Friday, May 24, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বরাদ্দ-ব্যয়ের মধ্যকার সংকট স্পষ্ট

স্বাস্থ্যখাতের খরচের বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, একদিকে বাজেটে যেমন বরাদ্দ কম অন্যদিকে এই বরাদ্দের যতটা না চিকিৎসার পেছনে খরচ হয় তারচেয়ে বেশি খরচ হয় ভৌত অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ ও বেতন-ভাতার পেছনে

আপডেট : ১১ জুন ২০২০, ১০:৫০ এএম

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই দেশের নাজুক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চিত্রটি বেরিয়ে এসেছে। একদিকে যেমন মহামারি সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে দেশটির স্বাস্থ্যখাত, সেইসঙ্গে এর নানা দুর্বলতার বিষয়টিও সামনে এসেছে। এক বিশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি।

সেখানে বলা হয়, অনেকেই স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ আরো বাড়ানোর পরামর্শ দিলেও বিশেষজ্ঞদের অনেকে আবার বলছেন, শুধুমাত্র বরাদ্দ বাড়িয়ে স্বাস্থ্যখাতের নাজুক অবস্থার পরিবর্তন হবে না, এজন্য দরকার বরাদ্দ বাস্তবায়নের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও কার্যকর ব্যবহার।

সেইসঙ্গে বহুবছর ধরেই স্বাস্থ্যখাতের বরাদ্দে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থহীন ব্যয়ের অভিযোগও উঠছে। সরকারি স্বাস্থ্যখাতের বেহাল দশার কারণে বাংলাদেশে গড়ে উঠেছে বেসরকারি বিশাল একটি চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থা। যেখানে চিকিৎসাসেবা নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে।

স্বাস্থ্যখাতের বরাদ্দ

বাংলাদেশের জাতীয় প্রবৃদ্ধির বিবেচনায় অন্যান্য খাতের তুলনায় স্বাস্থ্যখাত বাজেটে বরাবরই কম গুরুত্ব পেয়ে আসছে। ২০১৯-২০২০ সালের চলতি বাজেটে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের জন্য বরাদ্দ রয়েছে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি’র মাত্র ০ দশমিক ৮৯ শতাংশ। অর্থ মূল্যে যার পরিমাণ ২৫ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা। পুরো বাজেটের আকারের তুলনায় তা ছিল মাত্র ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। অথচ পরিবহন ও যোগাযোগ খাত পেয়েছে বাজেটের ২৬ দশমিক ১ শতাংশ, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাত পেয়েছে ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ।

জাতিসংঘের ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কমিশন ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিকের (এসকাপ) ২০১৮ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জিডিপি’র বিচারে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৫২টি দেশের মধ্যে স্বাস্থ্যখাতে সবচেয়ে কম বরাদ্দ দেওয়া হয় বাংলাদেশ।

চিকিৎসার চেয়ে অবকাঠামো ও ক্রয়ে বড় খরচ

স্বাস্থ্যখাতের খরচের বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, একদিকে বাজেটে যেমন বরাদ্দ কম অন্যদিকে এই বরাদ্দের যতটা না চিকিৎসার পেছনে খরচ হয়, তারচেয়ে বেশি খরচ হয় ভৌত অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ ও বেতন-ভাতার পেছনে।

চলতিবছরের মোট বরাদ্দ ২৫ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকার মধ্যে ১৩ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা চলে গেছে পরিচালন খাতে। এর মাত্র এক চতুর্থাংশের মতো বরাদ্দ হচ্ছে ওষুধ ও সরঞ্জাম কেনার পেছনে। বাকি অর্থ চলে যাচ্ছে বেতন-ভাতায়, যদিও প্রয়োজনের তুলনায় এখনো চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যা অনেক কম।

সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সরকারি হাসপাতাল রয়েছে ৬৫৪টি এবং এসব হাসপাতালে মোট শয্যার সংখ্যা ৫১,৩১৬টি। আর বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে ৫,০৫৫টি, যেখানে মোট শয্যার সংখ্যা ৯০,৫৮৭টি।

বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে অনুমিত জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৪৬ লাখ। সেই হিসাবে প্রতি ১,১৫৯ জন ব্যক্তির জন্য হাসপাতালে একটি শয্যা রয়েছে।

সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলছেন, ''যে বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়, সেটাও পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হয় না। সেটা মূলত ভৌত অবকাঠামো, প্রশাসনিক ব্যয়, বেতন-ভাতা ইত্যাদিতে চলে যায়। প্রকৃতপক্ষে রোগীর সেবার জন্য বরাদ্দ খুবই কম।”

বড় সমস্যা দুর্নীতি

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের দুর্নীতির খানা জরিপে অনেকবার শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত খাতের মধ্যে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের নাম উঠে এসেছে।

টিআইটি সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০১৭ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত খাতগুলোর একটি স্বাস্থ্যখাত, যেখানে দুর্নীতির হার ৪২.৫ শতাংশ।

এবিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোঃ হাবিবুর রহমান বলেন, ''স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা দেখার জন্য সরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান আছে। আমি মনে করি, বিভিন্ন কমিটি দায়িত্বে রয়েছে, তাদের কিছুটা দায়দায়িত্ব রয়েছে। যখন কোন কিছু ক্রয় করা হবে, যারা অনুমোদন দেবেন, যারা পরীক্ষানিরীক্ষা করবেন- সকল পর্যায়ে সবাই যদি ভালো করে সময় দেন, তাহলে কেউ (দুর্নীতি) করার সুযোগ পাবেন না।''

বরাদ্দ খরচে অক্ষমতা

চলতি অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) স্বাস্থ্যখাতে ১৩ হাজার ৫৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও, খরচ করতে না পারায় সংশোধিত এডিপি ১০ হাজার ১০৮ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। তবে এই বরাদ্দেরও পুরোটা ব্যবহার করতে পারে না বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত। এবছরেও যেমন বরাদ্দ থেকে অব্যবহৃত হওয়ায় এক হাজার কোটি টাকা ফেরত যাচ্ছে।

জাতীয় স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের আহবায়ক ডা. রশিদ-ই মাহবুব বলেন, ''টাকা বাড়িয়েও যদি সেটা খরচ করা না যায়, তাহলে তো টাকা বাড়িয়েও কোন লাভ নেই। আগে সেটা ঠিক মতো খরচ করার, কাজে লাগানোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। শুধু বরাদ্দ দিলেই তো হবে না, সেটা কীভাবে কাজে লাগানো হবে, সেটাও তো নিশ্চিত করতে হবে। আপনি একটা যন্ত্র কিনে দিলেন কিন্তু সেটা ব্যবহারের লোক না থাকলে তো কাজে লাগবে না।''

অন্যদিকে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোঃ হাবিবুর রহমান বলেন, ''সরকারি যেকোনো অর্থব্যয়ের কিছু প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। আসলে বাজেট ঘোষণার পর প্রকল্প শুরু করতে একটু সময় লেগে যায়, তাই অনেক সময় পুরো বরাদ্দ খরচ করা যায় না। আমি মনে করি, প্রকল্পগুলো যদি আগেভাগে শুরু করা যায় তাহলে বরাদ্দ পুরোপুরি কাজে লাগানো যাবে।''

তবে স্বাস্থ্যখাতের দক্ষতা বাড়াতে সরকারের অনেক প্রচেষ্টা রয়েছে বলেও জানান তিনি। 

About

Popular Links