Thursday, May 23, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ফিরে দেখা ২০২০: রোহিঙ্গাদের জন্য যন্ত্রণার আরও এক বছর

জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক শরণার্থী সংস্থা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হলোকাস্ট মেমোরিয়াল মিউজিয়াম এবং খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, প্রায় তিন বছর আগে মিয়ানমারের সেনারা রোহিঙ্গাদের লক্ষ্য করে হত্যা এবং ধর্ষণ ও নির্যাতন চালিয়েছে

আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর ২০২০, ০৫:০৪ পিএম

মানুষ স্বপ্ন নিয়ে বাঁচে। রোহিঙ্গা শরণার্থীরাও স্বপ্ন দেখেছিল ২০২০ সালে মর্যাদার সাথে তাদের নিজ মাতৃভূমি মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের। কিন্তু তাদের স্বপ্ন পূরণ হয়নি। সামনে আবারও নতুন একটি বছর, আবারও স্বপ্ন দেখছেন তারা।

বিদায়ী বছরে কোভিড-১৯ মহামারি ও মিয়ানমারে সাধারণ নির্বাচনের কারণে প্রত্যবাসন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। নতুন বছর ২০২১ সালে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে নতুন আলোচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের জন্মস্থান মিয়ানমারের রাখাইনে প্রত্যবাসনের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান রয়েছে বলে মনে করে বিশ্বের বড় দেশগুলো।

জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক শরণার্থী সংস্থা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হলোকাস্ট মেমোরিয়াল মিউজিয়াম এবং খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন মতে, প্রায় তিন বছর আগে মিয়ানমারের সেনারা রোহিঙ্গাদের লক্ষ্য করে হত্যা এবং ধর্ষণ ও নির্যাতন চালিয়েছে এবং তাদের বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে দিয়েছে।

সে সময় নির্যাতনের শিকার হয়ে আট লাখেও বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে প্রতিবেশী বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে প্রবেশ করে। বাংলাদেশ সরকারও মানবিক কারণ দেখিয়ে তাদের আশ্রয় দেয়। তবে অতীতেও বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে আসাসহ বাংলাদেশ বর্তমানে ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে।

যোগাযোগ করা হলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন বলেন, চলতি বছরের জানুয়ারিতে মিয়ানমারের সাথে আমাদের সর্বশেষ আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছিল। মিয়ানমার যাচাই-বাছাই শেষে তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে রাজি হলেও কোনো রোহিঙ্গা সেখানে ফিরতে চাইনি। এতে মিয়ানমার পক্ষ থেকে আন্তরিকতার অভাব রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা তাদের সরকারের উপর আস্থা রাখে না। তবে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের মনে বিশ্বাস তৈরি করতে বেশ কয়েকটি প্রস্তাব দিলেও মিয়ানমার ওই প্রস্তব নিয়ে কোনো কথা বলেনি এবং কার্যকর কোনো পদক্ষেপও নেয়নি।

রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য বাংলাদেশ একাধিক উপায়ে- দ্বিপক্ষীয়, বহুপক্ষীয়, ত্রি-পার্শ্ববর্তী ও বিচার ব্যবস্থা মাধ্যমে চেষ্টা করে যাচ্ছে।

ড. মোমেন বলেন, “মিয়ানমার বন্ধুত্বপূর্ণ দেশ। তারা আমাদের শত্রু নয়। আমরা মিয়ানমারের বিপক্ষে কিছুই করিনি। বাংলাদেশ মিয়ানমারে নিরাপদে ও সুরক্ষায় প্রত্যাবাসন দেখতে চায়।এজন্য তাদেরকে অবশ্যই একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে।”

বাংলাদেশ মিয়ানমারের বন্ধু দেশ- জাপান, চীন, রাশিয়া, ভারত এবং আসিয়ান দেশগুলো থেকে অ-সামরিক বেসামরিক পর্যবেক্ষক মোতায়েনের প্রস্তাবও করেছিল।

“মিয়ানমার সেই প্রস্তাবে হ্যাঁও বলেনি আবার নাও বলেনি’ উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের সাথে মতবিনিময় করার জন্য কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে রাখাইন ও মিয়ানমারের সরকারি কর্মকর্তাদের রোহিঙ্গা নেতাদের সফরের প্রস্তাবও করেছে বাংলাদেশ।”

এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গাদের মনে আত্মবিশ্বাস বাড়বে এবং বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রত্যক্ষ করা উল্লেখ করে মোমেন বলেন, তাদের অবশ্যই দেশে (মিয়ানমার) ফিরে যেতে হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে ড. মোমেন বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র সমাধন হলো তাদের প্রত্যাবাসন। এক্ষেত্রে সব দেশ একমত হয়েছে। রোহিঙ্গাদের প্রত্যবাসন বিলম্ব হলে এ অঞ্চলে ও তার বাইরে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি সম্প্রতি বলেছেন, জাপান রোহিঙ্গাদের রাখাইন রাজ্যে তাদের মাতৃভূমিতে প্রত্যাবাসন সমর্থন করে এবং পরের বছর এই প্রক্রিয়া শুরু হতে চায়।

ড. মোমেন বলেন, মিয়ানমারে জাপানের বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে এবং মিয়ানমারের উপরেও তাদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এজন্য প্রতব্যাসন ইস্যুতে জাপানের সহায়তা চাওয়া হয়েছে।

রাষ্ট্রদূত নওকি বলেছেন, তারা রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে মিয়ানমারের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের সাথে এবং সরকারি পর্যায়ে সরাসরি যোগাযোগ করছে। কারণ তারা যথাযথ পর্যায়ে যথাযথ ভূমিকা রাখতে চায়।

এদিকে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, দ্রুত এবং টেকসই প্রত্যাবর্তনের গুরুত্বের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হিসাবে নির্বাচিত হওয়ার জন্য ভারতকে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভারতকে সহায়তা করার জন্য বাংলাদেশের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানের জন্য বাংলাদেশ চীন ও মিয়ানমারের সাথে ত্রিপক্ষীয়ভাবে আলোচনা করছে।

ভাসানচর

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো অতিরিক্ত চাপ, ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ এবং ভূমিধস এবং অন্যান্য অনিয়ন্ত্রিত ঘটনার ফলে যেকোনো ধরনের ঝুঁকি এড়াতে বাংলাদেশ সরকার পর্যায়ক্রমে এক লাখ রোহিঙ্গাকে ভাসান চরে স্থানান্তরিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

পরিকল্পনা অনুসারে, কক্সবাজার থেকে প্রথম দফায় গত ৪ ডিসেম্বর ১ হাজার ৬৪২ এবং দ্বিতীয় দফায় গত ২৯ ডিসেম্বর ১ হাজার ৮০৪ জন রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে নেয়া হয়।

রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করা ভাসানচর দ্বীপটি ৩০ বছরের পুরোনো এবং নিরাপদ উল্লেখ করে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সেখানে রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক স্থানান্তর করা হয়নি, দ্বীপটিতে বসবাসের উপযোগী সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে।

ভাসানচরে স্বাস্থ্যসেবা, পানীয় জলের ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ এবং ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রসহ বিভিন্ন সুবিধার কথা উল্লেখ করে বুধবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়, “সেখানে যারা যাচ্ছেন তাদের এমন সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য বল প্রয়োগ, ভয় দেখানো বা অর্থের ব্যবহারের কোনো প্রশ্নই আসে না।”

দ্বীপটিতে রোহিঙ্গাদের অবাধ চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রয়েছে উল্লেখ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও বলছে, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) ইতিমধ্যে ভাসানচর ও নোয়াখালীর মধ্যে নিয়মিত সমুদ্র-ট্রাক পরিষেবা চালু করেছে।

বাংলাদেশ বলছে, রোহিঙ্গাদের নিয়ে সৃষ্ট সংকট মিয়ানমার তৈরি করেছে এবং এর সমাধান সম্পূর্ণ মিয়ানমারের মধ্যেই রয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, বাংলাদেশের ওপর অহেতুক ও অযৌক্তিক চাপ প্রয়োগের পরিবর্তে জাতিসংঘ/এনজিওগুলো/ আন্তর্জাতিক মানবতাবাদী ও মানবাধিকার সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা বংশ পরম্পরা ধরে যে বিপর্যস্ত মানবাধিকার লঙ্ঘনের মুখোমুখি হচ্ছে সেদিকে মনোনিবেশ করতে হবে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জাতিসংঘকে রোহিঙ্গাদের বর্তমান পরিস্থিতি দেখার জন্য মিয়ানমারে একটি কারিগরি ও সুরক্ষা মূল্যায়ন দল প্রেরণ এবং সেখানে প্রত্যাবাসনের প্রস্তুতিও পরিদর্শনে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, “এটি মনে রাখা উচিত যে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক। শুধু মানবিক কারণ থেকে বাংলাদেশ অস্থায়ী ভিত্তিতে তাদের আশ্রয় দিয়ে আসছে।”

“রোহিঙ্গারাও তাদের স্বদেশ মিয়ানমারে ফিরে যেতে চায় এবং সে লক্ষ্যে সকলকে গঠনমূলকভাবে কাজ করা দরকার,” বলছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

তারা আরও বলছে, “মিয়ানমারের নির্বাচন এখন শেষ হয়ে গেছে। আমরা মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত ও নিপীড়িত নাগরিকদের তাদের স্বদেশে দ্রুততার সাথে প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের সাথে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃশ্যমান কর্মতৎপরতার প্রত্যাশায় রয়েছি।”

About

Popular Links