Saturday, May 25, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

মেজর সিনহা হত্যা মামলার এক বছর

২০২০ সালের ৬ আগস্ট প্রধান আসামি লিয়াকত আলী ও টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ ৭ পুলিশ সদস্য আদালতে আত্মসমর্পণ করেন

আপডেট : ৩১ জুলাই ২০২১, ০৯:৩২ এএম

সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা মামলার এক বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০২০ সালের ৩১জুলাই শুক্রবার রাতে টেকনাফ থেকে কক্সবাজারের হিমছড়ির একটি রিসোর্টে ফেরারপথে মেরিন ড্রাইভ সড়কের টেকনাফ বাহারছড়াস্থ শামলাপুর পুলিশ তদন্তকেন্দ্রে পুলিশের গুলিতে নিহত হন তিনি।

হত্যাকাণ্ডের দুইদিন পর অর্থাৎ ২০২০ সালের ২ আগস্ট মেজর সিনহা মো: রাশেদ খান হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) মোহাম্মদ মিজানুর রহমানকে আহ্বায়ক করে চার সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি সরেজমিনে তদন্ত করে ঘটনার কারণ ও উৎস অনুসন্ধানের প্রতিবেদন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সুপারিশসহ জমা দেন।

অপরদিকে, হত্যাকান্ডের ৫ দিনের মাথায় অর্থাৎ ৫ আগস্ট পুলিশের গুলিতে নিহত মেজর সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস বাদি হয়ে শামলাপুর পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের বরখাস্ত হওয়া সাবেক এসআই লিয়াকত আলী ও টেকনাফ থানার বরখাস্ত হওয়া সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ সহ ৯ জনকে আসামী করে কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। মামলাটি র‌্যাব-১৫ কক্সবাজারকে তদন্তের নির্দেশ দেন।

ওই সময়ে আলোচিত এই মামলাটি র‌্যাব-১৫ কক্সবাজারে দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী পুলিশ সুপার জামিল আহমদকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হলেও পরে আদালত উক্ত কর্মকর্তার পরিবর্তে সহকারী পরিচালক ও সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার খায়রুল ইসলামকে তদন্তের দায়িত্ব দেন। যার মামলা নম্বর : এসটি-৪৯৩/২০২১ ইংরেজি, জিআর মামলা নম্বর : ৭০৩/২০২০ ইংরেজি, টেকনাফ মডেল থানা মামলা নম্বর : ৯/২০২০ ইংরেজি।

আদালতে সিনহার বোনের মামলাটি করার পরপরই ২০২০ সালের ৬ আগস্ট প্রধান আসামি লিয়াকত আলী ও টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ ৭ পুলিশ সদস্য আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। একইভাবে পুলিশের পক্ষে সাক্ষী দেয়া শামলাপুর এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা আরও তিন আসামী আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। পর্যায়ক্রমে আদালত আসামীদের কারাগারে পাঠানোর পর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা খায়রুল ইসলাম আসামীদের আদালতের মাধ্যমে দফায় দফায় রিমান্ডে নেয়।

রিমান্ডের আসামীদের স্বীকারোক্তি মতে আরও ৪ আসামী মামলায় যুক্ত করা হয়। মোট ১৪ আসামিকে র‍্যাবের তদন্তকারী কর্মকর্তা বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এদের মধ্যে টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও কনস্টেবল রুবেল শর্মা ছাড়া ১২ জন আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

পরে দীর্ঘ তদন্ত শেষে ওই মামলায় ২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর ১নং আসামী বরখাস্তকৃত এসআই লিয়াকত আলী ও বরখাস্তকৃত সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাসসহ ১৫ জনকে অভিযুক্ত করে এবং ৮৩ জন সাক্ষীসহ আলোচিত মামলাটির চার্জশীট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন র‌্যাব-১৫ এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ খায়রুল ইসলাম। ১৫ জনকে আসামি করে দায়ের করা অভিযোগপত্রে সিনহা হত্যাকাণ্ডকে একটি 'পরিকল্পিত ঘটনা' হিসেবে উল্লেখ করেন। পরে ২০২১ সালের ২৪জুন চার্জসীটভুক্ত আরেক আসামী কনস্টেবল সাগর দেব আদালতে আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে আলোচিত এই মামলার ১৫ আসামির সবাই আইনের আওতায় আসে।

মামলায় কারাগারে থাকা ১৫ আসামি হলো- বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন পরিদর্শক লিয়াকত আলী, টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, রুবেল শর্মা, টেকনাফ থানার এসআই নন্দদুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল সাফানুর করিম, কামাল হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, এএসআই লিটন মিয়া, কনস্টেবল সাগর দেব, এপিবিএনের এসআই মো. শাহজাহান, কনস্টেবল মো. রাজীব ও মো. আবদুল্লাহ, পুলিশের করা মামলার সাক্ষী টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুরের মারিশবুনিয়া গ্রামের নুরুল আমিন, মো. নিজামুদ্দিন ও আয়াজ উদ্দিন।

মামলার চলাকালীন সময়ে চলতি বছরের ২৭জুন ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৩০২/২০১/১০৯/ ১১৪/১২০-খ/ ৩৪ ধারায় সকল আসামীর উপস্থিতিতে কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইলের আদালত মামলার অভিযোগ গঠন করেন। এর আগে মামলা তদন্তকালিন সময়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কক্সবাজার জেলা পুলিশ প্রশাসনের পুলিশ সুপার ও কনস্টেবলসহ পুলিশের ১,৫০৫ সদস্যকে কক্সবাজার থেকে একযোগে অন্যত্রে বদলী করা হয়।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পিপি (পাবলিক প্রসিকিউটর) এডভোকেট ফরিদুল আলম জানান, কক্সবাজার জেলার আলোচিত মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডের মামলাটি বর্তমানে কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে লকডাউনের কারণে হাইকোর্টের নির্দেশে সারাদেশের মতো কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে স্বাভাবিক কার্যক্রম না চলায় নির্ধারিত ধার্য দিনে সাক্ষ্য গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। এ মামলায় ৮৩ জন চার্জশীট ভুক্ত সাক্ষী রয়েছে। আদালতে স্বাভাবিক কার্যক্রম চললে মামলাটির সাক্ষ্য গ্রহণ সহ অন্যান্য আইনি কার্যক্রমও স্বাভাবিক নিয়মে চলবে। বিচারকার্য শুরুর অন্যান্য কাজ এগিয়ে রয়েছে। আদালত খুললে এই মামলার কাজও শুরু হবে।

র‍্যাবের দেয়া মামলা চার্জশীটে উল্লেখ করা হয় যে, ২০২০ সালের ৭ জুলাই সিনহা মো. রাশেদ খান, শিপ্রা দেবনাথ, সাহেদুল ইসলাম সিফাত ও রুফতি কক্সবাজারের নীলিমা রিসোর্টে অবস্থান করেন। ইউটিউবে একটি ভিডিও চ্যানেল নিয়ে কাজ করার সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতা হয়। সাধারণ মানুষ পুলিশের মাধ্যমে তাদের জিম্মি দশা, অত্যাচারের ঘটনা মেজর সিনহাকে জানায়। এসব জানতে পেরে সিনহা পীড়িত হন। নীলিমা রিসোর্ট থেকে টেকনাফের উদ্দেশ্যে রওনা হন মেজর (অব.) সিনহা ও তার সহকর্মী সাহেদুল ইসলাম সিফাত। এরপর সন্ধ্যার দিকে মারিশবুনিয়া গ্রামের টুইন্যা পাহাড়ে উঠেছিলেন মেজর সিনহা।

পরে স্থানীয় একটি মসজিদের মাইকে এলাকায় ডাকাত পড়েছে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। এ ঘোষণার নেপথ্যে ছিলেন স্থানীয় আয়াজ উদ্দিন ও নুরুল আমিন। তারা দুই জনই পুলিশের সোর্স হিসেবে পরিচিত। ওইদিন সকাল থেকেই সিনহার গতিবিধি নজরে রাখা হয়। একটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বৃক্ষরোপণ অনুষ্ঠান শেষে ওসি প্রদীপকে জানানো হয়, মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ প্রাইভেটকার নিয়ে টেকনাফের শামলাপুর পাহাড়ে গেছেন। এ সময় সোর্সের মাধ্যমে বাহারছড়া ক্যাম্পের ইনচার্জ ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলী সিনহার প্রতি নজর রাখতে থাকেন।

শামলাপুর আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) চেকপোস্টে তল্লাশির নামে গাড়ি থেকে নামিয়ে মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদকে খুব কাছ থেকে চারটি গুলি করেন ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলী। এর কিছুক্ষণ পরেই প্রদীপ কুমার দাশ যখন ঘটনাস্থলে যান, তখনো মেজর সিনহা জীবিত ছিলেন। এ সময় ওসি প্রদীপ সিনহার ‘মুখমণ্ডল ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় পায়ের জুতা দিয়ে আঘাত করে; বিকৃত করার চেষ্টা করেন। এর পরই সিনহার মৃত্যু হয়। পরে লোক দেখানোভাবে তাকে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।

এদিকে, সিনহা হত্যা মামলাটি বেআইনি ও অবৈধ দাবি করে ৪ অক্টোবর মামলার প্রধান আসামি লিয়াকতের আইনজীবী মাসুদ সালাহ উদ্দিন কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। কিন্তু ওই মামলার বিশেষ কোনো অগ্রগতি এখনও পর্যন্ত লক্ষ্য করা যায়নি।

About

Popular Links