Wednesday, May 22, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

লকডাউনে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন তৃতীয়লিঙ্গের মানুষ

সেই সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর থেকেই এই সম্প্রদায়ের বেশিরভাগ মানুষকে প্রায় খালিপেটেই রাত কাটাতে হচ্ছে

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২০, ০১:৫০ পিএম

মুন শিকদার প্রতিদিন সকালে একটি রুটি তৈরি করেন। সেই একটি রুটিকেই দু’ভাগ করে একভাগ সকালে ও অন্যভাগ দিয়ে দুপুরের আহার সারেন। এই একটি রুটিই যে আর কয়দিন খেতে পারবেন সেটি নিয়েও আজ চিন্তার শেষ নেই তার।

মুন বছর পঁচিশের একজন তৃতীয়লিঙ্গের মানুষ। তিনি পেশায় একজন যৌনকর্মী। তাই মাসের পর মাস ঘরে বসে থাকার বিলাসিতা তার কল্পনারও অতীত। তিনি এমন এক প্রান্তিকশ্রেণীর মানুষ যাদের আশংকা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে তাদের মৃত্যু না হলেও ক্ষুধার জ্বালায় মৃত্যু অনিবার্য।

ঢাকা ট্রিবিউনকে মুন বলেন, “আমি সামান্য কিছু টাকা নিয়ে বাড়িতে আটকে আছি। আমি যদি বাইরে যাইও লকডাউনে কোনও খদ্দের পাবো না। আর আমাদের জন্য খদ্দের নেই মানে টাকাও নেই।”   

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো মুনের পরিবারের চারজন সম্পূর্ণভাবে তার ওপর নির্ভরশীল। তার একার আয় দিয়েই চলে এই পুরো পরিবারের খাওয়া-পরা-জীবনধারণ।

তিনি বলেন, “সামাজিক বাধার কারণে আমি আমার পরিবারের সাথে থাকতে পারি না। তবে আমি আমার প্রতিদেনের আয় থেকে তাদেরকে টাকা পাঠাই। এই লকডাউন পরিস্থিতিতে আমি তাদেরকে কিছুই পাঠাতে পারছি না।”

মুন এই প্রতিনিধিকে জানান, তিনি তাদের এক নেতার কাছ থেকে একসপ্তাহ চলার মত কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস পেয়েছেন। এখন পর্যন্ত সেটুকু দিয়েই চলছেন।

সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের হিসেবমতে, বাংলাদেশে তৃতীয়লিঙ্গের মানুষের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার।

যদিও এই সম্প্রদায়ের নেতা জয়া শিকদারের দাবি, সারাদেশে এক লাখেরও বেশি তৃতীয়লিঙ্গের মানুষ রয়েছেন যার বেশিরভাগই ঢাকায় থাকেন।

জয়া প্রশ্ন ছোঁড়েন, “কীভাবে আসল তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করা হয়, যেখানে কেউ ঠিকমত জানেই না ‘হিজড়া’র আসল ব্যাখ্যা কী? হিজড়া হওয়া আমাদের জন্য কেবলই একটি দৈহিক বিষয় নয়। তৃতীয়লিঙ্গের কেউ এমন একজন মানুষও হতে পারেন যিনি তার জন্মদ্বারা নির্ধারিত লিঙ্গপরিচয় থেকেও আলাদা কেউ।”

দুর্দশার আরেক নাম ‘হিজড়া’

জয়া ঢাকা ট্রিবিউনকে আরও জানান, সরকারিভাবে তালিকাভুক্ত না হওয়ায় তাদের অনেকেই কোনও দুর্যোগকালীন ক্রাণসহায়তা পান না। তিনি বলেন, তৃতীয়লিঙ্গের মানুষদেরও সঙ্কট বা দুর্যোগ পোহাতে হয়। বরং বলা যায়, তাদের সারাজীবনই কাটে দুর্দশার মধ্যদিয়ে।

জয়া বলেন, “এমনকী এই মহামারির মধ্যেও আমাদের নিয়ে কারও কোনও চিন্তা নেই।”

তিনি জানান, খুব সামান্য পরিমাণ খাদ্য ও প্রয়োজনীয় দ্রব্য তিনি কয়েকজনকে দিতে পেরেছেন। তবে সেগুলো প্রায় মহাসমুদ্রে একফোঁটা জলের মত। সেই সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর থেকেই তাদের সম্প্রদায়ের বেশিরভাগ মানুষকে প্রায় খালিপেটেই রাত কাটাতে হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের বেশিরভাগ তৃতীয়লিঙ্গের মানুষ হয় তাদের এলাকার দোকানগুলোতে ঘুরে ঘুরে টাকা সংগ্রহ করেন, কিছু অংশ যৌনকর্মী পেশাকে বেছে নেন আবার কেউ কেউ সদ্যজাত শিশুদের মঙ্গলকামনা করে সেই পরিবারের কাছ থেকে টাকা নিয়ে জীবন চালান। 

বর্তমানে করোনাভাইরাসের মহামারিকালে তাদের আয়ের সকল পথই তাই সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

স্বাস্থ্য ও পরিসংখ্যানিক অংশীদার কার্যক্রম ও বন্ধু সমাজকল্যাণ সোসাইটির পরিচালক ফয়সুল আহসান জানান, তারা সারাদেশের অতিদরিদ্র ৩,৩৫০ জন তৃতীয়লিঙ্গের মানুষের একটি তালিকা তৈরি করেছেন। সেই তালিকানুযায়ী দু’সপ্তাহের মত খাদ্য ও প্রয়োজনীয়দ্রব্যাদি সরবরাহ করা হবে।  

তিনি জানান, দাতা ও বিভিন্ন কার্যক্রম থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে গঠিত ফান্ডে তার সংগঠনের প্রত্যেক সদস্য তাদের একদিনের বেতনের পরিমাণ অর্থ প্রদান করেছেন।

ফয়সুল আহসান বলেন, “তৃতীয়লিঙ্গের মানুষ কেবল আরএমজি ফ্যাক্টরিজ যেমন ডেনিম এক্সপার্টস ও জারহেম’এ স্থায়ীভাবে কাজ করতে পারেন। তবে আমরা বিজিএমইএ’র সঙ্গে কাজ করছি যেন তারা আরও বেশি করে কাজ করার সুযোগ পেয়ে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ মাসে আয় করতে পারেন।”

মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী 

এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, বাংলাদেশের তৃতীয়লিঙ্গের মানুষ কোভিড-১৯ সংক্রমণের দিক থেকে অতিঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। যদি কোনও একজনও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন, বাকিদের অবস্থাও শোচনীয় হবে।

এছাড়া, জীবন-যাপন ও পেশার কারণে তাদেরকে ভাইরাস বহন করার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এমনকী, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও তৃতীয়লিঙ্গের কয়েকজনকে হয়রানি করেছেন বলে ব্র্যাক পরিচালিত এক গবেষণায় কয়েকজন ভুক্তভোগী উল্লেখ করেছেন।

গবেষণাটির সুপারিশ হিসাবে গবেষকরা বলেছেন, কোভিড-১৯ সঙ্কটের সময় সহায়তা কার্যক্রমের পাশাপাশি মহামারি-পরবর্তী সময়েও জনস্বাস্থ্য ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই এই অত্যন্ত দুর্বল জনগোষ্ঠীটির পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হবে।

About

Popular Links