Monday, May 27, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

অস্ত্রের মডেলে বাজারে শিশুদের কলম

নগরীর বিভিন্ন মার্কেট ঘুরে খেলনার দোকানগুলোতে বিভিন্ন ধরনের খেলনা আগ্নেয়াস্ত্রের দেখা মেলে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে নামিদামী ব্র্যান্ডের খেলনাও।

আপডেট : ০৯ জুন ২০১৮, ০৪:০২ পিএম

পণ্যগুলো দেখতে আগ্নেয়াস্ত্রের মতো, তবে আগ্নেয়াস্ত্র নয়— এগুলো শিশুদের জন্য তৈরি করা কলম। আগ্নেয়াস্ত্রের অনুকরণে তৈরি কলম এখন বাজারে ভরা। রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেটে এমনকি ফুটপাতেও শিশুদের খেলনার দোকানে এমন কলমসহ অন্যান্য অস্ত্রের আদলে তৈরি খেলনা চোখে পড়ে। এগুলো ব্যবহার করছে কোমলমতি শিশুরা। বিশ্লেষকেরা বলছেন, আগ্নেয়াস্ত্রের মতো কোনোকিছু শিশুদের ব্যবহার না করতে দেওয়াই ভালো। এসব তাদের মনোজগতের বিকাশে ভয়ঙ্কর প্রভাব ফেলতে পারে। আগ্নেয়াস্ত্রের আদলে তৈরি শিক্ষা উপকরণগুলো অভিযানের মাধ্যমে বাজার থেকে সরিয়ে নেওয়ার দাবি সচেতন মহলের।গত বৃহস্পতিবার (৭ জুন) ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের সামনের ফুটপাতে অনেকগুলো পণ্য সাজিয়ে বসেছেন এক বিক্রেতা। হঠাৎ চোখ পড়লো বিভিন্ন আগ্নেয়াস্ত্রের আদলে তৈরি কলমে। সেসব কলম কিনছে স্কুল পোশাক পরা দুই ছাত্র।

এগুলো কী জানতে চাইলে বিক্রেতা মো. শাহিন সাহেব বলেন, ‘এগুলো কলম। দাম ২০ টাকা। এগুলো চকবাজার থেকে পাইকারিতে কেনা।’দরদাম করে কয়েকটি কলম কিনলেন ইশতিয়াক আহমেদ। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই খেলনাগুলো দেখে খুব পছন্দ হয়েছে। তাই কিনলাম। আমরা দুজনেই (স্বামী-স্ত্রী) টিউশনি করি। যাদের পড়াই তাদের দেবো। এগুলো পেলে তারা খুব খুশি হবে।’

নগরীর বিভিন্ন মার্কেট ঘুরে খেলনার দোকানগুলোতে বিভিন্ন ধরনের খেলনা আগ্নেয়াস্ত্রের দেখা মেলে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে নামিদামী ব্র্যান্ডের খেলনাও।

নিউমার্কেট এলাকার শিশুদের খেলনা বিক্রেতা মো. সামিউল ইসলাম বলেন, ‘আগে তো খেলনা ছিল। এখন তো বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে খেলনা বানানো হয়। তাই শিশুদের জন্য। সব ধরনের খেলনা বানানো সহজ হয়ে গেছে।’

শিশুর জন্য খেলনা পিস্তল, ছুরি, চাকু— এগুলো বেচা ঠিক কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কী যে বলেন! কী ঠিক, কী বেঠিক— এসব চিন্তা করলে কি ব্যবসা করা যাবে? আমরা দোকানে জিনিস রাখি, কারো পছন্দ হলে কিনবে, না হলে কিনবে না।’

রাজধানীর লালবাগ এলাকার বাসিন্দা গৃহিণী নূরজাহান বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার কাছে এ ধরনের ডিজাইনের কলম ভালোই লাগে। শিশুরা এগুলো দেখে খুশি হয়।’

রাজধানীর একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ফারজানা সিদ্দিকী ন্যান্সি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা তো স্কুলে শিক্ষার্থীদের স্কেল আনতেও নিষেধ করি। কারণ, এটা দিয়ে কোনও কোনও শিশু মারামারি করে। আমার মতে, পিস্তল, ছুরি, চাকু— এই ধরনের কোনোকিছু শিশুদের শিক্ষার উপকরণ হিসেবে রাখা উচিত নয়।’

বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তানভীর আহসান শুরুতেই একটি গল্প শোনান, ‘একবার যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের স্কুলে হাতির ছবি আঁকতে বলা হয়েছে। ওরা ছবি এঁকে হাতির পিঠে দুটো ডানা এঁকে দিয়েছিল। কারণ ওরা রূপকথার গল্পগুলোতে দেখে যে হাতির পিঠে পাখা আছে। অর্থাৎ শিশুরা অনুকরণপ্রিয়, যা তাকে দেখানো-শেখানো হবে, তাই সে শিখবে।’ তিনি বলেন, ‘পিস্তলের মধ্যে যদি কলম দেওয়া হয় সেটাতো অবশ্যই ভয়াবহ হবে। সেক্ষেত্রে শিশুদের ভায়োলেন্সকে উৎসাহিত করবে। শিশুরা যখন টিভিতে মাসলম্যানকে দেখে তারা আনন্দ পায়। সেখানে যদি তাকে পিস্তল ধরিয়ে দিই ডেফিনেটলি সেটা একটা কুপ্রভাব ফেলবে ওদের মনোজগতে। তখন সে পিস্তল আর কলমের মধ্যে পার্থক্যটা বুঝবে না। তার মধ্যে সহিংসতার মনোভাব তৈরি হবে।’

তানভীর আহসান বলেন, ‘এই ধরনের অস্ত্র যখনই শিশুর হাতে খেলনার ফরম্যাটে দিই সেটা যেমন ভয়াবহ হবে, সেটা আরও ভয়াবহ হবে যদি শিক্ষার উপকরণের মধ্যে দেওয়া হয়।’

আগ্নেয়াস্ত্রের আদলে তৈরি কলম কিনছে শিশুরা বাংলা ট্রিবিউন

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পরবর্তী জীবনে যারা আগ্রাসী আচরণ করে বা খুন-খারাবি করে তাদের দেখা গেছে যে টিভি মাধ্যমে, বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে, বা ভায়োলেন্স ভিডিও বেশি দেখে তারাই পরবর্তী জীবনে আক্রমণাত্মক হয়, আগ্রাসী হয়। কারণ, প্রথম থেকেই তাদের মধ্যে এই প্রেষণা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।’

তিনি বলেন, ‘এখন ব্যবসায়ীরা কি করছে? তারা দুটো জিনিস করছে। শিশুরা ধুমধাড়াক্কা মারামারি করা, উত্তেজনা সৃষ্টি করা— এটা সব শিশুর মধ্যেই আছে। অর্থাৎ শিশুর স্বাভাবিক যে প্রবণতা শিশুর আকৃষ্ট হওয়া, অ্যাডভেঞ্চার করা। কিন্তু অসৎ ব্যবসায়ীরা সেই অ্যাডভেঞ্চারকে ভায়োলেন্সের পর্যায়ে নিয়ে গেছে।’

ডা. তাজুল ইসলাম বলেন, ‘শিশুরা বিভিন্ন যায়গায় ছুরি-পিস্তল দেখছে, তারা যাদের হিংসাত্মক ছবি দেখছে। সেই হিরোদের তারা হিরো ভাবছে মার্কেটে গেলে তারা ওইটা পছন্দ করবে। তারা কলম কিনতে চাইবে না, তারা পিস্তলটা বা ছুরিটা কিনতে চাইবে। আর গার্ডিয়ানদের তারা প্রলুব্ধ করছে, গার্ডিয়ানরা তো এগুলো কিনতেন না। এটা দুইটা প্রতারণা— পিস্তল দিয়ে সন্তানদের নষ্ট করছে, আর এটাকে কলমের রূপক দিয়ে গার্ডিয়ানদের প্রতারণা করা হচ্ছে। এবং কলম হচ্ছে শান্তিবাদী জিনিস, সৃজনশীল জিনিস। আর পিস্তল হচ্ছে ধ্বংসাত্মক, মারণশীল জিনিস। এই দুইটার প্রতীকী সংযোগ করে দিয়ে তারা সর্বনাশ করছে, কলমের যে সৃজনশীল চিন্তা, যে দৃষ্টিভঙ্গি তাকে নষ্ট করে ফেলছে। এটা একটা বড় অপরাধ তারা করছে।’

তিনি বলেন, যেখানে কলম মসীর বিরুদ্ধে। সেখানে কলম হয়ে গেছে মারণাস্ত্র। এতদিনের নৈতিক মূল্যবোধ ধ্বংস করে দিচ্ছে এই ব্যবসা। অতএব খুব সূক্ষ্মভাবে চিন্তা করলে সরকারিভাবে এখনই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা উচিত। এখন বিভিন্ন টিম ঘুরছে বিভিন্ন যায়গায় ভেজালবিরোধী অভিযান করছে, তারা যেন কলমের ভেতরে যারা মারণাস্ত্র ঢুকিয়ে দিচ্ছে তাদেরও শাস্তি দেয়।’

ডিএমপির উপ কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘খেলনা অনেক সময় অনেক রকমেরই হতে পারে। খেলনা হিসেবে অনেকে কিছুই ব্যবহার করতে পারে। সেক্ষেত্রে সেটা অস্ত্র যদি না হয় তাহলে আমাদের পক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকে না। খেলনা তো বিনোদনের জন্য।’

শিশুর খেলনা আগ্নেয়াস্ত্রের আদলে হওয়া যাবে কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের আইনে এই ব্যাপারে কোনও বিধি-নিষেধ নেই।’

About

Popular Links