Sunday, May 19, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

আলো ছড়াচ্ছে দিনমজুর জয়নালের গ্রাম পাঠাগার

জয়নালের পাঠাগারে বই পড়ে উপকৃত হচ্ছেন গ্রামের শিক্ষার্থী ও শিশু কিশোররা। তারা জয়নালের এমন উদ্যোগে অনুপ্রাণিত

আপডেট : ০২ মার্চ ২০২১, ০৮:০৪ পিএম

আলো ছড়াচ্ছে দিনমজুর জয়নালের গ্রাম পাঠাগার "সাতভিটা গ্রন্থনীড়"। গ্রাম পাঠাগারের উদ্যোক্তা জয়নালের বাড়ি কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের সাতভিটা গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের মৃত কাশেম আলীর ছেলে। 

জেলা শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে প্রত্যন্ত এই গ্রামে ২০১৫ সালে শ’ খানেক বই নিয়ে নিজ বাড়িতে পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেন জয়নাল। শুরুটা বন্ধুর হলেও প্রত্যন্ত একটি অঞ্চলে পাঠাগার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়ায় প্রশংসা কুড়াচ্ছেন দিনমজুর উদ্যোক্তা জয়নাল আলী।

পেশায় দিনমজুর জয়নাল আলী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় প্রাথমিকের গন্ডি পেরুতে পারেননি। আর্থিক অনটনে বিদ্যালয় ছেড়ে শ্রম বিক্রি করে সংসারের হাল ধরেন সেই শিশু বয়সেই। কিন্তু পড়াশোনার প্রতি আগ্রহে ভাটা পড়েনি তাতে। নিজের প্রচেষ্টায় বই পড়ে পড়ে স্বশিক্ষিত হন তিনি। আর শিক্ষা ও বইয়ের প্রতি এই আগ্রহ ও ভালোবাসা থেকে গ্রামের ছেলেমেয়েদের জন্য তিনি তৈরি করেছেন গ্রাম পাঠাগার “সাতভিটা গ্রন্থনীড়”।  

পাঠাগার প্রতিষ্ঠার শুরুর গল্প বলতে গিয়ে জয়নাল আলী জানান, দিনমজুরের কাজ করে রোজগারের টাকার কিছু কিছু জমিয়ে ২০১৫ সালের দিকে প্রায় ১০০ বই নিয়ে নিজ বাড়িতে গড়ে তোলেন তার শখের পাঠাগার। গ্রাম অঞ্চলে পাঠক জোগাড়  করতে ছুটতে হয়েছিল শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি। বই পড়ার আগ্রহ তৈরি করতে কখনও কখনও শিক্ষার্থীদের বাড়ি গিয়ে বই সরবরাহ করতে হতো বলেও জানান তিনি।

জয়নাল বলেন, “বইয়ের প্রতি ভালোবাসা আর গ্রামের শিশু কিশোরসহ সব শ্রেণির মানুষের জন্য বুদ্ধিভিত্তিক জ্ঞান চর্চার সুযোগ সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই পাঠাগার স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।” 

বর্তমানে জয়নালের গ্রন্থনীড় পাঠাগার পাঁচ শতাধিক বইয়ে সমৃদ্ধ। বসতবাড়ি থেকে বর্তমানে নতুন কেনা জমিতে নতুন ঘরে পাঠাগার স্থানান্তরিত করেছেন জয়নাল। 

জয়নালের পাঠাগারে বই পড়ে উপকৃত হচ্ছেন গ্রামের শিক্ষার্থী ও শিশু কিশোররা। তারা জয়নালের এমন উদ্যোগে অনুপ্রাণিত। 

স্থানীয় যুবক পলাশ চন্দ্র সরকার বলেন,  “প্রায় চার মাস থেকে আমি এই পাঠাগারের সাথে সম্পৃক্ত। আমরা অত্যন্ত গর্বিত যে জয়নাল ভাইয়ের মতো বই প্রেমি যুবক আমাদের গ্রামে আছে।”

সাতভিটা  বিশেষ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থী ও পাঠাগারের পাঠক আম্বিয়া আক্তার মিম বলেন, "আমরা স্কুলের বই পড়ার পাশাপাশি অনেক ধরনের বই পড়তে পারছি। জয়নাল ভাই আমাদের বাড়ি থেকে ডেকে এনে বই পড়ান।"

২৮ ফেব্রুয়ারি বিকালে জয়নালের গ্রন্থনীড় পাঠাগারের নতুন ভবন উদ্ধোধন ও সেরা পাঠককে পুরষ্কৃত করা হয়। সে উপলক্ষে জয়নালের উদ্যোগকে সমর্থন এবং তাকে অনুপ্রাণিত করতে জেলা শহর থেকে ছুটে যান শিক্ষক, লাইব্রেরিয়ান,সাংবাদিক ও সমাজকর্মীরা।

সমাজকর্মী সুব্রতা রায় বলেন, “লাইব্রেরিগুলো গ্রামেই হওয়া উচিৎ। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে পড়াশোনা খুবই জরুরি। শিশু কিশোরসহ শিক্ষার্থীরা বইকে বন্ধু করতে পারলে সমাজটাই পাল্টে যাবে।” 

শিক্ষক ও সাংবাদিক আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, “ইন্টারনেট ভিত্তিক পড়াশোনার থেকে পুস্তকভিত্তিক পড়াশোনার গুরুত্ব বেশি যা এই পাঠাগারে সম্ভব। জয়নালের এই উদ্যোগকে আমরা স্বানন্দে স্বাগত জানাই।” 

জয়নাল আলির পাঠাগার পরিদর্শনে যাওয়া কুড়িগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক  সুশান্ত বর্মন বলেন, “আমাদের সব ধরনের আগ্রহ ও সহযোগিতা থাকবে এই পাঠাগারটিকে সমৃদ্ধ করার জন্য। পাঠক পাঠাগারের প্রাণ। তাদের পাঠাগারে আনতে পারাটা একটা বড় অর্জন। জয়নাল বাড়ি বাড়ি গিয়ে পাঠক সংগ্রহ করছেন যা এই উদ্যোগকে সফল করবে বলে আমি মনে করি।” 

জয়নালের পাঠাগার তার গ্রামসহ আশেপাশের গ্রামগুলোতে জ্ঞানের আলো ছড়াবে এই প্রত্যাশা সবার।

About

Popular Links