Thursday, May 23, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

‘সবাই জানে আমি মন্ত্রীর ভাই, খাই-দাই, নামাজ পড়ি...’

তবে নদী ভরাট করে বালু পরিবহনের রাস্তা তৈরির কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘এখন নদী নাই। জমিতে (জেগে ওঠা চরে) যাওয়ার জন্য রাস্তা করা হইছে’

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০২০, ০৯:২৮ পিএম

গ্রীষ্ম, বর্ষা কিংবা শীত। প্রত্যেক মৌসুমে ব্রহ্মপুত্রের বুকে ক্ষত সৃষ্টি করে বালু উত্তোলন করেন আওয়ামী লীগ নেতা সুরুজ্জামাল হোসেন। ড্রেজার ধ্বংস, জরিমানা কিংবা মুসলেকা- কোনও কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না তাকে। নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে বিক্রি করছেন দেদারছে। 

কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলা আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক সুরুজ্জামালের অবৈধ বালু উত্তোলনের এই ধর্মহীন কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ এলাকাবাসী। অবৈধ বালু উত্তোলন করায় নদীর ভাঙন তীব্র হয়ে তীরবর্তী মানুষের শত শত হেক্টর ফসলি জমি, বসতবাড়ি, স্কুল, মসজিদ,  বেড়িবাঁধের একাংশ নদীর গর্ভে বিলিন হলেও এই কাণ্ডজ্ঞানহীন বালু ব্যবসার লোভ সংবরণ করতে পারছেন না তিনি। এ বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন আওয়ামী লীগের যাদুরচর ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ড শাখা সভাপতি আব্দুল খালেক। কিন্তু কিছুতেই প্রতিকার হচ্ছে না। বেড়েই চলছে আওয়ামী লীগ নেতার বালুগ্রাসী কর্মকাণ্ড।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি জমি দখলসহ অবৈধ ড্রেজার বসিয়ে ব্রহ্মপুত্রের বিভিন্ন এলাকা থেকে বালু উত্তোলন করেন আওয়ামী লীগ নেতা সুরুজ্জামাল। প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় থাকায় ভয়ে তার অপকর্মের প্রতিবাদ করতে চান না কেউ। অবৈধ বালু ব্যবসার ভিত্তি শক্ত করতে তিনি গড়ে তুলেছেন “ড্রেজার মালিক সমিতি”। সেই সমিতির সভাপতিও তিনি। আর তার বালু সাম্রাজ্যের সেনাপতি তার দুই ছেলে আব্দুল আজিজ ও আব্দুল আলীম।

ড্রেজার মালিক সমিতির সহ-সভাপতি বানিজ মেম্বার জানান, যাদুরচর ইউনিয়নে মোট ৪২টি ড্রেজার মেশিন রয়েছে। এগুলোর মালিকদের নিয়ে গঠন করা হয়েছে “ড্রেজার মালিক সমিতি”। এ সমিতির সভাপতি উপজেলা আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক সুরুজ্জামাল হোসেন।

গত সেপ্টেম্বরে সুরুজ্জামালের বালু সাম্রাজ্যে হানা দেয় ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স (এনএসআই) ও উপজেলা প্রশাসনের যৌথ ভ্রাম্যমাণ আদালত। ঘটনাস্থলে থাকা দুই ছেলে আটকের খবরে ছুটে যান সুরুজ্জামাল। ভ্রাম্যমাণ আদালতের সাথে বাকবিতণ্ডায় জাড়ান এই নেতা। শেষে তিন দিনের মধ্যে ড্রেজার ও বালু উত্তোলনের যাবতীয় কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখার মুচলেকায় তাৎক্ষণিক রেহাই পান বাবা ও দুই ছেলে। কিন্তু তিন দিনের সময় গড়িয়ে তিন মাস পার হলেও বালু উত্তোলন বন্ধ করা দূরের কথা ড্রেজার সংখ্যা বাড়িয়ে দেদারছে বালু উত্তোলন করে চলছেন বালুখেকো খ্যাত সুরুজ্জামাল। উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদের বামতীরের ধনারচর নতুনগ্রাম ও ধনারচর চরেরগ্রাম নামক এলাকায় পাশাপাশি ৮টি ড্রেজার মেশিন দিয়ে অবাধে বালু উত্তোলন করে চলেছেন তিনি।

ব্রহ্মপুত্র নদীতে একাই ৮টি ড্রেজার বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছেন সুরুজ্জামাল হোসেন। <strong>ঢাকা ট্রিবিউন</strong>

ধনারচর চরেরগ্রাম থেকে কর্তিমারী নৌকা ঘাট এলাকায় ব্রহ্মপুত্র তীরে গিয়ে দেখা যায়, নদীর মধ্যে সারি সারি ড্রেজার মেশিন বসানো। কর্তিমারী নৌকা ঘাট এলাকায় দুটি ড্রেজার মেশিন বসিয়ে ব্রহ্মপুত্রের প্রবাহ আটকে নদীর মাঝ দিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে সড়ক। নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে তা কাকড়া গাড়ি (ছোট ট্রাক্টর) দিয়ে পরিবহনের জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে এই সড়ক। এতে সুরুজ্জামালের সহযোগী স্থানীয় আরও কয়েকজন বালু ব্যবসায়ী রয়েছেন।

স্থানীয়রা জানায়, ড্রেজারগুলোর মালিক আওয়ামী লীগ নেতা সুরজ্জামাল। সুরুজ্জামালের বালুগ্রাসী ভূমিকায় অতিষ্ট স্থানীয় জনগণ। এলাকায় মামলাবাজ, ভয়ঙ্কর লোক হিসেবে বেশি পরিচিত। তিনি ও তার পরিবারের লোকজন সরকারি দলের নাম ভাঙিয়ে এলাকায় নানা অপকর্ম করলেও তার অনিষ্টের ভয়ে কেউ তার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পায় না। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় প্রশাসনকেও ম্যানেজ করেন তিনি।

সম্প্রতি (১৩ ডিসেম্বর) সুরুজ্জামালের অবৈধ বালু উত্তোলনের প্রতিকার চেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন যাদুরচর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ১নং ওয়ার্ড শাখা সভাপতি আব্দুল খালেক।

আব্দুল খালেক জানান, সুরুজ্জামাল ও তার সহযোগী বালু ব্যবসায়ীদের অবৈধ ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনে নদীর ভাঙন বৃদ্ধি পেয়ে স্থানীয়রা বসতবাড়িসহ আবাদি জমি ও বিভিন্ন স্থাপনা হারালেও এর কোনও প্রতিকার মিলছে না। অভিযোগ দেওয়ার প্রায় দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় পার হলেও প্রভাবশালী এই নেতার বালু উত্তোলন বন্ধে কোনও ব্যবস্থা নেয়নি স্থানীয় প্রশাসন। উল্টো সুরুজ্জামালের লোকজন তাকেই শাসাচ্ছেন।

নদীতে বাঁধ দিয়ে বালু পরিবহনের রাস্তা বানাচ্ছেন আওয়ামী লীগ নেতা সুরুজ্জামাল হোসেন। <strong>ঢাকা ট্রিবিউন</strong>

একই ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “এলাকায় ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনে এলাকাবাসী অতিষ্ট হয়ে পড়েছে। আমরা বারবার অভিযোগ করেও কোনও ফল পাচ্ছি না। আমার মনে হয় এখানে স্থানীয় সংবাদকর্মীরাসহ প্রশাসনও ম্যানেজ হয়ে গেছে।”

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগ নেতা সুরুজ্জামাল হোসেন নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “এটা আমার বিরোধী পক্ষের কাজ। আমি এবার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশ নিতে চেয়েছি বলে আমার বিরুদ্ধে বানোয়াট অভিযোগ করছে।”

নিজের ছেলেদের বালু ব্যবসার কথা স্বীকার করে আওয়ামী লীগেরএ নেতা বলেন, “আপনি এলাকায় এসে দেখেন শুধু আমার ছেলেরা ব্যবসা করে নাকি এলাকার অনেকে করছে? আপনার খরচ আমি দেব। নদীতে আমার রেকর্ডকৃত জমি আছে। সেই জমি থেকে ছেলেরা বালু উত্তোলন করে। সবাই জানে আমি মন্ত্রীর (প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেনের) ভাই, আমি খাই-দাই নামাজ পড়ি। আমি কোনও ব্যবসা করি না।”

তবে নদী ভরাট করে বালু পরিবহনের রাস্তা তৈরির কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, “এখন নদী নাই। জমিতে (জেগে ওঠা চরে) যাওয়ার জন্য রাস্তা করা হইছে।”

সাম্প্রতিক সময়ে উপজেলায় অবৈধ ড্রেজার ব্যবহার করে বালু উত্তোলনকারীদের দৌরাত্ম বেড়ে গেছে জানিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আল ইমরান বলেন, “বিষয়টি আমরা আমলে নিয়েছি। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে ইতোমধ্যে সহকারি কমিশনারকে (ভূমি) নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। খুব শিঘ্রই অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

About

Popular Links