Tuesday, May 21, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বিশ্লেষণ: বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্য কোন রণতরী সবচেয়ে ভালো হবে?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে ধীরে ধীরে 'ক্রেতা' থেকে 'নির্মাতায়' পরিণত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন

আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৪:৪৩ পিএম

“ফোর্সেস গোল-২০৩০”-এর অধীনে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ২০১৭ সালে স্বদেশী রণতরী প্রকল্পের একটি সংশোধিত পরিকল্পনা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে। তখন থেকে নৌবাহিনী প্রস্তাবিত “মেড ইন বাংলাদেশ” গাইডেড-মিসাইল রণতরী বা এফএফজির নকশা দাঁড় করানোর জন্য বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবনা নিরীক্ষা করে দেখা হয়েছে।

এক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি কোম্পানি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। তবে বাস্তবতা হলো সবগুলো কোম্পানির উদ্ভাবন, গুণগতমান এবং বাস্তবায়ন দক্ষতা একই মানের নয়।

চিটাগাং ড্রাই ডক লিমিটেড (সিডিডিএল) বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একটি উদ্যোগ। যারা এই রণতরী প্রকল্পের দায়িত্ব পায়। প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, রণতরীগুলো আধুনিক প্রযুক্তি এবং যুদ্ধাস্ত্রে সুসজ্জিত থাকবে। প্রতিটি রণতরীর আনুমানিক আয়ু হবে ৩০ বছর। সিডিডিএল ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মোহাম্মদ নাজমুল করিম ২০১৮ সালে বলেছিলেন, “২০২২ সালে দুটি, ২০২৫ সালের মধ্যে দুটি এবং ২০৩০ সালের মধ্যে আরও দুটি রণতরী চালু হবে।”

তবে, প্রকল্পটি চলমান থাকলেও ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এগুলোর নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। কিছু ভূ-রাজনৈতিক এবং সাম্প্রতিক বৈদেশিক নীতিতে পরিবর্তনের কারণে প্রকল্পটি বিলম্বিত হয়েছে। প্রকল্পের শুরুতে অনুমান করা হয়েছিল রণতরীগুলো চীনা প্রযুক্তি ও কারিগরী সহায়তায় নির্মিত হবে। কিন্তু রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটের পর ২০১৭ সালে এতে সংশোধন আনা হয়। বাংলাদেশ নৌবাহিনী  ন্যাটো স্ট্যান্ডার্ডের ওপর নজর দিয়ে এই প্রকল্পে কিছু নতুন সংযুক্তি এনেছে। এটি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি অগ্রাধিকার প্রকল্প।

আগামী ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া আন্তর্জাতিক ফ্লিট রিভিউ-২০২১ এ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করবেন বলে আশা করা যাচ্ছে।

শত শত কোটি ডলারের এই প্রকল্পে বেশ কয়েকটি দেশের কোম্পানি যৌথ উদ্যোগে জি২জি কর্মসূচির অধীনে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কাছে প্রাথমিক নকশা, প্রযুক্তিগত ও কারিগরী সহায়তা এবং রক্ষণাবেক্ষণ সহায়তাসহ তাদের প্রস্তাবনা জমা দিয়েছে। তুরস্ক, চীন, নেদারল্যান্ডস, ইতালি, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানিগুলো এই প্রকল্পে অংশ নিতে আগ্রহ দেখিয়েছে। একটি দক্ষ বিদেশি জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এই অংশীদারিত্ব চুক্তি এমনভাবে সম্পাদিত হবে, যা আধুনিক নৌ -জাহাজ নির্মাণে বাংলাদেশের সক্ষমতা নিশ্চিত করবে এবং যার মাধ্যমে হাজার হাজার বাংলাদেশির কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পরিচালিত দেশের প্রধান প্রতিরক্ষা পোর্টাল দ্য বাংলাদেশ ডিফেন্স অ্যানালিস্টের (defseca.com) তথ্য অনুসারে, প্রস্তাবিত যেসব প্রতিষ্ঠানের নাম অনানুষ্ঠানিকভাবে শোনা গেছে, সেগুলো হলো:

ইস্তাম্বুল-ক্লাস ফ্রিগেট/এমআইএলজিইএম প্রকল্প: এসটিএম উইথ ইস্তাম্বুল নেভাল শিপইয়ার্ড, তুরস্ক

টাইপ ০৫৪এ ফ্রিগেট: চায়না স্টেট শিপ বিল্ডিং কর্পোরেশন (সিএসএসসি), চীন

সিগমা ১০৫১৪ অ্যান্ড ১১৫১৫ ডিজাইন: ডামেন গ্রুপ, নেদারল্যান্ডস

ইতালিয়ান এফআরইএমএম ডিজাইন: ফিনকানতিরি, ইতালি

ফ্রেঞ্চ এফআরইএমএম ডিজাইন: নেভাল গ্রুপ, ফ্রান্স

গোউইন্ড ২৫০০/৩১০০ ডিজাইন: নেভাল গ্রুপ, ফ্রান্স

ডেগু-ক্লাস ফ্রিগেট: দেউউ শিপিং বিল্ডার্স অ্যান্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড  হুন্দাই হেভি ইন্ডাষ্ট্রি, দক্ষিণ কোরিয়া

টাইপ -৩১ ই ফ্রিগেট: ব্যাবকক ইন্টারন্যাশনাল, ইউকে

এর মধ্যে কিছু কোম্পানি ইতোমধ্যেই রপ্তানির জন্য প্রস্তুত। কয়েকটি পরীক্ষামূলক পর্যায়ে, কেউ কেউ ধারণাগত পর্যায়ে এবং বাকিরা অংশীদারিত্ব কর্মসূচির জন্য প্রস্তুত রয়েছে। 

দ্য বাংলাদেশ ডিফেন্স অ্যানালিস্ট ইঙ্গিত দিয়েছে, সিডিডিএল বাকি চারটি রণতরী দেশীয় প্রযুক্তিতে নির্মাণে প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত প্রথম দুটি রণতরী বিদেশি শিপইয়ার্ডে তৈরি করা হবে। 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে ধীরে ধীরে “ক্রেতা” থেকে “নির্মাতা” বাহিনীতে পরিণত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। এর মূল লক্ষ্য হলো- যাতে বাংলাদেশ নৌবাহিনী একদিন বিভিন্ন বিদেশেও যুদ্ধজাহাজ রপ্তানি করতে পারে।

বাংলাদেশ নৌবাহিনী দেশের ১,১৮,৮১৩ বর্গ কিলোমিটার সমুদ্র অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হাজার হাজার কোটি টাকার একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করেছে। ভবিষ্যতে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এবং সমুদ্র্র অর্থনীতি অর্জনের জন্য সরকারকে সহায়তা করতে জাহাজ নির্মাণ প্রচেষ্টার পাশাপাশি বাংলাদেশের বিভিন্ন নৌ সংস্থার জন্য নিজস্ব নেভাল ইয়ার্ডে জাহাজ নির্মাণের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা রয়েছে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর।

রণতরীকে যেকোনো আধুনিক নৌবাহিনীর জন্য মূল শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং এই যুদ্ধযানগুলো অন্যান্য যুদ্ধজাহাজ বা বাণিজ্যিক জাহাজের পাহারায় মূল ভূমিকা পালন করে থাকে। রণতরীগুলোর পরিচালনায় সাধারণত ১৫০ থেকে ২০০ জন ক্রু নিয়োজিত থাকেন এবং এই জাহাজগুলো সাধারণত ২০০০ থেকে ৫০০০ টনের হয়ে থাকে। তুলনামূলকভাবে দ্রুত গতিসম্পন্ন এসব জাহাজের গতি ২৫-৩০ নট এবং কর্মপরিধি ৫,০০০-১৫,০০০ নটিক্যাল মাইল।

আধুনিক রণতরীগুলোতে বায়ু এবং তলদেশ খোঁজার রাডার, গাইডেন্স রাডার, অ্যাক্টিভ/প্যাসিভ সোনার এর মত ইলেকট্রনিক যুদ্ধাস্ত্র ও প্রতিরোধী সরঞ্জাম থাকে। বর্তমানে রণতরীগুলো সাধারণত ডিজেল বা বৈদ্যুতিক-ডিজেল ইঞ্জিনচালিত। এছাড়া এতে সাবমেরিনবিরোধী যুদ্ধ এবং অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানের জন্য কমপক্ষে একটি উড়োজাহাজ রাখা হয়।

বাংলাদেশ নৌবাহিনী বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত দুটি, চীনে নির্মিত চারটি এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় তৈরি একটিসহ সাতটি রণতরী পরিচালনা করছে।


ড. মাহমুদ রফিক

এভিয়েশন, কম্পিউটেশনাল ফ্লুইড ডাইনামিক্স এবং ডিস্ট্রিবিউটেড ইলেকট্রিক প্রপালশন বিশেষজ্ঞ



About

Popular Links