Monday, May 27, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

উন্নয়ন প্রকল্পের নামে রুয়েটে কাটা হচ্ছে পুরনো গাছ, নাগরিকদের প্রতিবাদ

প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী গাছগুলোকে নিধন নিষিদ্ধ করে সেগুলোকে সংরক্ষণের দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন রাজশাহীর ছয় নাগরিক

আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১০:০৫ পিএম

রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রুয়েট) উন্নয়ন প্রকল্পের নামে অর্ধ শতাব্দীরও বেশি পুরনো গাছ কাটার প্রতিবাদে সমাবেশ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৬ সেপ্টেম্বর) দুপুর সাড়ে ১২টায় রুয়েটের প্রধান ফটকের সামনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। 

কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, পরিবেশ ধ্বংস করে আমরা উন্নয়ন চাই না। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক পরিত্যক্ত স্থান রয়েছে। সেখানে অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হোক।

রুয়েটে উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় নতুন প্রশাসনিক এবং একাডেমিক ভবন নির্মাণের জায়গা তৈরির জন্য ইতোমধ্যে ১৫টি অর্ধ শতাব্দীরও বেশি পুরনো গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। 

মানববন্ধনে উপস্থিত তানভীর অপু নামে এক পর্যটক বলেন, দেশের একটি সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠের সামনে গাছ কাটার প্রতিবাদে দাঁড়াতে খুবই কষ্ট হচ্ছে। রাজশাহী বিশ্বের কাছে “গ্রিন সিটি” হিসেবে পরিচিত। আর সেখানেই গাছ কেটে সবুজ ধ্বংস করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, গাছগুলো কাটায় পাখিরা তাদের আবাসস্থল হারাল। এমনিই বাংলদেশের সবচেয়ে উষ্ণ শহর রাজশাহী। এভাবে গাছ কেটে ফেললে এক সময় রাজশাহীর কী হবে ভাবা যায় না।

মানববন্ধনে পরিবেশ আন্দোলন ঐক্য পরিষদের যুগ্ম সচিব রেজাউল করিম মহব্বত বলেন, অর্ধ শতাব্দীরও বেশি বয়স্ক এই গাছ কাটার ব্যাখা চাই আমরা। নির্বিচারে কেটে ফেলা হচ্ছে কোন ব্যাখ্যা ছাড়াই। 

তিনি আরও বলেন, রাজশাহী একটি চরমভাবাপন্ন জেলা। আবহাওয়া অনুকূলে রাখার জন্য যেখানে পরিকল্পিতভাবে পুরো রাজশাহী জুড়ে গাছ লাগানো হচ্ছে, সেখানে রুয়েটের মতো জায়গায় স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে গাছ কেটে পরিবেশকে শঙ্কায় ফেলে দেওয়া হচ্ছে। 

এদিকে রুয়েট কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, নতুন প্রশাসনিক এবং একাডেমিক ভবন নির্মাণের জায়গা তৈরি করতেই এসব গাছ বিক্রি করা হয়েছে। যারা গাছ কিনেছেন, তারাই কাটছেন। 

অন্যদিকে, রাজশাহী বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আহমেদ নিয়ামুর রহমান বলেন, সরকারি গাছ কাটার জন্য কর্তৃপক্ষের বাধ্যতামূলকভাবে অনুমোদন নেওয়া উচিত এবং বন বিভাগের উচিত গাছের দাম মূল্যায়ন করা। 

রুয়েট কর্তৃপক্ষ গাছ কাটার বিষয়ে বন বিভাগকেও জানিয়েছে বলেও জানান তিনি।

এ বিষয়ে রুয়েটের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মো. সেলিম হোসেন জানান, আশির দশক থেকে ক্যাম্পাসে কোনো উন্নয়ন কর্মকাণ্ড হয়নি। সম্প্রতি সরকার ৬০০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। যার আওতায় ১০টি ১০ তলা ভবন নির্মাণ হবে। এজন্য মোট ৫০টি গাছ কাটা হবে। ইতোমধ্যে এই কর্মসূচির আওতায় ১৫টি গাছ কাটা হয়েছে। 

তিনি আরও জানান, কর্তৃপক্ষ গত এক বছর ধরে ক্যাম্পাসে প্রায় এক হাজার চারা রোপণ করেছে যেন গাছ কাটার ক্ষতিপূরণ হয়ে যায়। 

ক্যাম্পাসের সিনিয়র সহকারী নিরাপত্তা পরিচালক মো. জালাল উদ্দিন জানান, যথাযথ ক্রয়বিধি মেনেই রুয়েটের কর্মচারী গোলাম মোস্তফার কাছে গাছগুলো বিক্রি করা হয়েছে। 

গাছের ক্রেতা গোলাম মোস্তফা জানান, তিনি গাছ কাটার জন্য শ্রমিক নিয়োগ দিয়েছিলেন। কিন্তু, রুয়েট কর্তৃপক্ষ বন বিভাগকে গাছ কাটার বিষয়ে অবহিত করেছিল কিনা তা তিনি জানেন না। 

ক্যাম্পাস সূত্রে জানা যায়, এই গাছগুলোর অধিকাংশই ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে রুয়েট ক্যাম্পাসে লাগানো হয়েছিল। প্রতিটি গাছের মূল্য প্রায় ৫০ হাজার টাকা হলেও রুয়েট কর্তৃপক্ষ ১৫টি গাছ মাত্র ১ লাখ ২৭ হাজার টাকায় বিক্রি করেছে। 

এ বিষয়ে স্থানীয় কাঠ ব্যবসায়ী আব্দুস সামাদ জানান, তিনি রুয়েট ক্যাম্পাসের কাটা গাছ দেখেছেন এবং প্রতিটি গাছের দাম প্রায় ৫০ হাজার টাকা। 

প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বৃক্ষগুলোকে নিধন নিষিদ্ধ করে সেগুলোকে সংরক্ষণের দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন করেছেন রাজশাহীর ছয় নাগরিক। 

বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় রাজশাহীর জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে তারা তিন দফা দাবি সম্বলিত একটি স্মারকলিপিটি দেন। 

তারা হলেন- শামীউল আলীম শাওন, ফাতেমা আলী মেঘলা, শাওন ইসলাম, শান্তা ইসলাম, রিনা আক্তার ও মোসা. সুকতারা। 

এই ছয় নাগরিক জানান, স্মারকলিপিতে তারা নিজেদের পরিচয় হিসেবে নাগরিক, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ লিখেছেন এবং নিজেদের জাতীয় পরিচয় পত্র ও মোবাইল নম্বর দিয়েছেন। 

গাছের সঙ্গে চলে পাখি নিধনের উৎসব বলে উল্লেখ করে তারা স্মারকলিপিতে বলেন, গত ৪ সেপ্টেম্বর বিকেলে ড্রেন নির্মাণের জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভিতরে থাকা অর্জুনসহ প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বেশকিছু গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। হাসপাতাল চত্বরে গাছ কাটা হলে মাটিতে পড়ে শাবকসহ শতাধিক পাখি মারা যায়। 

এছাড়াও ২০২০ সালের ২৮ ডিসেম্বর রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চত্বর থেকে প্রায় সাত বছরের অধিক সময় ধরে বসবাস করে আসা পাখি তাড়াতে শতাধিক গাছের ডালপালা কেটে ফেলে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

এছাড়াও বিগত ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসের দিকে রাজশাহীতে কারা প্রশিক্ষণ একাডেমি নির্মাণের জন্য রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার এলাকায় থাকা অর্ধশতাধিক প্রাচীন গাছ কেটে ফেলা হয়। 

তারা স্মারকলিপিতে আরও বলেন, ২০১৬ সালে জাতিসংঘের বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যে বিশ্বের সবচেয়ে দূষণমুক্ত শহর হিসেবে রাজশাহীর নাম উঠে আসে। গাছ কাটার ফলে দুষিত বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়াও কষ্টকর হয়ে উঠেছে। শুধুমাত্র রাজশাহী তথা বরেন্দ্র অঞ্চল নয়, বরং দেশের বিভিন্ন স্থানে চলছে গাছ কাটার মহোৎসব। যা কোনভাবেই কাম্য নয়। তাই প্রাণবৈচিত্র্য সুরক্ষায় এখনই এসব প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বৃক্ষ কাটা বন্ধের পাশাপাশি সেগুলোকে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

About

Popular Links