Wednesday, May 22, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

প্রকাশিত নথিপত্রে ১৯৭৫ অভ্যুত্থান পরিকল্পনায় জিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার ইঙ্গিত

সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি বরখাস্তকৃত কর্নেল আবদুর রশিদের স্ত্রী জোবাইদা রশিদ সাক্ষ্য দিয়েছেন, খুনিরা এই চক্রান্ত নিয়ে জিয়ার কাছে যায় এবং এই রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের জন্য তার সম্মতি অর্জন করে

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২০, ১০:৪৫ এএম

বাংলাদেশের প্রথম সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যাযজ্ঞের পেছনে মূল নেপথ্য নায়ক ছিলেন বলে পূর্বের জল্পনা-কল্পনাকে সত্য প্রতিপন্ন করে দেশের অভ্যন্তরে ও বিদেশে প্রকাশমান নথিপত্র ও নতুনতর গবেষণা তাকে এই চক্রান্তের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে সামনে নিয়ে আসছে।

জাতীয় শোক দিবসের প্রাক্কালে এক সাক্ষাৎকারে এই মামলায় বাদী পক্ষের অন্যতম প্রধান আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, “জিয়াকে বঙ্গবন্ধু হত্যার মামলায় দোষী সাব্যস্ত করা যায়নি, কারণ, তিনি বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই মারা গিয়েছিলেন।”

তবে, তিনি অরো যোগ করেন, সমস্ত ইঙ্গিত থেকেই বোঝা যায় যে ঘাতকরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যকে হত্যার জন্য জিয়ার সম্মতি নিয়েই মাঠে অগ্রসর হয়েছিল।

আইনজীবী আনিসুল হক বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার প্রধান প্রসিকিউটর সিরাজুল হকের প্রধান সহযোগী বা দ্বিতীয় ব্যক্তি ছিলেন। ঘটনাক্রমে সিরাজুল হক ছিলেন আনিসুল হকের পিতা। তিনি বলেন, জিয়া হত্যাকারীদের প্ররোচিত করেন এবং শেষ পর্যন্ত এই হত্যাকাণ্ডের মূল সুবিধাভোগী হন।

তিনি বলেন, এই মামলার সাজাপ্রাপ্ত অন্যতম প্রধান আসামি বরখাস্তকৃত কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান ও তার প্রধান সহযোগী সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি বরখাস্তকৃত কর্নেল আবদুর রশিদের স্ত্রী জোবাইদা রশিদ সাক্ষ্য দিয়েছেন যে খুনিরা এই চক্রান্ত নিয়ে জিয়ার কাছে যায় এবং এই রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের জন্য তার সম্মতি অর্জন করে।

রশিদের মেয়ে মেহনাজ রশিদ এই বিচারের পরপরই বাসস-এর একজন সংবাদদাতাকে দেওয়া মন্তব্যে স্পষ্টতই সে সময়ের সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান জিয়ার দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, “হ্যাঁ, আমার বাবা এখন হত্যাকারী হিসাবে বিবেচিত, তবে, কে তাকে ব্যবহার করেছে? সেই ব্যক্তি ঘটনা পরম্পরায় নায়ক হিসাবে হাজির হন।”

তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ সম্প্রতি ‘১৫ ই আগস্ট: একটি জাতীয় ট্র্যাজেডি’ শীর্ষক একটি বইতে হত্যাকান্ডের সময় এবং পরের পরিস্থিতির বিশদ বিবরণ তুলে ধরেছেন, যেখানে তিনি হত্যাকারীদের সামরিক পদক্ষেপ থেকে রক্ষার জন্য তার ডেপুটির বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ করেন।

‘১৫ আগস্টের ঘটনাবলীর কথা স্মরণ করে অশীতিপর জেনারেল লিখেছেন, ‘প্রথম দিন থেকে তিনি যেসব পদক্ষেপ নেন এবং তিনি আমাকে যে সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করেন তার সবই ছিল বিদ্রোহী সৈন্যদের (হত্যাকারীদের) সহায়তা করার জন্য।’

শফিউল্লাহ জানান, ১৫ আগস্ট সকালে তিনি জিয়া এবং তৎকালীন সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফকে তার বাসায় আসতে বলেন এবং দু’জন ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে সেখানে উপস্থিত হন।

তবে, জিয়া ‘ইউনিফর্ম পরিহিত, সঠিকভাবে শেভ করা, তার সরকারি গাড়িতে এবং তার ড্রাইভার দিয়ে গাড়ি চালিয়ে এসেছিলেন। আর খালেদ শেভ না-করা এবং নিজের ব্যক্তিগত গাড়ি চালিয়ে পাজামা (নাইট ড্রেস) পরে এসেছিলেন।’

শফিউল্লাহ লিখেছিলেন, ‘যদিও দু’জনেই প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে আমার সামনে উপস্থিত হয়েছিলেন, তবু, এই পার্থক্যগুলো তখন আমাকে ভাবায়নি। পরে যখন আমার চিন্তা করার অবসর হল, কেবল তখনই আমি বুঝতে পারি কে কী করছিল!’

শফিউল্লাহ পরবর্তীকালে জানতে পারেন, তাকে জানানোর আগেই উপ-সেনা প্রধান হিসাবে জিয়া ঢাকা সেনানিবাস ভিত্তিক গুরুত্বপূর্ণ ৪৬তম স্বাধীন পদাতিক ব্রিগেডের কর্নেল শাফাত জামিলকে কিছু নির্দেশনা দেন কিন্তু বিস্ময়করভাবে তার আদেশ সম্পর্কে তাকে কিছু জানাননি, যা সন্দেহজনক।

অন্যদিকে, শফিউল্লাহ যখন খালেদকে ঘাতকদের বিরুদ্ধে সৈন্য মুভ করাতে শাফাতকে সহায়তা করার জন্য ৪৬ ব্রিগেড এলাকায় যাওয়ার নির্দেশ দিলেন, তখন “জেনারেল জিয়া এর তীব্র বিরোধিতা করেন” এবং বলেন যে “তিনি (খালেদ) এটি বরবাদ করতে চলেছেন।”

শফিউল্লাহ লিখেছেন, “আমি এখন যখন এই মুহূর্তগুলোর কথা স্মরণ করার চেষ্টা করি তখন প্রশ্ন আসে ব্রিগেডিয়ার খালেদ কী বরবাদ করতে যাচ্ছিলেন, যার জন্য জেনারেল জিয়া এত চিন্তিত ছিলেন। ৪৬ ব্রিগেড অঞ্চলের ওই পদক্ষেপগুলো কি তিনি যে পরিকল্পনা করেছিলেন তার বিরুদ্ধে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল?”

তৎকালীন সেনাপ্রধান স্মৃতিচারণ করেন খালেদ ৪৬ ব্রিগেড থেকে ফিরে এসে তার রিপোর্টিং শেষ করার পরে, “জেনারেল জিয়া পরামর্শ দেন যে সিজিএস-এর এখন বাইরে যাওয়া উচিত হবে না, বরং একটি সম্ভাব্য ভারতীয় আক্রমণ মোকাবেলায় সেনাবাহিনীকে অগ্রসর করানোর জন্য একটি অপারেশন অর্ডার (অপস অর্ডার) প্রস্তুত করতে বসতে হবে।”

তিনি বলেন, “যদিও এটি একটি সম্ভাবনা হতে পারে, ততক্ষণ পর্যন্ত এরকম কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি (এবং) আমার জন্য তখনকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু সামলানো। আমি তাই জেনারেল জিয়াকে বললাম যে আমাকে প্রথমে এই নাজুক পরিস্থিতি সামলাতে দাও।”

About

Popular Links