Monday, May 20, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

১৯ মার্চ ১৯৭১: গাজীপুরে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ

জয়দেবপুরে পাক হানাদারদের সঙ্গে এ সম্মুখ যুদ্ধে সারাদেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। সমগ্র বাংলাদেশে স্লোগান ছিল ‘জয়দেবপুরের পথ ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২১, ১২:৪৮ পিএম

১৯৭১ সনের ১৯ মার্চ। দেশ যখন অসহযোগ আন্দোলনে উত্তাল তখন গাজীপুরের শান্তিকামী জনতা স্বাধীনতার জন্য পাক হানাদারদের মুখোমুখি হয়ে প্রতিরোধ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। 

গাজীপুরের তৎকালীন নাম ছিল জয়দেবপুর। ১৯৭১ সালে জয়দেবপুর সেনানিবাসের ভাওয়াল রাজবাড়ীতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর দ্বিতয় ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট কার্যালয় ছিল। সেখানে ২৫-৩০ জন ছাড়া সবাই ছিলেন বাঙালি সেনা কর্মকর্তা। পাকিস্তানিরা বাঙালি দমনের নীল নক্সা অনুযায়ী ১৫ মার্চের মধ্যে অস্ত্র জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়। 

বাঙালি সৈন্যরা রাজি না হলে ১৯ মার্চ সকালে ঢাকা ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব অস্ত্র ও  গোলা বারুদ নিতে জয়দেবপুর সেনানিবাসে আসেন। এ খবর জানাজানি হলে গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে জনতা, লাঠি, তীর-ধনুক নিয়ে জয়দেবপুর বটতলায় জড়ো হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ওই প্রতিরোধযুদ্ধে মনু খলিফা, কিশোর নিয়ামত, ফুটবলার হুরমত আলী ও কানু মিয়া শহীদ হন। আহত হন আরও অনেকে। জয়দেবপুরে পাক হানাদারদের সঙ্গে এ সম্মুখ যুদ্ধে সারাদেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। সমগ্র বাংলাদেশে স্লোগান ছিল “জয়দেবপুরের পথ ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর”। 

১৯৭১ সনের ১৯ মার্চ জয়দেবপুর থেকে অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে যাওয়ার সময় ছাত্র-জনতার প্রতিরোধ ঘটনার বর্ণনা দেন প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রতিরোধে অংশ নেয়া মো. নুরুজ্জামান আকন্দ। তিনি তৎকালীন গাজীপুরের ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ছিলেন। 

ওই দিনের লোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি জানান, বেলা আনুমানিক ১১টার দিকে রাণী বিলাসমনি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা চান্দনা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে জয়দেবপুর থেকে পাক বাহিনীর অস্ত্র নিয়ে যাওয়ার ঘটনা জানায়। পরে ওই দুই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ আশপাশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি আসে। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সংবাদ পেয়ে ভিপি আসকর আলী সরকার, মাইরাল চেয়ারম্যানের ছেলে দেলোয়ার হোসেন, ছাত্রনেতা নিয়ত আলী ওরফে আমজাদসহ তারা সকল নেতাকর্মী, শিক্ষার্থী একযোগে জয়দেবপুরের উদ্দেশে রওয়ানা হন। ততক্ষণে পাক বাহিনী অস্ত্র-গোলাবারুদ নিয়ে রাজবাড়ি ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে পড়ে। 

অস্ত্রসহ কমপক্ষে ১৫টি জীপ গাড়তে করে দুপুর আনুমানিক ১টার দিকে পাক বাহিনীর সদস্যরা রাজবাড়ি থেকে বের হয়। ওইসব নেতাকর্মী শিক্ষার্থীরা রাজবাড়ি সড়কের বর্তমান পোস্ট অফিসের সামনে অবস্থান নেয়। প্রতিরোধের মুখে পড়ে পাক হানাদার বাহিনী। দুই পক্ষের মধ্যে দূরত্ব ছিল আনুমানিক ৫’শ ফুট। পাক বাহিনীর কয়েকজন বাঙালি জোয়ান বাংলা ভাষায় ছাত্র-জনতাকে সড়ক থেকে অবরোধ তুলে নিতে অনুরোধ করে। 

ছাত্র-জনতা অবরোধে অনড় থাকলে পাক বাহিনীর সদস্যরা গুলি চালাতে বাধ্য হবে বলে ঘোষণা দেয়। এক পর্যায়ে একটি বাঁশির আওয়াজ শোনা যায়। তাৎক্ষণিক পাক বাহিনীর সদস্যরা গাড়ি থেকে লাফিয়ে নেমে অবরোধকারীদের লক্ষ্য করে সড়কের দুই পাশে অস্ত্র তাক করে অবস্থান নেয়। এবারও অবরোধ তুলে নিতে অনুরোধ করে। কিছুক্ষণ পর আবারও আরেকটি বাঁশির আওয়াজ হওয়ার সাথে সাথে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর মুহুর্মুহু গুলি ছোঁড়ে পাক বাহিনীর সদস্যরা।                                                        

স্বাধীনতার রক্তাক্ত ইতিহাসের এ দিনটি গাজীপুর তথা দেশবাসীর নিকট একটি গৌরবময় দিন। দিনটিকে জাতীয়ভাবে পালনসহ সেদিন নিহত শহীদ পরিবারদের সদস্যদের আর্থিক সহায়তা দেয়ার দাবি করছে স্থানীয় এলাকাবাসী ও নিহতের স্বজনরা। 

শহীদ নিয়ামতের ভাই কেরামত আলীর অভিযোগ, “স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও তাদের দৈন্য দশা কাটেনি। এখনও টিকে আছে শহীদ নিয়ামত আলীর রেখে যাওয়া মাটির ঘর।” 

তৎকালীন মুক্তি সংগ্রাম পরিষদের সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে সাংবাদিকদের বলেন, “বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সেদিন বীর বাঙালি পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করে। কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পরও দিনটিকে জাতীয় ভাবে পালন করা হচ্ছে না।”  

বীরত্বগাঁথা সে দিনটিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পালনের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদের কাছে জোর দাবি করে শহীদ পরিবারের সদস্যদের যথাযথ সম্মান দেয়ার আহবান জানান তিনি।

শহীদ পরিবারের লোকজন জানান, স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও শহীদদের স্বজনদের দিন কাটছে নানা কষ্টে। শহীদ পরিবারের নামে বরাদ্দ করা জমি, সুবিধাদি দেয়াসহ তাদের রয়েছে নানা দাবি। অবশ্য ১৯ মার্চের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে চান্দনা চৌরাস্তায় নির্মাণ করা হয়েছে স্মারক ভাস্কর্য “জাগ্রত চৌরঙ্গী” এবং জয়দেবপুর বটতলায় “মুক্তমঞ্চ”। প্রতি বছর পরম শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় গাজীপুরবাসী এ দিনটি উদযাপন করেন। এবারও রয়েছে নানা আয়োজন।

এ ব্যাপারে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, “১৯ মার্চ জাতির জন্য ঐতিহাসিক একটি দিন। দিবসটি জাতীয়ভাবে পালনের জন্য বিভিন্ন মহল থেকে দাবি ওঠেছে, ভবিষ্যতে এটি জাতীয়ভাবে পালনের যেন স্বীকৃতি পেতে পারে সে চেষ্টা চলছে।”

About

Popular Links