Tuesday, May 21, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

একই বর্ষের ১৫ শিক্ষার্থীর সুপারভাইজার একজন, গবেষণার মান নিয়ে প্রশ্ন

‘বিভাগের শিক্ষক সংকট রয়েছে। প্রথম ব্যাচ হওয়ায় এখান থেকে শিক্ষক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে যে নিয়োগ পাবে, সে যেন তার অনুসারী হয় সে জন্য এমনটা করতে পারেন’

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২০, ১১:০০ পিএম

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের মাস্টার্সের ১৫ শিক্ষার্থী থিসিস করেছেন বিভাগের সভাপতি আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরীর অধীনে। এত সংখ্যক শিক্ষার্থীর থিসিসে এক সঙ্গে সুপারভাইজার থাকা বিরল উল্লেখ করে অনেকে গবেষণার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে মামুন চৌধুরী দাবি, সিনিয়র শিক্ষক না থাকায় অনেকটা বাধ্য হয়ে তিনি সবার সুপারভাইজার ছিলেন। এছাড়া সকল নিয়ম অনুসরণ করে গবেষণা করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে গবেষণার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই।

বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে শিক্ষক ছয়জন। এরমধ্যে একজন সহযোগী অধ্যাপক, দুই সহকারি অধ্যাপক ও তিন জন প্রভাষক রয়েছে। এর মধ্যে দুই সহকারি অধ্যাপক শিক্ষক শিক্ষা ছুটিতে রয়েছে। বাকীদের মধ্যে সহযোগী অধ্যাপক মামুন চৌধুরী বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন। তিনি ইতিহাস বিভাগের ছাত্র ছিলেন। বাকি তিনজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন।    

বিভাগের প্রথম ব্যাচের ৩৮ শিক্ষার্থীর মধ্যে ১৫ জন থিসিসের জন্য আবেদন করে। যাদের সবার সুপারভাইজার হিসেবে ছিলেন মামুন চৌধুরী। গত ডিসেম্বরে শিক্ষার্থীরা তাদের থিসিস জমা দিয়েছেন।

বিভাগের শিক্ষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরীর প্রথম থেকে একাই থিসিস গ্রুপের সুপারভাইজার হিসেবে থাকার আগ্রহ প্রকাশ করেন। পরে বিভাগের একাডেমিক কমিটির মিটিংয়ে তিনজন প্রভাষককে জুনিয়র উল্লেখ করে সহযোগী অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরীকে থিসিসের জন্য মনোনীত করা হয়। ফলে অনেকটা বাধ্য হয়ে অনেক শিক্ষার্থী তার অধীনে থিসিস করেছেন। এছাড়া মাস্টার্সের থিসিসের ৩০০ নম্বর ছাড়াও ৬০০ নম্বরের কোর্সের মধ্যে একজন শিক্ষক শিক্ষা ছুটিতে যাওয়ায় ওই শিক্ষকের দুটি কোর্সসহ ৩০০ মার্কের কোর্স শিক্ষক মামুন চৌধুরী। ফলে অনেক শিক্ষার্থী  অনিচ্ছকৃত হলেও তার অধীনে থিসিস করেছেন।

সুপারভাইজার হওয়ার আগ্রহ প্রকাশের কারণ কি জানতে চাইলে বিভাগে এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, “বিভাগের শিক্ষক সংকট রয়েছে। প্রথম ব্যাচ হওয়ায় এখান থেকে শিক্ষক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে যে নিয়োগ পাবে, সে যেন তার অনুসারী হয় সে জন্য এমনটা করতে পারেন। এছাড়া এখানে একজন শিক্ষার্থী সুপারভাইজার হলে চার হাজার টাকা পায়। অর্থনৈতিক বিষয়টিও এখানে থাকতে পারে বলে ওই শিক্ষকের ধারণা।”

আগ্রহের বিষয়টি অস্বীকার করে মামুন চৌধুরী বলেন, “এখানে আগ্রহের কোনো সুযোগ নেই। দক্ষ ও অভিজ্ঞ সিনিয়র শিক্ষক না থাকায় অনেকটা বাধ্য হয়ে আমি সবার সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করেছি।”

তবে ৩০০ নম্বরের কোর্স শিক্ষকের বিষয়ে তিনি দুই ধরনের বক্তব্য প্রদান করে। প্রথমে একটি কোর্স পড়ান দাবি করলেও পরে বলেন, “আমি কয়টা কোর্স পড়িয়েছি এ মুহুর্তে বলতে পারছি না।”

একজন সুপারভাইজারের অধীনে একই বর্ষের ১৫ শিক্ষার্থীর থিসিসের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন সিনিয়র অধ্যাপকের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয়। তারা বলছেন, একজন শিক্ষকের পক্ষে এক সঙ্গে ১৫টি থিসিসের সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করা কঠিন। এ ক্ষেত্রে  একটি থিসিসের যে স্ট্যান্ডার্ড থাকা দরকার সেটি আসবে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. প্রদীপ কুমার পান্ডে দীর্ঘদিন বিভাগের শিক্ষার্থীদের থিসিসের সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করছেন। তিনি মনে করেন, “একজন শিক্ষকের পক্ষে এত সংখ্যক থিসিসের সুপারভাইজার হিসেবে থাকা কঠিন। বিভাগের একাডেমিক ও প্ল্যানিং কমিটির বিষয়টি লক্ষ্য রাখা উচিৎ ছিল।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ইলিয়াস হোসেন বলেন, “একজন শিক্ষকের  পক্ষে সর্বোচ্চ পাঁচজন শিক্ষার্থীর থিসিসের সুপারভাইজার হিসেবে থাকা সম্ভব। এর চেয়ে বেশি হলে থিসিসের স্ট্যান্ডার্ড মান আসে না। যেহেতু একজন শিক্ষকের থিসিস ছাড়াও এখানে বিভাগের অনেক দায়িত্ব পালন করতে হয়। ১৫ জন শিক্ষার্থী হলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার।”

গবেষণার মানের বিষয়ে জানতে চাইলে আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী বলেন, “থিসিসগুলো জমা হওয়ার পর এগুলো সফটওয়্যারের মাধ্যমে চেক করা হয়েছে। এখন আমরা এই থিসিসগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সপার্টের কাছে পাঠাবো। তারা এগুলো দেখবে। সুতারাং এখানে থিসিসের স্ট্যান্ডার্ড নিয়ে প্রশ্নতোলার সুযোগ নেই।”  

একজন সুপারভাইজারের অধীনে কতজন শিক্ষার্থী থিসিস করতে পারে সে বিষয়ে কোনো নিদিষ্ট নিয়ম নেই জানিয়ে সমাজবিজ্ঞান অনুষদের অধিকর্তা (ডিন) অধ্যাপক ফখরুল ইসলাম বলেন, “১৫ শিক্ষার্থী একজন শিক্ষকের অধীনে থিসিস করেছেন এটা আমার জানা ছিল না। আমি বিষয়টি খোঁজ নিবো। এমনটা হয়ে থাকলে গবেষণার মান কবে যাবে এটাই স্বাভাবিক। আমি বিভিন্ন বিভাগের সভাপতিদের সাথে একটি নিয়ম করার চেষ্টা করব।”

About

Popular Links