Sunday, May 19, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

সিলেটে আইসিইউ বেডের জন্য কান্না

রোগীর স্বজনরা সিলেট স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক থেকে শুরু করে যোগাযোগ করছেন অনেক বেসরকারি হাসপাতালে, কোনভাবেই মিলছে না আইসিইউ বেড

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২১, ০৭:১৮ পিএম

নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র আইসিইউ (ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট) বেডের জন্য কান্না চলছে সিলেটে। কোনভাবেই মিলছে না আইসিইউ বেড। এ নিয়ে চিন্তিত চিকিৎসকদের পাশাপাশি রোগীর স্বজনরা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপনের ওপর জোর দিচ্ছেন।

বুধবার (২৮ জুলাই) রাত থেকে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার মনির উদ্দিন নামের এক রোগীর আইসিইউ বেডের প্রয়োজন পড়ে। রোগীর স্বজনরা সিলেট স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক থেকে শুরু করে যোগাযোগ করেন অনেক বেসরকারি হাসপাতালে। কিন্তু, কোথাও সিটের সংস্থান হচ্ছিল না। দুপুর পৌনে ১ টার দিকে একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউ ইনচার্জ লিখে রাখেন ওই রোগীর নাম। বেলা দেড়টার দিকে যোগাড় হয় একটি বেড। ততক্ষণে রোগীর অক্সিজেন স্যাচুরেশন নেমে আসে ৩৫-এ। দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সযোগে রোগীকে নেওয়া হয় হাসপাতালে। কোভিড ইউনিটে নেয়ার পথে হাসপাতালের লিফটেই মারা যান ওই রোগী।

হবিগঞ্জের একই পরিবারের মা, ছেলে ও ছেলের বৌ (স্ত্রী) কোভিডে আক্রান্ত হন। প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য ১২ দিন আগে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি হলে একদিনের মধ্যেই প্রয়োজন পড়ে উন্নত চিকিৎসার। সে অনুযায়ী তারা আসেন সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কিন্তু, বেড না পেয়ে তিনজনকেই স্থান করে নিতে হয় মেঝেতে। এই তিনজন রোগীকে দেখভালের জন্য সার্বক্ষণিক ছিলেন তাদের স্বজনরা।

ভর্তির ৪ দিন পর ছেলের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় আইসিইউ বেডের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বেড খালি না থাকায় দেয়া যাচ্ছিল না সেই সেবা। ৩ দিন অপেক্ষার পর একটি বেড খালি হওয়া সাপেক্ষে তাকে নেওয়া হয় সেখানে। এর মাঝেই অবস্থার অবনতি ঘটে ছেলের মায়েরও। তারও আইসিইউ বেডের প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু বেড খালি নেই একটিও।

দেরিতে আইসিইউ বেড পাওয়ার পর ছেলের অবস্থা খারাপের দিকেই চলে যায়। মৃত্যুর সাথে লড়ে ২ দিন আগেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরপারে পাড়ি জমান তিনি। ছেলের মৃত্যুর খবর জানতেন না তার মা। ছেলে যেন বুঝতে পেরেছিলেন মায়ের প্রয়োজনের কথা। তাই নিজের বেডটি খালি করে দিয়ে গেলেন গর্ভধারিণী মায়ের জন্য। তার খালি করে যাওয়া সেই বেডেই মায়ের চিকিৎসা চলে। বর্তমানে মায়ের অবস্থা অনেকটাই ভালো। আইসিইউ বেড ছেড়ে আবার ফিরে আগের জায়গাতেই, পুত্রবধূর পাশে। কিন্তু ছেলে হারানোর শোক তিনি বয়ে বেড়াচ্ছেন দুঃস্বপ্নের মতো। অপরদিকে, ৪ বছরের সংসার জীবন ছেড়ে “দূর আকাশের যাত্রী” হয়ে ওঠা স্বামীকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ তার স্ত্রী।

তাদের সাথে থাকা স্বজনের মুখে শোনা কথাগুলো হার মানায় কোন গল্প বা উপন্যাসকেও। হাসপাতালে ভর্তির আগে থেকে বর্তমান পরিস্থিতি পর্যন্ত এই নিকটজনকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। প্রথমে রোগী ভর্তি, তারপর একের পর এক প্রক্রিয়ায় ছোটাছুটি। নিজের কথা না ভেবে নি:স্বার্থভাবে ছুটছেন তিনি। নিজে অনিয়ম করে হলেও রোগীর খাবার যোগাচ্ছেন। সময় সময় বিভিন্ন ধরনের টেস্ট, টেস্ট পরবর্তী রিপোর্ট সংগ্রহ করা, আনুষঙ্গিক প্রয়োজনে সারাক্ষণই নিজেকে ব্যস্ত রাখছেন। তার উপর নিজে যাতে আক্রান্ত না হন, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হচ্ছে।

নগরীর হাসপাতালগুলোতে রোগীর সংখ্যা এতোটাই বেশি যে, অনিচ্ছা স্বত্তেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে অনেক রোগীকে অন্য হাসপাতালে আইসিইউ বেড-এর খোঁজ নিতে বলছেন। অনেকে বেশি টাকা খরচ করে হলেও একটি বেড চাইছেন। তারপরও মিলছে না বেড।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হবিগঞ্জ থেকে আসা অপর এক স্বজন জানান, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মধ্য বয়সী দিন মজুর রোগীর বেসরকারি হাসপাতালের খরচ চালানো অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার। তারপরও ধার-দেনা করে টাকা এনেছেন সিলেটে চিকিৎসা করাতে। সরকারি হাসপাতালে টানা ৮ দিন চিকিৎসার পর প্রয়োজন পড়ে আইসিইউ বেড-এর। কিন্তু কোথাও বেড খালি পাননি। এখন বাধ্য হয়েই ওসমানী মেডিকেলের মেঝেতে জায়গা পেতে রোগীকে নিয়ে আইসিইউ বেড-খালি হওয়ার অপেক্ষায় আছেন।

তিনি বলেন, "সিলেটের প্রায় সবকটি বেসরকারি হাসপাতালে ইতোমধ্যে খোঁজ নিয়েছেন। কিন্তু কোথাও কোন আইসিইউ বেড খালি পাননি। এর মধ্যে অক্সিজেনের সঙ্কট মোকাবেলায় নিজ খরচে কিনেছেন সিলিন্ডার ও সরঞ্জামাদি।"

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সিলেটে সরকারি বেসরকারি প্রায় ৮শ; কোভিড বেড রয়েছে। সবমিলিয়ে আইসিইউ বেড রয়েছে ১২৭টি। এর মধ্যে সরকারিভাবে ডা. শামসুদ্দীন হাসপাতালে ১৬টি, ওসমানী হাসপাতালে ৮টি এবং মৌলভীবাজার হাসপাতালে ৬টি আইসিইউ বেড রয়েছে। এছাড়া, বেসরকারি হাসপাতালে কোভিড বেড রয়েছে-৯৭টি। কিন্তু বর্তমানে কোথাও বেড খালি নেই।

সিলেট স্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী পরিচালক ডা. নুরে আলম শামীম জানান, আইসিইউ বেড সংকট থাকলেও এইচডিইউ দিয়ে রোগীদের সাপোর্ট দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে গ্রামের মানুষ বেশী আক্রান্ত হচ্ছে, কিন্তু তারা টেস্ট করাচ্ছে না। অবস্থা বেশি খারাপ হলেই তারা জেলা হাসপাতালমুখী হচ্ছে।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, আইসিইউ না থাকলে রোগীদের অক্সিজেন সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার প্রতি জোর দিচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগ। তিনি জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেটে করোনাভােইরাসে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে কোভিড শনাক্ত হয়েছে ৬৬০ জনের শরীরে।

About

Popular Links