Monday, May 20, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

অনাহার থেকে শত শত পরিবারকে বাঁচালো স্টার্ট ফান্ড বাংলাদেশ

করোনাভাইরাসের কারণে শহরের যারা চাকরি হারিয়ে গ্রামে গিয়েছিলেন ফসলি জমি ডুবে যাওয়ায় তাদের সমস্যা আরও বেড়েছে

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২০, ০৬:০৪ পিএম

চলতি বছরের বন্যায় বাংলাদেশের চর অঞ্চলের হাজার হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পানিতে তলিয়ে গেছে ফসলি জমি। এদিকে চলছে করোনাভাইরাস মহামারি। বন্যার কারণে আরও বেড়ে যায় এ বিপর্যয়। করোনাভাইরাসের কারণে শহরের যারা চাকরি হারিয়ে গ্রামে গিয়েছিলেন ফসলি জমি ডুবে যাওয়ায় তাদের সমস্যা আরও বেড়েছে।

সাম্প্রতিক বন্যার পরে দেশজুড়ে চর অঞ্চলের বেশিরভাগ পরিবারগুলো খাদ্য ও অর্থনৈতিক সহায়তা পেয়েছিল। তবে দীর্ঘমেয়াদে এ সহায়তাগুলো প্রয়োজনের তুলনায় কম। তাই তারা আরও সাহায্যের জন্য আবেদন করছে

আগস্টে “টাঙ্গাইলের ভূয়াপুর উপজেলায় বন্যা মৌসুমে সাড়াদান কার্যক্রম ২০২০ (দ্বিতীয় পর্যায়)"এর আওতায় এনডিপি ভূয়াপুর উপজেলার দুটি ইউনিয়নের ৮০০ পরিবারকে ত্রাণ সরবরাহ করেছিল। তাদের নগদ ৩ হাজার টাকা এবং একটি “হাইজিন কিট প্যাকেজ” দেওয়া হয়েছিল যেখানে-একটি বালতিসহ পানি পরিশোধন ট্যাবলেট, সাবান, মাস্ক, স্যানিটারি প্যাড, স্যানিটাইজার এবং বেশ কিছু জরুরি পণ্য দেওয়া হয়েছিল।

এছাড়া ওই এলাকায় ৫০টি টিউবওয়েল সংস্কার এবং আটটি নতুন টিউবয়েলসহ ছয়টি নতুন শৌচাগার করা হয়েছে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রত্যন্ত চর অঞ্চলে বিশুদ্ধ খাবার পানি এবং স্যানিটেশনের চাহিদা পূরণ করা হয়েছে। এই সহায়তাগুলো স্টার্ট ফান্ড বাংলাদেশ এবং ফরেইন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট অফিস - এফসিডিও (পূর্বে ইউকেএআইডি) - এর মাধ্যমে করা হয়।

টাঙ্গাইলের ভূয়াপুরের গাবসারা ইউনিয়নের চর চন্দনীর বাসিন্দা সোনা বানু (৭০)। প্রতি মাসে তার ছেলের মাধ্যমে ২০০-৩০০ টাকা সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়। বন্যা শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই সোনা বানুর ছেলে চাকরি হারায়। তিনি বলেন, "আমাকে রাতে অন্ধকারের মধ্যে থাকতে হয়েছিল, কারণ কেরোসিন ও খাবারের জন্যে শুধু চাল-আলু কেনার মতো সামর্থ্য আমার ছিল না" ।

চার সন্তানসহ সোনা বানু এনডিপির নগদ প্যাকেজ এবং হাইজিন কিট গ্রহণ করেন। এর ফলে এখন তিনি রাতে কেরোসিন দিয়ে আলো জ্বালাতে পারছেন এবং তার পরিবারকে দু’বেলা খাবার খাওয়াতে পারছেন। তবে এখন থেকেই তার চিন্তা বাড়ছে-যখন টাকা শেষ হয়ে যাবে তখন কী করবেন।

এনডিপি চর চন্দনীতে টিউবওয়েল খনন করে চর বাসিন্দাদের নিরাপদ পানি নিশ্চিত করেছে। সেখানে প্রায় ২০টি পরিবারের ঘরবাড়ি নদীর ভাঙনের কবলে পড়ে পুনর্বাসিত হয়েছিল। ৪০ বছর বয়সী কোহিনুর বেগম বলেন, "আগে আমাদের খাবার পানি সংগ্রহ করতে নৌকায় করে দেড় কিলোমিটার দূরে যেতে হত। তবে এখন আমাদের হাতের কাছেই খাবার পানি রয়েছে।"

ভূয়াপুরের প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস (পিআইও) সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় বন্যা ও নদীভাঙনে মোট ১৮ হাজার ৬১০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এর মধ্যে ৬৮০টি পরিবার সব হারিয়েছে।

এনডিপি ভুয়াপুরুপ উপজেলার দুটি ইউনিয়নে (গাবসারা ও অর্জুন) ৮০০ পরিবারকে ত্রাণ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরিবার রয়েছেন যারা সরকারি ত্রাণ এবং এনজিও সহায়তা দুটোরই নাগালের বাইরে রয়েছে।

এনডিপির উপপরিচালক কাজী মাসুদুজ্জামান স্পষ্ট করে বলেছেন, “স্টার্ট ফান্ডের বাংলাদেশের ৭২ ঘণ্টার র‍্যাপিড রেসপন্স মেকানিজমের কারণে আমরা এই সঙ্কটে প্রথমেই সাড়া দিতে পেরেছি। তবে, এরকম দুর্যোগ মোকাবিলায় অসহায় সম্বলহীন লোকদের তালিকা তৈরি করে তাদের প্রয়োজনীয়তা তালিকাভুক্ত করা দরকার এটি দুর্যোগের আগে সরকাসি ও বেসরকাসি সংস্থার মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে তৈরি করা হবে। জেলাভিত্তিক ‘একটি জেলা, একটি তালিকা’ থাকলে ঝুঁকিপূর্ণ লোকজনের কাছে দ্রুত নিয়মতান্ত্রিকভাবে সহায়তা নিয়ে পৌঁছানো যাবে। সঙ্গে সঙ্গে একই ব্যক্তির একাধিক সহায়তা রোধ হবে।”

গাবসারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনির হোসেন বলেন, “এনডিপি সরকার ত্রাণের চেয়ে বন্যার ক্ষতিগ্রস্থদের জন্য প্রচুর পরিমাণে পণ্য এবং নগদ সরবরাহ করেছিল। কারণ, এনজিও হিসাবে তাদের বৈদেশিক তহবিলের সহয়তা রয়েছে। আর সরকারকে সীমিত বাজেটে পুরো দেশকে সাহায্য করতে হয়।”

“আমার ইউনিয়নে ৪৭টি গ্রাম আছে। হাজার হাজার স্থানীয় বাসিন্দা দূরে বিভিন্ন চরগুলোয় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং কেউ কেউ ঋণ নিয়ে বেঁচে আছে। শ্রমিকেরা অগ্রিম বেতন নিয়ে চলছে। আর অনেকেই এখন চাকরি হারিয়েছে। সাধারণত, চর অঞ্চলে দিনমজুরেরা দিনে ৩০০-৩৫০ টাকা আয় করতো। কিন্তু, এখন এই পরিস্থিতিতে প্রতিদন ১০০ টাকা আয় করতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, "কৃষিকাজ শুরু করতে কমপক্ষে আরও দুই মাস প্রয়োজন। তবে বন্যার পানির স্তর পর্যাপ্ত পরিমাণে কমছে না।"

স্টার্ট ফান্ড বাংলাদেশের সহায়তায় এনডিপির সমর্থনে, স্থানীয়দের তাদের সম্পত্তি বিক্রি বা ঋণ নেওয়া থেকে রাখছে।

স্টার্ট ফান্ড তাৎক্ষণিক সহায়তা
 

এনডিপির নির্বাহী পরিচালক মো. আলাউদ্দিন খান বলেন, “আমাদের লক্ষ্য ছিল স্টার্ট ফান্ড বাংলাদেশের উদ্যোগ থেকে কেউই বাদ যাবে না, এমনকি প্রত্যন্ত জনগোষ্ঠীর সবাইকে সার্বিক সহায়তা ও ত্রাণ প্যাকেজগুলো দেওয়া হবে। কোভিড-১৯ মহামারি ও বন্যার কারণে আমাদের কর্মীদের পক্ষে ত্রাণ নিয়ে চর অঞ্চলে যাওয়াটা অসম্ভব ছিল। কিন্তু তাদের অদম্য সাহস আর উদ্যমের কাছে চর অঞ্চলে ত্রাণ পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। নৌকায় করে চরে পৌঁছতে প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় লেগেছিল এবং আমাদের বিতরণ শেষ করতে সাত দিন সময় লাগে। এটা সম্পুর্ণভাবে সম্ভব হয়েছে আমাদের কর্মীদের সাহস এবং ত্যাগের কারণে।”

স্টার্ট ফান্ড বাংলাদেশ কীভাবে এত দ্রুত সাড়া দেয়?

স্টার্ট ফান্ড বাংলাদেশ তার সদস্য সংস্থাগুলি থেকে সতর্কতার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তহবিল বরাদ্দ নিশ্চিত করে। প্রকল্প প্রক্রিয়া কমিটি কর্তৃক কোনো সদস্য সংস্থার দ্বারা সতর্কতা প্রস্তাবনা জমা দেওয়া থেকে প্রস্তাবনা নির্বাচন ও সংক্ষিপ্ত তালিকাভুক্ত করা পুরো সময়টিতে জড়িত। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সদস্য সংগঠনের প্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত হয়ে থাকে।

স্টার্ট ফান্ড বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার জনাব সাজিদ রায়হান বলেন, “এই তহবিলটি সমাজের নাগরিকদের সহায়তায় পরিচালিত যা দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বিবর্তনে ভূমিকা রাখে। তহবিলটিকে আরও সক্রিয় এবং প্রয়োজনের প্রতি প্রতিক্রিয়াশীল করতে এবং মানবিক সহায়তায় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায়কে সহায়তা করতে মানবিক সংস্থাগুলোর সহায়তা প্রয়োজন।”

স্টার্ট ফান্ড বাংলাদেশ হলো একটি ১০ মিলিয়ন ব্রিটিশ পাউন্ডের দ্রুত জরুরি সহায়তার তহবিল, যা ২০১৭ সালে স্টার্ট নেটওয়ার্ক দ্বারা তৈরি করা হয় এফসিডিও’র সহায়তায়। স্টার্ট তহবিলের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল সঙ্কটের সতর্কতার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সক্রিয় হয়ে সহায়তা দেওয়া।

About

Popular Links