Monday, May 20, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

যে হিলিয়াম ছিল জীবিকা, তার কারণেই দগ্ধ পুরো পরিবার

তার সেই বেলুন ফুলানোর হিলিয়াম গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ৩৮ জনের অবস্থা আশংকাজনক তার মধ্যে তার পরিবারেরই ৬ জন রয়েছেন।

আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২২, ০৩:৫৭ পিএম

কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার মৌকারা ইউনিয়নের বেরুলিয়া গ্রামের আনোয়ার। গত পাঁচ থেকে ছয় বছর রাজমিস্ত্রির পাশাপাশি সিজনাল বেলুন বিক্রি করে চালাতেন পরিবারের ভরণপোষণ। তিনি নিজেই বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্যের সংমিশ্রণে হিলিয়াম গ্যাস তৈরি করে তা বিভিন্ন আকৃতির বেলুনে ঢুকিয়ে বিক্রি করতেন। 

বৃহস্পতিবার (১৩ জানুয়ারি) তার সেই বেলুন ফুলানোর হিলিয়াম গ্যাসের সিলিন্ডারের বিস্ফোরণ ঘটে। এতে কম পক্ষে ৫০ জন আহত হয়েছেন তার মধ্যে ৩৮ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এর মধ্যে তার পরিবারেরই ৬ জন রয়েছেন।

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, একপাশে অর্ধদগ্ধ আনোয়ারের ৬ বছরের মেয়েকে নিয়ে বসে আছে আনোয়ারের বোন ফারহানা আক্তার।

তিনি জানান, তার পরিবারের ৬ জন এই বিস্ফোরণে ঝলসে গেছে। ছয় জনের চার জনই শিশু। তারা হলেন, আনোয়ারের বোন নাছরিন (২৮), বড় মেয়ে আপনান (৮), ছোট মেয়ে মরিয়ম (৬), তার বোনের ছেলে নাজমুল (৭) ও বোনের মেয়ে নুসরাত (৩)।

ফারহানা আক্তার জানান, আনোয়ার মেলার সিজনে বেলুন ফুলিয়ে পাইকারদের কাছে বিক্রি করতো। বৃহস্পতিবার বেলুনের একটি বড় অর্ডার আসে। সেই সঙ্গে সামনের শনিবার বেরুলিয়া গ্রামে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ঠান্ডাকালি মেলা। ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই মেলাতে বিক্রি হয় হাজার হাজার বেলুন। যার কারণে আনোয়ার হোসেন বেলুন ফুলিয়ে জমা করছিল বিক্রির জন্য। এদিকে নিজের দুই মেয়ে ও স্বামীর ঝলসে যাওয়া শরীর দেখে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন আনোয়ারের স্ত্রী। বিকেল থেকে বাকরুদ্ধ আনোয়ারের স্ত্রী ঘরেই পড়ে আছে বলে জানায় বোন ফারহানা।

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. আসিফ ইমরান জানান, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজে ভর্তি আছে প্রায় ২২ জন। তাদের কারোর অবস্থা আশঙ্কামুক্ত নয়। তবে আনোয়ার ও তার ৬ বিছরের মেয়ে মরিয়মের অবস্থা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

আনোয়ার যেভাবে বানাতেন বেলুনের গ্যাস ও সিলিন্ডার:

বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জানা যায়, আনোয়ার নিজেই বাড়িতে বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্যের সংমিশ্রণে হিলিয়াম গ্যাস তৈরি করতো। পরে গ্যাস বিভিন্ন আকৃতির বেলুনে ঢুকিয়ে বিক্রি করতো।

ইমরান হোসেন নামে স্থানীয় এক যুবক জানান, আমরা দেখেছি আলমগীর প্রথমে একটি গ্যাস সিলিন্ডার আনে। তারপর সিলিন্ডারটিতে চুন (ক্যালসিয়াম অক্সাইড) এর সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক দ্রব্যের ট্যাবলেট ও গুড়ার মিশ্রণ করে পানি ঢাললে বিক্রিয়া করে তৈরি হতো হিলিয়াম গ্যাস। পরে সিলিন্ডারের ছিদ্র দিয়ে বের হওয়া গ্যাস বেলুনে ঢুকাতো। এভাবেই নিজের বানানো হিলিয়াম গ্যাস দিয়ে বেলুন ফুলিয়ে বিক্রি করতো আনোয়ার।

বেলুন ক্রেতা ও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আহত আলমগীর হোসেন জানান, আমি বিক্রির জন্য বেলুন কিনতে গিয়েছিলাম। আমি দেখেছি সিলিন্ডারটি বার বার গরম হয়ে যাচ্ছিল আর আনোয়ার সিলিন্ডারটিতে পানি ঢালছিল। কিন্তু বিস্ফোরণটি হওয়ার আগ মুহূর্তে আমার মনে হচ্ছিল সে পানি দিতে দেরি করে ফেলেছিল যার কারণে অতিরিক্ত গরম হয়ে বিস্ফোরণটি হয়েছে। আর চোখের সামনেই সবাই মাটিতে পড়ে গেল।

মৌকারা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আলমগীর হোসেন জানান, সে যে গ্যাস সিলিন্ডারটি এনেছিল সেটির অবস্থা খুবই নাজুক ছিল। অনেক পুরনো ও মরিচা পড়া। ঘটনার পর আমি শুনেছি এটিতে তিন থেকে চারটি জায়গায় ফাটল ছিল। পরে সে সেগুলো ঝালাই করে এনেছে। এলাকাবাসীর অজান্তেই সে একাজ করতো।

তিনি আরও জানান, সে তার বাড়ির উঠোনেই বেলুন ফুলানোর কাজটি করছিল। তার উঠোনের আশপাশে ২০ থেকে ২৫টি ঘর বাড়ি রয়েছে যেখানে প্রায় দুইশ মানুষ বসবাস করে। সে যখন বেলুন ফোলাচ্ছিল তখন আশপাশের প্রায় অর্ধশত মানুষ আসে তা দেখতে। এর মধ্যে শিশুরাও ছিল।

নাঙ্গলকোট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফারুক হোসেন জানান, ঘটনাটি দুঃখজনক। তবে সে গ্যাস সিলিন্ডারটি কিভাবে এনেছে বা তৈরি করেছে তা আমরা জানতাম না। এটা জানতে পেরেছি সিলিন্ডারটি থেকে সে বেলুন ফুলানোর জন্য ব্যবহার করছিল। আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ আসেনি। 

উল্লেখ, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার বিরুলিয়া গ্রামের বেলুন ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন বেলুন ফুলানোর সময় বাড়ির মানুষজন ভিড় জমায়। হঠাৎ সিলিন্ডারের বিস্ফোরণ ঘটে এতে অর্ধশতাধিক আহত হয়েছে।

About

Popular Links