr
twitter sharing button twitter
vk sharing button vk
wechat sharing button wechat
weibo sharing button weibo
whatsapp sharing button whatsapp
wordpress sharing button wordpress
xing sharing button xing
yahoomail sharing button yahoomail