Friday, May 24, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বিদ্যুৎহীন সিলেট: পানির তীব্র সংকট, বেড়েছে দ্রব্যমূল্য

মঙ্গলবার সকাল ১১টা ১০ মিনিট থেকে সিলেটের বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে

আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০২০, ০৭:০২ পিএম

৩০ ঘন্টায়ও সিলেটের বিদ্যুৎ সংযোগ স্বাভাবিক হয়নি। এ কারণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সিলেটের নগরজীবন। এর জের ধরে দেখা দিয়েছে পানির তীব্র সংকট। বেড়েছে অনেক পণ্যের মূল্যও।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবো) সিলেট-এর প্রধান প্রকৌশলী মোকাম্মেল হক জানিয়েছেন, “বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপনের কাজ চলছে। এটি একটি সূক্ষ্ম কাজ। বিদ্যুৎ এলেই কেবল বোঝা যাবে-তা এসেছে।”

বিউবো’র পরিচালক (জনসংযোগ) সাইফুল হাসান চৌধুরী জানিয়েছেন, “ক্ষতিগ্রস্ত লাইন মেরামতের পর টেস্টিং চলছে। টেস্টিং এর সময় কোথাও ফল্ট ধরা পড়লে তা কারেকশন করা হচ্ছে।” 

এদিকে বিদ্যুৎ না থাকায় সিলেট নগরীতে তীব্র পানি সংকট দেখা দিয়েছে। ইন্টারনেট ও মোবাইলের সংযোগও ব্যাহত হচ্ছে। দ্বিগুণ হয়ে গেছে মোমাবাতির দামও, বেড়ে গেছে যানবাহনের ভাড়া। 

এদিকে, বিদ্যুত বিভাগের উদ্যোগে গঠিত তদন্ত কমিটিও বুধবার (১৮ নভেম্বর) থেকে কাজ শুরু করেছে। বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের একটি টিমও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। 

সিলেটের কুমারগাঁওয়ের ১৩২/৩৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রে আগুন লাগার পর মঙ্গলবার সকাল ১১টা ১০ মিনিট থেকে সিলেটের বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলে সুনামগঞ্জ জেলার বিদ্যুত সংযোগ স্বাভাবিক হলেও বুধবার বিকাল ৪টায় পর্যন্ত সিলেটে বিদ্যুত সংযোগ স্বাভাবিক হয়নি।

নাম প্রকাশ না করার বিউবোর একজন প্রকৌশলী জানান, সিলেটের বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে  মঙ্গলবার দুপুর থেকে দেড় থেকে দুই শতাধিক লোক কাজ করছেন। ওই সূত্র জানায়,  আগুনে বিদ্যুৎ লাইনের ব্যাপক ক্ষতিসাধিত হয়েছে। বিশেষ করে বটেশ্বর ফিডারের অবস্থা সবচেয়ে বেশি খারাপ।

বুধবার সন্ধ্যা নাগাদ নগরীর কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। অগ্রাধিকারভিত্তিতে ওসমানী মেডিকেল কলেজ, আদালতপাড়া, কালেক্টরেটসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ স্বাভাবিক হতে পারে। 

অপর এক প্রশ্নের জবাবে ওই প্রকৌশলী জানান, বটেশ্বর এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ বুধবার স্বাভাবিক নাও হতে পারে। 

বিউবো সূত্র জানায়, আগুনে জাতীয় গ্রিড লাইনের দুটি ট্রান্সমিটার পুড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে। বুধবার (১৮ নভেম্বর) সন্ধ্যার মধ্যে একটি পাওয়ার ট্রান্সফরমার দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ আংশিক চালু করা সম্ভব হতে পারে। আর অন্য একটি ট্রান্সফরমার গাজীপুরের টঙ্গী থেকে ট্রাকে করে পাঠানো হচ্ছে। সিলেটের উদ্দেশে ইতোমধ্যে সে ট্রাকটি রওয়ানা হয়ে গেছে। সেটি এসে পৌঁছলে তা স্থাপন করতে দু-একদিন সময় লাগবে। এরপরই পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে সিলেটের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা।


 ঘটনাস্থলে তদন্ত কমিটির সদস্যরা 

অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে বিউবো ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)-এর উদ্যোগে গঠিত দুটি তদন্ত কমিটির সদস্যরা বুধবার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন বিউবো সূত্র জানিয়েছে। এ নিয়ে তারা কুমারগাঁও বিদ্যুৎ কেন্দ্রে দায়িত্বরতদের পাশাপাশি সিলেট বিদ্যুৎ বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। 

এছাড়া, বিদ্যুত মন্ত্রণালয়ের একটি টিমও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। বিউবো’র সদস্যকে (পাওয়ার জেনারেশন) প্রধান করে একটি এবং পিজিসিবি’র প্রধান প্রকৌশলী ইকবাল আজমের নেতৃত্বে আরেকটি তদন্ত কমিটি মঙ্গলবার গঠন করা হয়। কমিটিতে তিন কার্যদিবসের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। 


 নগরীতে পানির সংকট 

বিদ্যুৎ না থাকায় নগরীতে দেখা দিয়েছে পানির সংকট। অনেকের মোবাইল ফোনের চার্জ ফুরিয়ে গেছে। বন্ধ হয়ে পড়ায় রেফ্রিজারেটরে নষ্ট হচ্ছে পচনশীল খাদ্য সামগ্রী। নেটওয়ার্ক না থাকায় মোবাইল ফোন যোগাযোগও বিঘ্ন ঘটছে, গতি কমেছে ইন্টারনেটেরও।

বিদ্যুত না থাকার কারণে মঙ্গলবার বেলা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহরের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যায়। আর সড়ক বাতি বন্ধ থাকায় রাতে পুরো নগরে ভূতুড়ে পরিবেশ বিরাজ করছে। বুধবার বিকাল ৪টায় নগরের বিদ্যুত সরবরাহ সচল হয়নি। পানি সংগ্রহ করতে জনসাধারণ ছুটছেন দূর-দূরান্তে নলকূপের খোঁজে। আবার অনেকেই ভিড় করছেন দোকানে দোকানেও।

নগরীর সুবিদবাজার বন কলাপাড়ার বাসিন্দা, গোয়াইনঘাট উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল হাকিম চৌধুরী জানান, মঙ্গলবার থেকে তার বাসায় পানির সংকট। বুধবার বাসায় হাত-মুখ ধোয়ারও পানি ছিল না। ফ্রিজের জিনিসপত্র নষ্ট হচ্ছে। মোবাইলও চার্জ করা যাচ্ছে না। 

নগরের কালিবাড়ী এলাকার বাসিন্দা কানন চন্দ বলেন, মঙ্গলবার দুপুর থেকে বিদ্যুত নেই। তার বাসার পানি শেষ হয়েছে সন্ধ্যায়। দীর্ঘ সময় ধরে রেফ্রিজারেটরও বন্ধ রয়েছে; ফলে নষ্ট হচ্ছে মাছ, মাংসসহ পচনশীল দ্রব্যসামগ্রী। মঙ্গলবার সাড়ে ৮টার পর থেকে তাদের ঘরে কোন আলো জ্বলছে না বলেও জানান তিনি।

সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী আলী আকবর বলেন, পানি বিতরণ ব্যবস্থা পুরোটাই বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। সাম্প্রতিককালে নগরীতে এ রকম বিপর্যয় দেখা যায়নি। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্বাভাবিক না হলে পানির সরবরাহ স্বাভাবিক হবে না। 


মোমবাতির দাম দ্বিগুণ

সিলেটে বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের পর মোমবাতির দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে। সিএনজি অটোরিক্সা চালক এখলাছ মিয়া জানান, বুধবার তিনি একটি মোমবাতি ১০ টাকায় কিনেছেন। এর আগে এ ধরনের একটি মোমবাতি তিনি ৫ টাকায় কিনেছেন। 

নগরীর বন্দরবাজারের মুদি দোকানী আলী হোসেন বলেন, বিদ্যুৎ নির্ভর নগরজীবনে এতদিন মোমবাতির কদর বোঝা যায়নি। কিন্তু, মঙ্গলবার থেকে মোমবাতির কদর বোঝা যাচ্ছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অপ্রতুল থাকায়  মোমবাতির দাম বেড়ে গেছে বলে জানান তিনি। 

এদিকে, মোমবাতি ছাড়া কিছু কিছু নগরবাসীকে জেনারেটর, আইপিএস ব্যবহার করতে হচ্ছে। বেশিক্ষণ ব্যবহারের কারণে জেনারেটরের জ্বালানিও ফুরিয়ে যাচ্ছে। 

 প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মঙ্গলবার সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে ১৩২/৩৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অভ্যন্তরে হঠাৎ কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া উঠতে থাকে। বেলা ১১টা ১০ মিনিটে হঠাৎ বিকট শব্দ করে আগুন ছড়িয়ে পড়ে বিদ্যুতের গ্রিডে। সর্বশেষ ৩৩ কেভি বাজবারে আগুন ধরে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সাতটি ইউনিট ও বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজনের প্রায় দেড় ঘণ্টার চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। আগুন নেভাতে গিয়ে জয়ন্ত কুমার নামে দমকলবাহিনীর এক সদস্য দগ্ধ হন। তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

 বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, তাদের প্রায় ৪ লাখ ৩০ হাজার গ্রাহক রয়েছেন। বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে ৩ লক্ষাধিক গ্রাহক দুর্ভোগে পড়েছেন।  

 

 

About

Popular Links