‘চীন বিশ্বের জন্য আরও কল্যাণ বয়ে আনবে’

বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং চীনের কাছে তাইওয়ানের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং এই অঞ্চলে উত্তেজনা সৃষ্টি করে আগ্রাসন বাড়াচ্ছে বলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি হুঁশিয়ারি জানিয়ে সতর্ক করেছেন

বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং এর সঙ্গে কথা বলেছেন ঢাকা ট্রিবিউনের প্রবীর কুমার সরকার। পাঁচ পর্বের তাদের এই বিশেষ আলাপচারিতার আজ পড়ুন পঞ্চম পর্ব-

আজকের পর্বে রাষ্ট্রদূত লি জিমিং চীনের কাছে তাইওয়ানের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং এই অঞ্চলে উত্তেজনা সৃষ্টি করে আগ্রাসন বাড়াচ্ছে বলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি হুঁশিয়ারি জানিয়ে সতর্ক করেছেন, যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ান ইস্যুতে নিজেদের লাগাম না টানে তবে চীনের পক্ষ থেকে কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখানো হবে।

ঢাকা ট্রিবিউন: অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বাণিজ্য সহজীকরণ, দুর্যোগ প্রতিরোধ ও প্রশমন, সংস্কৃতি ও পর্যটন এবং সামুদ্রিক বিষয়ে সহযোগিতাকে আরও জোরদার করার পাশাপাশি বাংলাদেশ চীনের সার্বভৌমত্ব এবং "এক চীন নীতির" প্রতি সমর্থনের কথা পুনরাবৃত্তি করেছে, অন্যান্য দেশগুলো কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে বলে মনে করেন?

লি জিমিং: “এক চীন নীতি” চীনের মূলনীতির ভিত্তি অনুসরণ করে, যা অন্যান্য দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। সম্প্রতি চীনের তাইওয়ান অঞ্চলে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির উসকানিমূলক সফরের পর “এক চীন নীতির” প্রতি প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করার জন্য আমরা অন্যান্য ১৭০ টিরও বেশি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের প্রশংসা করি।

নিবিড় এবং ব্যবহারিক সহায়তা আমাদের যৌথ সহযোগিতার কৌশলগত অংশীদারিত্বের প্রতিফলন। স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ ও চীন উভয়েই বাইরের হস্তক্ষেপ ছাড়াই বহিঃসম্পর্ক উন্নয়নের স্বাধীনতা ভোগ করে। হস্তক্ষেপ না করার নীতি সমসাময়িক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো রাষ্ট্রই অন্যকে শাসন করার অধিকার রাখে না।

ঢাকা ট্রিবিউন:  ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বিশ্ব কি আরও খারাপ ভবিষ্যতের মুখোমুখি হতে চলেছে?

লি জিমিং: বিশ্ব এখনও করোনাভাইরাস মহামারির প্রভাব মোকাবিলা করছে এবং একইসঙ্গে কিছু দেশের দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ডের কারণে সশস্ত্র সংঘাতে ভুগছে।

নিষেধাজ্ঞা আরোপ উন্নয়নশীল দেশগুলোর অনেক ক্ষতি করে। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে।

ছোট বৃত্তের কূটনীতি চর্চা করে এবং যুদ্ধের মানসিকতা ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে কিছু পশ্চিমা দেশ বিশ্বজুড়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ধ্বংস করছে।

তারা যদি পথ পরিবর্তন না করে, তাহলে পৃথিবীর ভবিষ্যত ধ্বংস হয়ে যাবে।

একটি দায়িত্বশীল দেশ হিসেবে চীন বিশ্বকে সর্বোচ্চ নিশ্চিয়তা এবং স্থিতিশীলতা প্রদানের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করে। চীনের উত্থান গত কয়েক দশকে বিশ্বকে উপকৃত করেছে এবং আগামী দিনে আরও কল্যাণ বয়ে আনবে। আমরা সকল পক্ষকে সত্যিকারের বহু-পাক্ষিকতাবাদের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকার এবং অভিন্ন বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানাই।

ঢাকা ট্রিবিউন: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বলেছে যে, তারা সঙ্কট চায় না এবং তাইওয়ান প্রণালীতে বর্তমান উত্তেজনা বৃদ্ধির জন্য চীনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নেওয়া উচিত। তারা চীনের সামরিক মহড়াকে কঠোর প্রতিক্রিয়া হিসেবে অভিযুক্ত করেছে এবং যদি চীন এটা অব্যাহত রাখে তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য হবে। এ সম্পর্কে আপনার মতামত কী?

লি জিমিং: তাইওয়ান ১,৮০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চীনের ভূখণ্ডের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯৪৩ সালে চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনের নেতারা কায়রো ঘোষণাপত্র জারি করে, যেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে জাপান চীনের যে সমস্ত অঞ্চল চুরি করেছে (যেমন তাইওয়ান) তা চীনকে ফিরিয়ে দিতে হবে। ১৯৪৫ সালের পটসডাম ঘোষণা নিশ্চিত করেছে যে কায়রো ঘোষণার শর্তাবলী কার্যকর হবে। ১৯৭১ সালে পাস করা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের রেজুলেশন-২৭৫৮ স্বীকৃতি দেয় যে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন সরকারের প্রতিনিধিরাই জাতিসংঘে চীনের একমাত্র বৈধ প্রতিনিধি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের যৌথ আলোচনায় স্বীকৃত যে, গণপ্রজাতন্ত্রী চীন সরকার’ই চীনের একমাত্র আইনী সরকার।

তবে যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে বর্তমান সংকটকে উসকে দিয়েছে। চীনের অনেক প্রতিনিধিত্ব সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার এবং মার্কিন সরকারের তৃতীয় শীর্ষ কর্মকর্তা ন্যান্সি পেলোসিকে তাইওয়ান সফরের অনুমতি দিয়েছে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাইওয়ানের মধ্যে সম্পর্কের উন্নতির একটি বড় ঘটনা এবং এটি  "তাইওয়ানের স্বাধীনতা" চাওয়া বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিকে একটি খুব ভুল সংকেত পাঠায়। এর মোকাবিলার জন্য চীনের সামনে লড়াই করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। বর্তমান উত্তেজনার দায় এবং পরিণতি সবই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং "তাইওয়ানের স্বাধীনতা" চাওয়া বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তির ওপর বর্তায়।

চীন "অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়াশীল" কিনা তা মূল্যায়ন করার সময় চীন কী প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে এবং চীনকে দৃঢ় অবস্থানের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে কিনা তা মূল্যায়ন করা ভালো হবে।

কে চীনকে আটকাতে তাইওয়ানকে ব্যবহার করে চলেছে? এক-চীন নীতিকে বিকৃত, অস্পষ্টভাবে তুলে ধরছে কে? কে তার নিজের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে তাইওয়ানের সঙ্গে সরকারি মিথস্ক্রিয়া বাড়াচ্ছে এবং "তাইওয়ানের স্বাধীনতা" চাওয়া বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কাছে প্রাণঘাতী অস্ত্র বিক্রি করে? সবগুলো প্রওশ্নে উত্তর একই, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।


এই সাক্ষাৎকারের প্রথম চারটি পর্ব পড়ুন:


তাইওয়ান চীনের ভূখণ্ডের অংশ, এটি আমাদের সীমানা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমাগত উসকানির মুখে আমরা বসে থাকব না। বৈধ এবং প্রয়োজনীয় প্রতিক্রিয়া আমাদের জানাতে হবে। চীনা সশস্ত্র বাহিনী চীনের সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষার জন্য তাইওয়ান দ্বীপের জলসীমায় সামরিক মহড়া চালায়। আমাদের ব্যবস্থা উন্মুক্ত এবং আনুপাতিক। আমাদের সশস্ত্র বাহিনী দেশীয় আইন এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুশীলনের ক্ষেত্রেই সঙ্গতিপূর্ণ। তাদের সম্পর্কে নিন্দা নেই।

আমাদের বাংলাদেশি বন্ধুরা যেমন স্পষ্ট করে বলেছে, বাংলাদেশসহ বিশ্ব মহামারি, সংঘাত ও নিষেধাজ্ঞার কারণে যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্ব আরেকটি সংঘর্ষ দেখতে চায় না।

এখন বল যুক্তরাষ্ট্রের দিকে। যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা কমাতে চায়, তবে তারা এক-চীন নীতি এবং তিনটি চীন-মার্কিন যৌথ ইমিউনিকের ভিত্তি অনুসরণ করবে এবং তাদের নেতার "পাঁচ দফা" প্রতিশ্রুতির কঠোরভাবে মেনে চলবে।

যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই ভুলের মধ্যে থেকে এবং পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করার চেষ্টা করে তাহলে চীনের পক্ষ কঠোর প্রতিক্রিয়ার দেখানো হবে।

ADVERTISEMENT

×