Saturday, May 25, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েও হতাশ শামিম

শামিমের ইচ্ছা ঢাকার নটেরডেম কলেজ অথবা যশোর ক্যান্টমেন্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার। কিন্তু পরিবারের আর্থিক দুরাবস্থা সেই স্বপ্নকে ফিকে করে দিয়েছে। তার চোখেমুখে কেবলই হতাশার ছাপ

আপডেট : ১০ জুন ২০২০, ০৬:৪৩ পিএম

সিদ্দিক মোড়ল সাতক্ষীরা শহরের শিশু হাসপাতালের বিপরীতে চা বিক্রি করেন। প্রতিদিন সকাল-বিকাল চা বিক্রির কাজে সিদ্দিক মোড়লকে সাহায্য করে ছেলে শামিম কবির নিরব। চায়ের দোকানের ব্যস্ততার ফাঁকে ফাঁকেই দোকানের বেঞ্চে বসেই চলে নিরবের পড়াশোনা। এভাবেই চলতি বছর এসএসসিতে গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছে সাতক্ষীরা সিটি কলেজ এলাকার নিরব। কিন্তু গোল্ডেন এই প্লাসই শামিমের হতাশাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। 

জানা যায়, শামিম সাতক্ষীরা পুলিশ লাইন মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ২০২০ সালের মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। সাতক্ষীরা সিটি কলেজ এলাকায় মাত্র ৫ শতাংশের ঘরবাড়িতে বাবা-মা ও তিন ভাইসহ পাঁচজন বাস। শামিমের দাদার বাড়ি কালিগঞ্জ উপজেলার নলতায়। কয়েক বছর আগে তার বাবা পরিবার নিয়ে চলে আসেন সাতক্ষীরা শহরে সিটি কলেজ এলাকায়।

বৃহস্পতিবার (০৪ জুন) বিকালে সাতক্ষীরা শিশু হাসপাতালের বিপরীতে সিদ্দিক মোড়লের চায়ের দোকানে গিয়ে দেখা গেছে, শামিমের বাবা সিদ্দিক মোড়ল বিক্রি করছেন। আর বাবার কাছে সাহায্য করছেন বিজ্ঞান বিভাগ থেকে সব বিষয়ে জিপিএ-৫ পাওয়া শামিম ও তার মা আঞ্জুমান আরা। 

কথা বলে জানা যায়, চায়ের দোকানের আয়ের উপর নির্ভর করেই চলে তাদের সংসার। দোকানে চায়ের পাশাপাশি কেক, বিস্কুট, চিপস ও পানি বিক্রি করা হয়। তবে করোনাভাইরাসের কারণে লকডাউনে চায়ের দোকান বন্ধ রাখতে হয়েছে দুই মাসেরও অধিক সময়। এতে শামিমের বাবা সীমাহীন আর্থিক কষ্টে পড়েছেন। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়েছে যে, ছেলের ভালো রেজাল্টের খবরে মানুষকে মিষ্টিমুখ করাতে অন্যের কাছ থেকে টাকা ঋণ নিতে হয়েছে। এছাড়া শামিমের ইচ্ছা ঢাকার নটেরডেম কলেজ অথবা যশোর ক্যান্টমেন্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার। কিন্তু পরিবারের আর্থিক দুরাবস্থা শামিমের সেই স্বপ্নকে ফিকে করে দিয়েছে। তার চোখেমুখে কেবলই হতাশার ছাপ।   

শামিমের বাবা সিদ্দিক মোড়ল বলেন, ছোট একটা চায়ের দোকানে পাঁচজনের সংসার চলে। শামিম আমার সাথে চা বিক্রির কাজে সাহায্য করে। লেখাপড়ার সময় ঠিকমতো পেতো না। দোকান ফাঁকা থাকলে দোকানের বেঞ্চে বই নিয়ে বসে পড়তো। ছেলেকে ঠিকমতো কোচিং করাতে পারিনি। আল্লাহর কাছে লাখো কোটি শুকরিয়া আমার ছেলে সব বিষয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে। আমার আরো দুটি যমজ ছেলে আছে তারা একজন ক্লাস ফাইভে একজন ক্লাস ফোরে পড়ে। আমাদের পাঁচজনের সংসার ঠিক মতো চলে না ওকে পড়াবো কিভাবে। ও (শামিম) ঢাকার নটরডেম কলেজে পড়তে চাচ্ছে কিন্তু টাকা নেই কিভাবে পড়াবো। 

তিনি আরও বলেন, করোনার কারণে প্রায় দুই মাস দোকান খুলতে পারিনি। অনেক কষ্টে দিন কেটেছে আমাদের। কারও কাছ থেকে কোনো প্রকার সাহায্য পায়নি। আগে চা বিক্রি করে প্রতিদিন ৭ শ’ থেকে ৮ শ’ টাকা রোজগার হতো কিন্তু লকডাউন তুলে নেওয়ার পর বেচা-বিক্রি কমে গেছে।

মা-বাবার সাথে শামিম। ঢাকা ট্রিবিউন

দারিদ্রের সাথে সংগ্রাম করেও ভালো ফলের রহস্য জানতে চাইলে শামিম বলে, দরিদ্র পরিবারে জন্ম, করার কিছু নেই। বাবা চায়ের দোকান একা সামলে উঠে পারে না। তাই তার কাজে সাহায্য করা লাগে। সকালে কিছু সময় বাবার সাথে কাজ করে স্কুলে যেতাম। বিকালে বাড়ি ফিরে দোকানে গিয়ে বাবাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিতাম তার খাওয়া ও বিশ্রামের জন্য। দোকান ফাঁকা হলেও সেখানেই পড়তে বসতাম। সন্ধ্যায় প্রাইভেট ও নিজের লেখাপড়া করতাম। এমনিভাবে আল্লাহর রহমতে এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল এসেছে।

সে আরও জানায়, আমার স্বপ্ন ঢাকার নটরডেম কলেজে ভর্তি হওয়ার। বাবা বলেছে সেখানে ভর্তি করার কতো এতো টাকা তার কাছে নেই। আর বিজ্ঞান বিভাগে প্রতিটি বিষয়ে প্রাইভেট পড়া লাগে। লেখাপড়া হবে কিনা জানি না। আমি লেখাপড়া করে বড় মানুষ হতে চাই। দেশের জন্য কিছু করতে চাই। সকলে আমার জন্য দোয়া করবেন।

সাতক্ষীরা লাইন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, শামিম ছোটবেলা থেকেই মেধাবি ও পরিশ্রমী। ক্লাস ওয়ানে ভর্তি পরীক্ষায় ১৩৩ জন ছাত্রের মধ্যে মধ্যে ২য় স্থান অর্জন করে। ক্লাস ফাইভের সমাপনী পরীক্ষায়ও জিপিএ-৫ এবং জেএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়। বাবার সাথে চায়ের দোকানে কাজ করেও সব বিষয়ে বিষয়ে জিপি এ-৫ পেয়েছে সত্যি আমি অবাক হয়েছি। পরিবারের অভাব-অনটন তাকে দমাতে পারেনি। সে বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষার্থী উচ্চ মাধ্যমিক অনেক বিষয়ে প্রাইভেট পড়ার প্রয়োজন হবে। সে জন্য প্রশাসন ও সমাজের বিত্তবান মানুষরা এগিয়ে না আসলে শামিমের মতো একজন মেধাবী ছাত্রকে আমরা হারাবো। আমি নিজে তাকে উচ্চ মাধ্যমিকের বই কিনে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছি।

সাতক্ষীরা পুলিশ লাইন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা পরিষদের সদস্য মনিরুজ্জামান বলেন, আমি চলার পথে দেখতাম শামিম তার বাবার সাথে চায়ের দোকানে কাজ করতো। সে এতো ভালো রেজাল্ট করেছে যে আমি সত্যি অবাক হয়েছি।

সাতক্ষীরা লাইন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পল্লব কান্তি ঘোষ বলেন, মেধাবীরা যেখানে সেখানে লুকিয়ে থাকে সে বিষয়ে আমার নতুন অভিজ্ঞতা হলো। বাবা-মাকে সাহায্য করে নিজের প্রচেষ্টার মাধ্যমে ভালো ফলাফল করা সম্ভব সেটা শামিম সবচেয়ে বড় উদাহরণ। পুলিশ লাইন স্কুল থেকে এবার মোট ২২ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে এবং পাঁচজন গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছে। তার মধ্যে সেরা শামিম। ছেলেটি খুবই মেধাবী ও পরিশ্রমী। দারিদ্র্য তাকে আটকে রাখতে পারেনি। শামিমের এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণায় হিসেবে প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে যা যা করণীয় সব করবো। 

About

Popular Links