Wednesday, May 29, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বাজেয়াপ্ত হওয়া বঙ্গবন্ধুর চিঠিগুলো

সম্প্রতি জাতির পিতার দুষ্প্রাপ্য চিঠিপত্রগুলো প্রকাশিত হতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে প্রায় শতাধিক পত্র গ্রন্থাকারে প্রকাশ পেয়েছে

আপডেট : ১৭ মার্চ ২০২০, ০১:১৮ এএম

ছাত্রজীবন থেকে পরিণত বয়স পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডায়েরি বা দিনলিপি লিখতেন। ১৯৪৯ থেকে ১৯৬৭ সময়কালে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ ও পরিবারের লোকজনকে কারাগার থেকে চিঠি লিখেছেন।

কিন্তু তার সেই স্মৃতিচারণ, আত্মজীবনী, চিঠি ও গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী লুট করে নিয়ে যায়।

১৯৭২ সালে নিউইয়র্ক টেলিভিশনে সম্প্রচারিত হয় সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টকে দেওয়া বঙ্গবন্ধুর এক সাক্ষাৎকার। রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে বসে দেওয়া সেই সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, “ওরা আমার জীবনের ইতিহাসকে লুণ্ঠন করেছে। আমার ৩৫ রাজনৈতিক জীবনের দিনলিপি ছিল। বর্বররা লাইব্রেরির প্রত্যেকটা বই ও মূল্যবান দলিলপত্র নিয়ে গেছে।” (আহমেদ সালিম, পাকিস্তানের কারাগারে শেখ মুজিবের বন্দি জীবন, ঢাকা-১৯৯৮)

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে দেওয়া একাধিক ভাষণে তিনি উল্লেখ করেছেন, “আমার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা আমি আমার দেশকে ভালোবাসি, দেশের মানুষকে ভালোবাসি।”

সম্প্রতি জাতির পিতার দুষ্প্রাপ্য চিঠিপত্রগুলো প্রকাশিত হতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে প্রায় শতাধিক পত্র গ্রন্থাকারে প্রকাশ পেয়েছে। গত ২৫ বছরে পত্রপত্রিকা ও বঙ্গবন্ধুর জীবনী লেখকরা অল্পসংখ্যক পারিবারিক চিঠি পত্র-পত্রিকা ও বইয়ের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন।

২০২০ সালে মুজিববর্ষ উপলক্ষে প্রকাশিত হয়েছে সত্যজিৎ রায় মজুমদারের ‘‘বঙ্গবন্ধুর চিঠিপত্র’’।  সেখানে রয়েছে দরখাস্তসহ ৮৭টি চিঠির পুরো এবং একটির অংশ। দরখাস্তগুলো ইংরেজিতে। আলোচনার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে ব্যক্তিগত ও বাংলা চিঠিগুলো।

বঙ্গবন্ধুর অনেকগুলি চিঠি পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক আমলে কারান্তরালে বসে লেখা এবং সেসব চিঠির অধিকাংশই প্রাপকের হাতে পৌঁছেনি, কারণ সেগুলি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। বাজেয়াপ্ত হওয়া পত্রগুলো দুই ধরনের। ১. বঙ্গবন্ধুর লেখা চিঠি ২. রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, পরিজন ও শুভানুধ্যায়ীদের লেখা। যেগুলো তারা বঙ্গবন্ধুকে লিখলেও তার হাতে পৌঁছেনি। সেগুলো গোপন ও সরকারের জন্য বিপজ্জনকবার্তা ভেবে বাজেয়াপ্ত করা হয়।

ইতালি প্রবাসী মেয়ে শেখ হাসিনাকে লেখা বঙ্গবন্ধুর চিঠি। ছবি: সৈয়দ জাকির হোসেন/ঢাকা ট্রিবিউন
দীর্ঘ অনুসন্ধান করে বঙ্গবন্ধুর নিষিদ্ধ হওয়া বেশকিছু চিঠিপত্রের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ অনেক পত্র নিয়ে ২০১০ সালে প্রকাশিত হয় ড. সুনীল কান্ত দে'র ‘‘বঙ্গবন্ধুর অপ্রকাশিত চিঠিপত্র’’।

সুনীল কান্ত জানান, বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান- জীবন ও রাজনীতি (২০০৮)গ্রন্থ প্রণয়নের গবেষণাকাজে যুক্ত থাকাকালে স্পেশাল ব্রাঞ্চের নথিতে থাকা তথ্য উপাত্ত নিয়ে গবেষণা করার সময় বঙ্গবন্ধুর বেশকিছু চিঠিপত্রের সন্ধান পান তিনি। সেই সময় পরিকল্পনা করেন এবং দুইবছর পর বইটি প্রকাশিত হয় অঙ্কুর প্রকাশনী থেকে।  

বইটির ভূমিকায় লেখক উল্লেখ করেছেন, একদিকে এসব চিঠিপত্রে পাকিস্তানি উপনিবেশিক সমাজ, রাজনীতি, শাসনব্যবস্থার চিত্র ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের দিক-নির্দেশনা রয়েছে, তেমনি রয়েছে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে নানা বক্তব্য তথা ব্যক্তি মুজিবের একান্ত পরিচয়।

৯৫টি বাজেয়াপ্ত চিঠি সংকলিত হয়েছে এই গ্রন্থে, এরমধ্যে ৭৭টি তার লেখা এবং ১৮টি বঙ্গবন্ধুকে লেখা বিভিন্ন ব্যক্তির লেখা।

সেখানে রয়েছে বঙ্গবন্ধুর হস্তাক্ষরে লেখা বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় পত্র এবং পত্রের টাইপ কপি ও অনুলিপি।

দুর্দশাগ্রস্ত ও কারাভোগকারী নেতা-কর্মীদের পরিবারের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু চিঠির মাধ্যমে সু-সম্পর্ক বজায় রাখতেন। কারাভোগকারী কর্মীর মাতা-পিতাকে সান্ত্বনা দিতেন চিঠির মাধ্যমে। এমন নানাবিধ পত্র বঙ্গবন্ধুর জেলজীবনে লেখা। আর সেসব চিঠির বড় অংশই বাজেয়াপ্ত করা হযেছে। 

গ্রন্থটিতে সংকলিত এপরযন্ত সংগৃহীত প্রথম চিঠিটি ঢাকা আর এম এস থেকে গোয়েন্দা পুলিশ ১০ আগস্ট ১৯৪৯ তারিখে পোস্ট অফিস থেকে আটক করে।

হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দীকে করাচির ঠিকানায় ইংরেজি ভাষায় লেখা এই চিঠিতে লেখা ছিল, “I am very anxious to see you and also I have some urgent talk with you about Awami League and parliamentary affairs. Please write to me, giving all directions.”

বঙ্গবন্ধু যখন কারাগারের বাইরে ছিলেন সেই সময় তার লিখিত চিঠিপত্র গোয়েন্দা পুলিশ বিভিন্ন পোস্ট অফিস থেকে আটক করে, কখনো অনুলিপি রেখে গ্রাহকদের কাছে ছাড়তো, আবার কখনো মূলচিঠি নিষিদ্ধ হিসেবে বাজেয়াপ্ত করা হতো।     

কারাগার থেকে যাদেরকে শেখ মুজিবুর রহমান চিঠিপত্র লিখেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী ও দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। সংগৃহীত চিঠির ৭টি সোহ্‌রাওয়ার্দী ও ৫টি তোফাজ্জল হোসেনের কাছে লেখা। যার প্রত্যেকটায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের দিকনির্দেশনা ও শাসনব্যবস্থার চিত্র নিয়ে কথা ছিল।

১৯৪৯ সালের ২১ আগস্ট শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দীকে লেখা আরেকটি চিঠিতে শেখ মুজিব লেখেন, “Manik Bhai is indisposed. Yet we have requested him to take up charge of the central office of the Awami Muslim League.”

৭৭টি চিঠির মধ্যে রাজনৈতিক বন্ধু-শুভাকাঙ্খী, কয়েকজন ছাত্রনেতা ও তার বিভিন্ন মামলা পরিচালনাকারী অ্যাডভোকেট আব্দুস সালামের কাছে লেখা তার মোট ৩৭টি চিঠিপত্র এবং শেখ মুজিবের কাছে লেখা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, এক পূর্ব পাকিস্তানি ছাত্রসহ বিভিন্ন রাজনীতিবিদদের নিষিদ্ধ করেছিল পাকিস্তান গোয়েন্দা পুলিশ।

বঙ্গবন্ধু কারাগারে থাকাকালে ১৯৬২ সালের ৩১ মার্চ তারিখে বাবা শেখ লুতফর রহমান টুঙ্গিপাড়া ফরিদপুর থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ঠিকানায় চিঠি পাঠান।

নিরাপত্তাবন্দি বঙ্গবন্ধু ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে স্ত্রী ফজিলাতুন্নেসা ও সন্তানদের সঙ্গে সাক্ষাতের আবেদন জানিয়ে ১৯৬২ ৪ এপ্রিল তৎকালীন ডি আই জি, আই বি পূর্ব পাকিস্তান, ঢাকার কাছে চিঠি পাঠান।

এছাড়া, শেখ মুজিবুর রহমান যাদের চিঠি লিখেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন- শামসুল হক, তাজউদ্দীন আহমেদ, এম এ আজিজ, জহুর আহমেদ চৌধুরী, দবির উদ্দিন আহমেদ, ছাত্রনেতা খালেদ আহমেদের মা প্রমুখ ব্যক্তি।

About

Popular Links